:- মিষ্টি প্রতিশোধ - ২

সকাল দশটা বাজে ঘুম থেকে উঠলাম , এতো লেট করে ঘুম থেকে উঠার কারণ আজ শুক্রবার  ছুটির দিন । ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হতে গেলাম , ফ্রেশ হয়ে এসে নাস্তার টেবিলে  এসে বসলাম ।
মা  আমাকে রুটি আর ভাজি দিয়ে গেলো ‌।
মাকে জিজ্ঞাস করলাম -বৃষ্টি কোথায় ?
মা বলে - বৃষ্টি ছাদে কাজ করছে ? 
[বৃষ্টি হলো আমার স্ত্রী ]
এরপর আমি একটা রুটি ছিঁড়ে মুখে দিতে যাবো , এমন সময় আমার মনে পড়ল আমার নীল ডায়রীর কথা । গতরাতে একটা কাজের জন্য নীল ডায়রীটা ড্রয়ার থেকে বের করছিলাম । কিন্তু ডাইরী টা ভুল বশত ড্রয়ারে রেখে লক করা হয়নি ।  ডাইরীটা টেবিলের উপর রেখে দিয়েছিলাম ।
**
আমি নাস্তা খাওয়া রেখে তাড়াতাড়ি করে রুমে গেলাম , রুমে গিয়ে দেখি টেবিলের ওপরে আমার ডায়েরীটা নেই । এরপর আমি ড্রয়ারে
টেবিলে বিছানার উপর সব জায়গায় খুজতে লাগলাম ।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার ডায়রীটা কোথাও পাচ্ছিলাম না , আমার সম্পুর্ন  মনে আছে রাতে টেবিলের উপর রেখেছিলাম । কিন্তু  এখন সেটা কোথায় হাওয়া হয়ে গেলো । এরপর আমি ভাবলাম হয়তো আমি ভুলে অন্য কোথাও রেখে দিয়েছি 
তাই  আমি রুমের সব জিনিসপত্র এলোমেলো করে ডায়রীটা খুঁজতে লাগলাম !
**
এর মাঝে বৃষ্টি কখন এসে হাজির হয়েছে রুমে , আমি খেয়ালই করিনি । 
হঠাৎ বৃষ্টি বলে উঠলো - আরো এভাবে রুমের জিনিসপত্র এলোমেলো করতেছো কেনো ?
আমি বললাম - আমার একটা জরুরী জিনিস খুঁজে পাচ্ছি না , তাই সেটা খুজতেছি ?
বৃষ্টি বলে - কি জিনিস আমাকে বলো আমি খুজে দিচ্ছি ? 
আমি বললাম- লাগবে না আমি নিজে খুঁজে নিবো , তুমি আম্মুকে গিয়ে কাজে সাহায্য কর ?
বৃষ্টি বলে - তোমার সেই জরুরি জিনিস এইটা নয়তো   ? [ ডায়রীটা আমাকে দেখিয়ে ] 
**
আমি দেখি আমার নীল ডায়েরী টা তার হাতে , আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলাম - আমার ডায়রী  তুমি পেলে কোথায় ?
বৃষ্টি বলে - সকালে  নামাজ পড়তে যখন উঠছিলাম তখন দেখলাম টেবিলের উপর রাখা ।? 
আমি বললাম - তুমি আমার ডায়রী ধরলে  কেনো , তুমি কি আমার ডায়রী পড়েছ ? 
বৃষ্টি বলে -  তুমি কলেজে থাকতে  একটা মেয়েকে ভালবাসতে , আর সে মেয়ে তোমাকে বোকা বানিয়ে অন্যের হাত ধরে চলে গেছে , এই পর্যন্ত পড়ছিলাম ? 
