সম্মান

" এই মিয়া সরে দাঁড়ান তো। গা থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। যত্তসব কোথা থেকে যে চলে আসে।"-
বাসে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বসে থাকা একটা ছেলে কথাটা বলল একটা শ্রমিককে উদ্দেশ্যে করে। লোকটি লজ্জায় একটু সরে দাঁড়ালো। লোকটির পোশাকাশাক ছেড়া ও বেশ নোংরা। লোকটিকে দেখে বেশ দুর্বল মনে হচ্ছে। লোকটি বাসে উঠার পর থেকেই বেশ ঠেলাঠেলির মুখোমুখি হচ্ছেন। তারপরে এধরনের একটা কথা শোনার পরে তার চোখটা ছলছল হয়ে গেল। কথাটি শুনেই মুহুর্তেই একটি ছেলে সিট থেকে উঠে লোকটির সামনে গিয়ে বলল, 
-- আপনি আমার সিটে বসুন।
-- আমার কাছে ওত বেশি ট্যাকা নাই। আমি
   দাঁড়াইয়া যাইতে পারমু। আপনি বহেন। 
-- সমস্যা নাই আপনার টাকা দিতে হবে না।
   আপনি বসুন। আমি অনুরোধ করছি। 
   আমি দুইটা সিট নিয়েছিলাম।

           শ্রমিক লোকটি ভয়ে ভয়ে সিটে বসলো। এবার ছেলেটি লোকটিকে অপমান করা ছেলেটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,
-- এই যে ভাই, খুব সম্মানে লাগে তাইনা?
   গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বাসে বসেছেন। পাশে একটা
   ঘর্মাক্ত, দরিদ্র দিনমজুর মানুষ দাঁড়াবে তা
   কিভাবে হয়। আরেহ্ আপনার মতো শখে
   বাবার টাকা উড়িয়ে বেড়াই না এ মানুষগুলো।
   তারা সারাদিন পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে
   খাবার যোগানোর জন্য। আর এই মানুষ পাশে
   দাঁড়ালে সম্মানে লাগে?
-- আপনার এত গায়ে লাগছে কেন? উনাকে
   বলছি আপনাকে তো না।
-- আমার গায়ে লাগছে কারণ উনি জবাব দিতে
   পারে নাই। অসহায় মানুষগুলো জবাব দিতে
   ভয় পায়। আর আপনারা তাদের
   অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছা তাই বলে
   যান।
-- ওহ্। হয়তো আপনার ওইরকম সোসাইটিতে
   থাকার, দুগন্ধযুক্ত মানুষের পাশে বসার 
   অভ্যাস আছে বাট আমাদের নেই।  
-- হা হা। সোসাইটি? এ কেমন সোসাইটির 
   মানুষ আপনি যে শ্রমজীবী মানুষকে সম্মান
   দিতে জানেন না? বাই দ্য ওয়ে, আমি তাহসিন
   চৌধুরী, ফাইনাল ইয়ার মেকানিকাল
   ইঞ্জিনিয়ারিং, বুয়েট। আমার বাবা ইনায়েত
   চৌধুরী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের
   সার্জারির বিভাগীয় প্রধান। আমার মা তানিয়া
   আফরোজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার।
   শিক্ষা মনুষ্যত্ব এই ব্যাপারগুলো নিজেকেই
   তৈরি করে নিতে হয়। এ ধরনের দরিদ্র
   সোসাইটিতে চলার অভ্যাস না থাকলে
   প্রাইভেট কার ইউজ করুন। আপনার উনাকে
   অপমান করার কোন রাইট নাই। আপনার
   টাকায় উনি বাসে উঠেন নাই। 
এবার লোকটি লজ্জিত হয়ে চুপ হয়ে গেল। বাসে বসা অন্যান্য লোকজনের ও মাথা নত হয়ে গেছে তাহসিনের জবাবে। 

              তাহসিন চৌধুরী নিজের সিটে এসে বসলো। শ্রমিক লোকটি ভয়ে চুপসে আছে। তাহসিন বলল,
-- চাচা আপনি কি করেন?
-- আমি বিল্ডিংয়ে ইট তুলার কাজ করি বাবা।
-- কতদিন ধরে এই কাজ করেন?
-- বহুত বছর। আমার বাপ মরার পর থাইকা
   আমি সংসার চালাইতাম।
-- ওহ। আপনার বাড়িতে কে কে আছে?
-- আমার বউ আর দুইডা মাইয়া।
-- আচ্ছা। দুপুরে খাইছেন?
-- না।
-- কেন?
-- খাওনের জন্য যে ট্যাকা ডা পাই কইদিন
   হলো হেইডা জড়ো করছি। আমার বড় মাইয়া
   এসএসসি দিবো এইবার। ছোট মাইয়াডারেও
   স্কুলে ভর্তি কইরা দিছি। তাই ম্যালা টাকা
   লাগবো সামনে মাসে।
-- মানে এইভাবে প্রতিদিন দুপুরে না খেয়ে থেকে
   যান? 
-- হ বাবা। আর কইডা দিনেরই ব্যাপার সহ্য
   হইয়া যাইবো। মাইয়া দুইডা যেন পড়াডা
   শিখতে পারে। আমরা পড়ালেখা করার সুযোগ
   পাই নাই। আমাদের সময়ে খাওনের যোগান
   দেয়া মুশকিল আছিলো।
-- আপনি আমার সাথে চলুন খাবার খাবেন। 
-- না না। আপনি এমনেই আমারে বইতে দিছেন
   হেই অনেক।
-- আমি তো আপনার ছেলের মতো আমার
   অনুরোধ টা রাখুন। 
-- আচ্ছা ঠিক আছে বাবা। আপনি হেবি ভালা
   মানুষ। আপনের বাপ মায়ের আর এই দেশের
   গর্ব। 

বাস থেকে নেমে তাহসিন একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল লোকটিকে। লোকটি কখনো হয়তো এরকম প্লেসে আসেনি। বেশ ভয় পাচ্ছে। 
-- আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই চাচা।
   আপনি পেট পুরে খাবেন। 
খাওয়া শেষে তাহসিন লোকটির পরিবারের মানুষদের জন্য পার্সেল নিয়ে উনাকে দিল। আর মানিব্যাগ থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে দিয়ে বলল,
-- এই টাকা টা রাখুন। আপনার মেয়ের
   পরীক্ষার কাজে লাগবে। 
-- ছিঃ ছিঃ এইডা দিয়েন না বাবা। আপনি
   আইজ যা করছেন হেই আলহামদুলিল্লাহ।
   দোয়া করি আল্লাহ্ আপনেরে অনেক বড়
   করুক। 
-- প্লিজ নেন। 
-- না বাবা জোর কইরেন না। আমাগোরে জন্যে
   দোয়া কইরেন। আমি আসি। 
-- জ্বী ভালো থাকবেন। 

অনেক বুঝিয়েও লোকটিকে টাকা টা দিতে পারলো না তাহসিন। লোকটি নিতে রাজি নয়। তাহসিন রাস্তায় হাটছে নিজ পথের দিকে আর ভাবছে, " দরিদ্র হতে পারে, দিনভর পরিশ্রম করে কিন্তু বিন্দুমাত্র লোভ নেই। নিজের একটা আত্মসম্মান আছে। অথচ এই মানুষগুলোকে পদে পদে অপমানিত হতে হয়। কি অদ্ভুত দুনিয়া !  "

(সমাপ্তি) 

ছোটগল্প: সম্মান 
লেখনীতে-- নূর-এ সাবা জান্নাত

Comments