স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র ভালোবাসা

কয়েকদিন পর ঈদ। সবাই কেনাকাটা নিয়ে
ব্যস্ত। সবাই ভিন্ন ভিন্ন রকমের পোশাক
কিনছে। আমি কিনেছি তবে বাবা-মা আর
অন্তুর জন্যে। অন্তু আমার ছেলে। নিজের
জন্যও কিছু কিনি নাই, আয়েশার জন্যও কিছু
কিনি নাই। যে টাকা বেতন পাই তাতে
কোনমতে সংসার চলে যায়। ঈদের সময়
টেনেটুনে দু'একজনের কেনাকাটা হয়, এটাই
মধ্যবিত্ত সংসারের চিরাচরিত নিয়ম। সুদ, ঘুষ
নেয়ার অভ্যাস থাকলে হয়তো এতদিনে ফ্লাট
বাড়ি বানাতাম। আমি প্রচুর আল্লাহকে ভয়
করি। করবোই না কেন? তিনিই তো আমার
সৃষ্টিকর্তা।
.
অফিসে বসে ভাবছি, আমি না হয় পুরাতন লুঙি
আর পাঞ্জাবী পরে ঈদ কাটিয়ে দিতে
পারবো। কিন্তু আয়েশার তো পরণের কাপড়
ছাড়া নতুন নেই। তাহলে কি পরে ঈদের
নামায আদায় করবে? মনটা খারাপ হতে
লাগলো। যদি আমার আরো কিছু টাকা
থাকতো তাহলে হয়তো ওর জন্য কিছু কিনতে
পারতাম। হাতে যা আছে তাতে পুরো মাসের
খরছ চালাতে হবে। মায়ের ঔষুধ তো আছেই।
মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। বসকে বলে দুদিন
অভার টাইম কাজ করার চিন্তা করলাম।
বসকে বলে কাজেও লেগে গেলাম।
.
আগের থেকে তিন ঘন্টা বেশি করি। তাতে
হয়তো কিছু টাকা পেয়ে যাবো। সেটা দিয়েই
আয়েশার জন্য কিছু কিনবো। আয়েশা অবশ্য
অফিস থেকে ফেরার পর বলেছিলো,
- আজ এতো দেরি করে আসলে যে?
- কাজ ছিলো, সামনে ঈদ তো এখন একটু
বেশিই কাজ। সামনের কয়েকদিনও এভাবে
দেরি করে আসতে হবে।
আয়েশা আমার কথায় চুপ থেকেছিলো। আমার
প্রতি প্রচন্ড বিশ্বাস মেয়েটার। মিথ্যা কথা
বলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলাম। কেননা
আমি মিথ্যা বলি না, এ অভ্যাসটুুকু আমার
ছোট থেকেই নাই আলহামদুলিল্লাহ।
.
পরশুদিন ঈদ। অফিস আজকে থেকে বন্ধ। সবাই
আস্তে আস্তে ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা
জানিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছে। আমিও স্মিত
হেসে অভিবাদন গ্রহন করেছি। কিছুক্ষণের
মধ্যে বসের রুমে ডাক পড়লো। এই ডাকটার
জন্য এতক্ষণ অপেক্ষায় ছিলাম,
- আসসালামু আলাইকুম স্যার।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভিতরে আসো
আশিক। বসো
- জ্বী স্যার। স্যার একটা কথা বলতাম।
- বলো।
- স্যার অভার টাইমের টাকাটা যদি দিতেন
তাহলে ওর জন্য একটা শাড়ি কিনতে
পারতাম। অনেকদিন হয়, ওকে কিছু দেয়া হয়
না।
- সেটা তো দিবোই। তোমার কাজকর্মে আমি
মুগ্ধ। ঠিকমতো কাজ করো, সামনের মাস
থেকে বেতন কিছু বাড়িয়ে দিবো।
বেতন বাড়ানোর কথা শুনে প্রথমে আল্লাহর
প্রতি শুকরিয়া আদায় করলাম,
- ধন্যবাদ স্যার।
- ঠিক আছে। এই নাও।
স্যারের নিকট থেকে অতিরিক্ত ১৫শ টাকা
পেলাম। মনটা খুশিতে ভরে গেল। বারবার
সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে
জানাতে অফিস থেকে বের হলাম। আল্লাহ
আমার ডাক শুনেছেন। তাইতো বস বেতন
বাড়ানোর কথা বললেন। তবুও আমি সুখেই
আছি।
.
সিটি মার্কেটে বন্ধুর দোকানে গেলাম।
ফয়েজ কম মূলধন দিয়ে শুরু করলেও এখন বেশ
বড় দোকান। বেশ কয়েকটা ছেলে ওর
দোকানে কাজ করে। বন্ধু আমার বেশ ভালো