এই বলে সে হাসতে লাগলো ।
**
তার কথা শুনে আর তার হাসি দেখে  আমার কেমন জানি অনেক রাগ হলো , আমার ইগোতে লাগলো  । আমি তার কাছ থেকে ডায়েরীটা জোর করে নিতে চাইলাম। কিন্তু কোনো রকমে
নিতে পারছিলাম না । ওকে  আমি বারবার বলছিলাম ডায়রীটা এদিকে দেও । কিন্তু সে আমার কোন কথাই শুনতে ছিলো  না , আমাকে ডায়রীটা দিচ্ছিল না ।
আমি তখন ঠাস করে তার গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেই । এরপরে  সে চুপ হয়ে গেলো আর  বাড়াবাড়ি করলো না ।
আমি তার হাত  থেকে ডায়েরীটা নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দিয়ে লক করে দিলাম । 
লক করে দিয়ে তার দিকে তাকালাম, দেখি সে  গালে হাত দিয়ে আছে ।চোখের কোনে জল টলমল করছে মনে হয় এখনি কেঁদে দিবে । আমি তখন সাথে সাথে ওকে সরি বললাম ।
সে তখন আমার কাছে এসে আমার কানে আস্তে করে বলে -  এই থাপ্পড়ের প্রতিশোধ আমি নেব ? 
এ বলে বৃষ্টি রুম থেকে বের হয়ে যায় ।
**
এরপর  আমিও তাড়াতাড়ি করে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম । আমি জানি বৃষ্টি এখন আম্মুর কাছে গিয়ে নালিশ দিবে । এই মেয়েকে সামান্য একটু বকাঝকা দিলে হয় , সে  আম্মুর কাছে গিয়ে এনিয়ে বানিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা নালিশ দিয়ে বসে । এরপর আম্মু এসে আমাকে  ওনার লেকচার শোনাবে । আমাকে বকাঝকা শুনিয়ে যাবে ।
আর আজকে তো তার গায়ে আমি হাত তুলেছি,
আজকে না জানি কি করে , এই ভয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম ।
**
বাসা থেকে বের হয়ে একটা হোটেলে এসে নাস্তা খেতে বসলাম । বসে বসে ভাবতে লাগলাম , আসলে আমি কাজটা কি  ঠিক করেছি । 
বৃষ্টি আমার স্ত্রী , আমার জীবনের সবকিছুতেই তার অধিকার আছে  । সেতো আমার ডায়রীটা নিয়ে শুধুমাত্র পড়ছে । এজন্য আমি রাগ দেখালাম তার গায়ে হাত তুললাম ।
আচ্ছা রাগতো  দেখানোর কথা ছিল বৃষ্টির । কারণ এই নীল ডাইরীটা আমার যতসব অপকর্মের সাক্ষী । আমি কখন কোন মেয়ের উপর ক্রাস খেলাম , কোন কোন মেয়েকে দেখে প্রেমে পড়েছিলাম । একটা মেয়েকে একদিন চুমু খেয়েছিলাম । তারপর কলেজে একটা মেয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল , তার সম্পকে  সব কিছু লেখা আছে সেই নীল ডায়রীতে  । 
এতকিছু জানার পরও সে  বিন্দুমাত্র রাগ করেনি , অভিমান দেখায়নি , আমার প্রতি তার
কোনো নেগেটিভ  চিন্তা-ভাবনা আসেনি ।
আর আমি কিনা উল্টা রাগ দেখিয়ে তার গায়ে হাত তুললাম । এ সব কথা ভাবতে ভাবতে নিজের কাছে খারাপ লাগছিলো।
**
বারটার দিকে বাসায় এলাম , খুব ভয়ে ভয়ে রুমে ঢুকলাম । রুমে ঢুকে দেখি বৃষ্টি রুম গোছাচ্ছে ।
আমি আস্তে আস্তে পেছন থেকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম , সে চমকে উঠলো ।
আমাকে দেখে বললো - ছাড়ো আমাকে? 
আমি বললাম - আমি আমার বউকে জড়িয়ে
ধরেছি ছাড়ার জন্য না তাকে আদর 
করার জন্য  ? 
সে অভিমানী গলায় বললো - সকালে গায়ে হাত তুলে এখন এসেছে ঢং করতে ,ছাড়ো বলছি আমাকে ? 
আমি তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম - সকালে আমার কি হয়েছে আমি জানিনা , তোমার তো অধিকার আছে আমার ডায়েরীটা পড়ার ।আমি জানি আমি ভুল করেছি অপরাধ করেছি ,আমাকে কি এখন ক্ষমা করা যায় না বউ ?
বৃষ্টি বলে - দেখো ন্যাকামি করবা না , আমাকে ছাড়ো বলছি , আমার কাজ আছে । সকালে পুরু রুম এলোমেলো করে গেছো । এখন আমার এগুলো সব গোছাতে হবে ।? 
এরপর আমি তার রাগ ভাঙ্গানোর জন্য তাকে ছেড়ে দিয়ে তার সাথে রুমের জিনিসপত্র গুলো গোছাতে লাগলাম । 
**
পুরো রুম  গোছানো শেষ হলে , আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এরপর বৃষ্টি এসে আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো । আমি দুই হাতে আমার বুকে তাকে জড়িয়ে 
ধরে বললাম -  আমার বউয়ের আকাশ থেকে কালো মেঘ কি  দূর হয়েছে ‌,নাকি  বউ আমার
উপরে এখনো রাগ । 
সে মুচকি হেসে বলে -হুম কিছুটা কালো মেঘ দূর হয়েছে ?
[ আমি মনে মনে বললাম যাক বাবা বাঁচা গেলো , রাগ কমেছে তাহলে ।]
**
কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি বললো - আরে  এখনও একটা কাজ বাকী রয়ে গেছে , ছাড়ো তো আমাকে ?
আমি তাকে ছেড়ে দিলাম , তারপর সে রুম থেকে বের হয়ে গেলো । দুই মিনিট পর আবার 
ফিরে এলো , তার হাতে একটা ঝাড়ু । 
[ নারিকেল গাছের পাতার খিলন দিয়ে যে ঝাড়ু  বানানো হয় সেই ঝাড়ু তার হাতে ] 
আমি ভাবলাম হয়তো সে  রুম ঝাড়ু দিবে। কিন্তু সে রুম ঝাড়ু না দিয়ে ঝাড়ুটা  আমার হাতে ধরিয়ে দিলো ?
আমি বললাম - আরে আমার হাতে ঝাড়ু দিলে কেন ?
বৃষ্টি বলে - একটু পরে বুঝতে পারবে ? 
এই বলে হাত দিয়ে সে তার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে নিলো। তারপর আমার পায়ের কাছে বসে চিৎকার করে বলতে
লাগলো- আমাকে আর মারবে না , আমার ভুল হয়ে গেছে , আমি আর কখনো তোমার ডায়রী  ধরবো না । আম্মুগো আমাকে মেরে ফেললো ? 
**
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই মা রুমে এসে হাজির । মা এসে দেখতে পেল আমার হাতে ঝাড়ু , আর বৃষ্টি আমার পায়ের কাছে বসে কাঁন্না করছে । 
[ বৃষ্টি যেভাবে নাটক করল , যে কেউ  দেখলে মনে হবে আমি ঝাড়ু দিয়ে বৃষ্টিকে পিটিয়ে ছিলাম]
আম্মুকে দেখে বৃষ্টি উঠে  আম্মুর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো ।
সে কেঁদে কেঁদে বললো - দেখেন আম্মু তার 
ডায়রী ধরেছি বলে সকালে একবার আমার গায়ে হাত তুলেছে  এখন আবার আমাকে ঝাড়ু দিয়ে পিটাচ্ছে  ?
আমি কিছু বলার আগেই আম্মু আমার হাত থেকে ঝাড়ু টা নিয়ে আমাকে মারতে লাগল । আমি বললাম - আরে মা কি করছেন, আমার কথা শুনেন ? 
কিন্তু কে শুনে কার কথা , আম্মু আমাকে ঝাড়ু
দিয়ে দশ-বারোটা  বারি মেরে দিলো । তারপর মারা বন্ধ করে আমাকে বকা শুরু করে ।
আম্মু বললো -  তোর লজ্জা করেনা সামান্য একটা ডাইরীর জন্য বউয়ের গায়ে হাত তুলতে । তোর কি  কখনো জ্ঞান-বুদ্ধি কিছু হবে না । আরো একগাদা কথা শুনিয়ে দিলো । 
**
এরপর আম্মু আবার ঝাড়ু দিয়ে  মারতে গেলে । বৃষ্টি আম্মুর হাত থেকে ঝাড়ু টা নিয়ে নিচে ফেলে দেয় ।
বৃষ্টি বলে -  থাক মা আর মারবেন না ,
তার যত খুশি আমাকে মারতে দেন  । অপরাধ যখন করেছি শাস্তিতো  পেতে হবে ? 