আছে। সততা, তাক্বওয়ার বীজ ওর কাছ
থেকেই শিখেছি। ছোটবেলা থেকে একসঙে
খেলেছি, ঘুরেছি,স্কুলে পড়েছি। আয়েশার
জন্য একটা শাড়ি কিনলাম। ফয়েজ ওর
পছন্দের শাড়িটাই কেনা দামেই দিলো।
ফয়েজ জানে আমার আর্থিক অবস্থা। ওর উপর
তাই শতভাগ আস্থা রাখতে পারি। এমন বন্ধু
পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার। শাড়িটা
কেনার পর দুজনে চা খেলাম। পকেটে আরো
দু'শ টাকা আছে। টাকাগুলো পাশের বাড়ির
মর্জিনার মাকে দেয়ার চিন্তা করলাম, বেশ
ভালো মহিলা। আমাকে ছোট থেকেই
ভালোবাসতো। গরিব হলেও সবকিছুই আমাকে
দিয়ে খেতো।
.
অফিসের ব্যাগে করে শাড়িটা নিয়ে
আসলাম, আয়েশাকে সারপ্রাইজ দিবো বলে।
শাড়িটা দিলাম কিন্তু খুশি হলো না। রাগ
হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
- টাকা কোথায় পেলে? সব টাকা তো আমার
কাছে।
ওর মুখের কথা শুনে কাচুমাচু করতে লাগলাম।
ধরা পড়ে গেছি। এখন সত্য বলে দেয়াই শ্রেয়।
শার্ট খুলতে খুলতে বললাম,
- কয়েকদিন অভার টাইম করেছি। কতদিন
তোমাকে ভালো কিছু দিতে পারি না। তাই
অতিরিক্ত টাকা থেকে নিয়ে এলাম।
বাকিটা মার্জিনার মায়ের হাতে দিয়েছি।
আয়েশার চোখের দিকে তাকালাম। ও
কাঁদছে। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে।
আমি ওর কাছে গিয়ে থুতনি উঁচিয়ে ধরলাম,
- পাগলি কাঁদছো কেন?
- তুমি আমার জন্য অভার টাইম করে শাড়ি
কিনেছো, তোমার যে কিছুই নেই। সব পুরনো
হয়েছে তা কি খেয়াল করেছো? আমি নতুন
শাড়ি দিয়ে ঈদ করবো আর তুমি পুরাতন শার্ট
লুঙি দিয়ে?
- কি যে বলো, কিছুদিন আগেই তো শার্টটা
বানালাম।
- ৬ মাস আগের শার্ট বুঝি নতুন থাকে?
- কি বলো পাগলি আমার! আমাদের যা
রোজগার তাতে কোনমতে চলে যায়।
সেহিসেবে সবার ঈদ খরছ কেমনে করবো?
তবে স্যার আমার কাজে বেশ খুশি। সামনের
মাস থেকে বেতন বাড়াবেন বলেছে।
.
বিছানার উপরে বসে আছি। আয়েশা আমার
কাঁধে মাথা রেখেছে। অন্তু হয়তো ওর দাদা-
দাদীর ঘরে। আমার কাঁধ থেকে মাথা তুলে
চোখ মুছে আলমারির দিকে গেল। একটা
প্যাকেট নিয়ে এসে আমার হাতে ধরিয়ে
দিয়ে বললো,
- এটা তোমার জন্য।
- কি এটা?
- তোমার জন্য লুঙি আর গেঞ্জি।
- টাকা কোথায় পেলে?
- তুমি মিথ্যা কথা বললে আমি টের পাই।
সেদিন তুমি মিথ্যা বলেছো আমাকে। পরে
খোঁজ নিয়ে জানলাম তুমি অভার টাইম
করছো। তুমি আমার জন্য শাড়ি কেনার জন্যই
এমনটা করেছো,এটা বুঝতে আমার বাকি
ছিলো না। তাইতো আমার মাটির ব্যাংকটা
ভেঙে তোমার জন্য কিনেছি।
- মাটির ব্যাংক!
- হুম, চুপিসারে ছিলো। সংসারে উচ্ছিষ্ট
চার পাঁচ টাকা করে রাখতাম।তাই!
.
আমার চোখ ভিজে গেছে। আয়েশাকে
জানতাম বুদ্ধিমতী, কিন্তু এতোটা জানতাম
না! কত ভালোবাসে মেয়েটা আমাকে! আমি
হয়তো ওর তুলনায় কম বেসেছি। বরাবরই আমি
ওর ভালোবাসার কাছে হেরে যাই। এভাবেই
আয়েশাকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই।
আল্লাহ যেন সুখি রাখেন সবাইকে।

Comments

Popular posts from this blog

পথের বাঁধন

চুয়াডাঙ্গা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?

গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে জেনে নিন!