আম্মু তখন বলে -  দেখ গাধা তোর সামান্য কষ্ট বৌমার সহ্য হয় না ,সে দেখতে পারে না তোর কষ্ট । আর তুই সেই লক্ষী বউটার গায়ে হাত তুলোস । তুই কি কখনও মানুষ হবি না ,
কোন কাজটা ভালো কোনটা খারাপ সেটা
কোনোদিন বুঝতে পারবি না ? 
আরো অনেক কথা শুনিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো ।
**
আমি তখনও শখের মধ্যে ছিলাম, পাথরের মূর্তির মতো মত দাঁড়িয়ে থেকে এটা কি হলো পুরো ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করলাম ?
আম্মু রুম থেকে চলে গেলে বৃষ্টি অট্টহাসিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো ।
সে  আমার কাছে এসে আমার কপালে 
একটা চুমু দিয়ে, আমাকে জড়িয়ে ধরে 
বললো -  সকালে বলছিলাম না  আমার গায়ে হাত তুলেছে তার প্রতিশোধ আমি নিবো ,
এখন সেই প্রতিশোধ নিলাম । তুমি আমার স্বামী  তোমার গায়ে তো আমি হাত তুলতে পারি না । তাই নাটক করে আম্মুকে দিয়ে আমার প্রতিশোধ
টা  নিলাম । এখন থেকে আমার গায়ে হাত তুলতে হাজার বার ভেবে চিন্তে তুলবে । 
মনে রাখবে আমার গায়ে হাত তুললে তার পরিনাম আজকের মতোই হবে ? 
এই বলে সে আবার হাসতে লাগল ।
আমি একটু রাগী কন্ঠে বললাম - তুমি তো দেখি ভালো অভিনয় জানো । তোমাকে চলচ্চিত্রে থাকা দরকার , তুমি অভিনয় করলে আমি শিউর অস্কার পুরস্কার পেয়ে যাবে ।? 
**
এরপর বৃষ্টি বললো - হয়েছে আর তারিফ করতে হবে না । আজকে জুমার দিন নামাজ পড়তে যাবে না , এখন যাও গোসল করে রেডি হয়ে নামাজ পড়তে যাও । 
আমি একটু অভিমান গলায় বললাম -  না ,
আজ গোসল করবো না , নামাজও পড়তে
যাবো না ।?
সে রেগে গিয়ে বললো - কি বললা তুমি , নামাজ 
পড়তে যাবেনা ।? 
আমি বললাম - বলছি না যাব না ? 
সে তখন আবার আম্মু বলে চিৎকার দিতে যাবে ,  আমি তাড়াতাড়ি করে হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরলাম ।
তারপর বললাম - আরে  পাগলী  কি করছো ,
আম্মু কে ডাকছো কেনো , আমিতো একটু দুষ্টামি করে বললাম হে হে হে ।?
বৃষ্টি বললো - ছাগলের মত হে হে করতে হবে না ,  গোসল করে তাড়াতাড়ি নামাজ পরতে যাও ? 
এই বলে গালে  একটা চুমু দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো ।
**
আমি বিছানায় বসে পরলাম । বসে  ভাবতে লাগলাম কোন লেখক  যেন বলছিলেন , মেয়েদের মন বোঝা কোন মানবজাতির দ্বারা সম্ভব না । আসলে কথাটা একদম সত্য ।
মেয়েদের মন বুঝার মত ক্ষমতা কারো হয়নি কোনদিন হবেও না । এদের মন কখন কি
বলে ,কখন কি করে   সেটা শুধু তারাই ভালো জানে ।আসলেই মেয়েদের মন জিলাপির প্যাঁচের মত ???
**
সমাপ্ত *
--
:- মিষ্টি প্রতিশোধ - ২ 
লেখা :- muhammad Javed

Comments