ভালোবাসার ফল প্রকাশ! (ইরোটি২৪)


বাচ্চা একটা মেয়ে। ষষ্ঠ শ্রেণী পেরিয়েছে
মনে হয় কদিন আগে। ওর রুমের বই দেখে
বুঝেছিলাম। সে মেয়ে আরেকটা বাচ্চা
কীভাবে সামলাবে?
অন্ধ অভিভাবক হলে যা হয়। আপনার
উত্তরসূরি লাগবে যেহেতু তাহলে একটা
বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে খুঁজলেন না কেনো? যত
সমস্যা সব আমার।
মেয়েটার বাবা মা ও টাকা পয়সা ধন-দৌলত
দেখে বিয়ে দিয়ে দিলো! এভাবে কোনো
দিন বিয়ে হয়? পাঁচ জন মানুষ দূরে থাক মনে
হয় না বিয়ে উপলক্ষে একটা মুরগী ও জবাই
করা হয় নি। মুড়ি খেয়ে রাণের স্বাদ
মিঠালাম ও!
আর আমার ও পুঁটি মাছের ভাগ্য। যতবার
ব্যবসার জন্য টাকা নিলাম বাবার কাছ
থেকে ততবারই লস খেলাম। এবার শর্ত
ছিলো যে ব্যবসায় সফল হতে না পারলে
বিয়ে করতে হবে। তার পর একটা বাচ্চার মুখ
তাঁকে দেখাতে হবে!
তাহলে শেষ বারের মতো বাড়িতে থাকার
সুযোগ দিবে। মাত্র চার ঘণ্টা আগে আমি
ছিলাম জলজ্যান্ত যুবক আর এখন আমি
স্বামী!
মাথায় গামছা প্যাঁচিয়ে বিয়ে করেছি।
মিহিকে দেখে মনে হয়েছিলো সে মাত্র
বৌ-ছি খেলে এসেছে। আর বাবা আমাদের
সামনে বসিয়ে বললোঃ-
- মা, তোর কপাল খুলেছে। কবুল বল।
বলার সময় অবশ্য লোকটার চোখ দিয়ে পানি
ঝরছিলো। মিহি কিছু না বুঝেই কবুল বলে
দিয়েছিলো। তারপর যখন আমাদের সাথে
দিয়ে দিবে তখন ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক,
চোখে কাজল আর একটু সাজিয়ে দিয়েছে!
তখন থেকেই মেয়েটা স্তব্ধ হয়ে আছে।
কমদামী হাতের চুড়ির দিকে তাকাচ্ছে। আর
আমার বাবা আছেন সেই মজায়। যখন
বাড়িতে আসলাম।
সবাই মিহিকে দেখে শীতের কুয়াশার মতো
জমে গেলো। আমি জানি সবাই মনে মনে
বলছে, মহসিন চৌধুরী এ কী করলেন? আমার
নিজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করলে ও
বাবার মধ্যে করছে না নিশ্চিত।
তাঁর জেদ হলে আমাকে কেনো নিজেই
চারটা বিয়ে করতে পারেন। আমার মা
ইনাকে ঠিক করতে পারে নি। জেদের কাছে
হার মেনে চলে গিয়েছে।
কারই বা আর কী করার আছে? বাসর ঘর
সাজানো হচ্ছে। কেউ কেউ বৌ দেখতে
আসছে। বৌ দেখে চলে যাবার সময় বিড়বিড়
করে আমাকে আর বাবাকে গালি দিয়ে
যাচ্ছে!
মিহিকে যদি বলা হয় যে তোমাকে এই
বাড়িতে বৌ করে আনা হয়েছে দুবছরের
ভেতরে মহসিন চৌধুরীকে একটা নাতীর মুখ
দেখানোর জন্য।
গ্রামের চেয়ারম্যানের সাথে তাঁর এ নিয়ে
টক্কর। তাহলে মেয়েটা হার্টফেল করা ন্যায়
হবে। বাসর ঘরে ঢুকতে আমি ভয় পাচ্ছি। ঘরে
ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই মেয়েটা ভয় পেয়ে
খাটের বিছানা শক্ত করে ধরলো।
চোখ দিয়ে নীরবে পানি পরছে। আমার শার্ট
খুলা দেখে হয়তো ঘাবড়েই গিয়েছে। আমি
চেয়ারটা টান দিয়ে বসে বললামঃ-
- নাম কী তোমার?
মিহি অনেকক্ষণ পর উত্তর দিলোঃ-
- মিহি আক্তার।
- সুন্দর নাম। কিন্তু বাসর ঘরে যে ঘোমটা
দিয়ে বসতে হয় জানো না?
মেয়েটা আমার কথা শুনে ঘোমটা দেয়ার
চেষ্টা করলো। শাড়িটাই ঠিক করে
সামলাতে পারছে না! কীভাবেই বা
সামলাবে? এতটুকু একটা মেয়ে। বললামঃ-
- থাক আর ঘোমটা দিতে হবে না।
মিহি তখন নিচের দিকে তাকিয়ে বললোঃ-
- আপনি কে?
আমি কথা না বাড়িয়ে মশারি টানালাম।
বাতিটা নিভিয়ে পাশের খাটে ঘুমালাম। এই
ঘাটে মশারি নেই। আমি মিহির পাশে ঘুমুতে
গেলে চিৎকার করতে পারে।
আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি। মিহির ইচ্ছে
হলে ঘুমাবে নাহয় জেগে থাকবে। হয়তো
আজকে ঘুমুতে পারবে না। সারাদিন
ছুটাছুটির দৃশ্য চোখে ভাসবে।
স্কুল ড্রেসের কথা মনে করে হয়তো কাঁদবে।
মায়ের কোলে ঘুমানোর কথা মনে করে
হয়তো আরো বেশি কাঁদবে। রাতের আঁধার
ডুবিয়ে আলোর দিশা দিনকে পাহারা দিতে
তৈরি হয়ে পরেছে।
আমি ঘুম থেকে উঠে দেখলাম মিহি হাত পা
এক করে শুয়ে আছে। মিহির যেনো খুব ভয়
হচ্ছে। আমি মিহির ঘুম থেকে জাগার জন্য
অপেক্ষা করছি।
মিহির চোখে সূর্যের আলো এঁকে যাওয়ার
সাথে সাথে উঠে বসলো। আমার তাকানো
দেখে হয়তো ঘাবড়ে গিয়েছে। শাড়ির
আঁচলটা মাথায় দিয়ে বললোঃ-
- বাবা কী আমাকে নিতে আসবে না?
- কেনো?
- বাড়ি যেতে খুব ইচ্ছে করছে। আপনি কী
আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবেন?
- তোমার বাবা আজকে আসবে। তবে দুদিন
পর বাড়ি যেতে পারবে।
বাবার আসার কথা শুনে মিহির চোখে সুখের
অশ্রুর আগমন। আমি দরজা খুলে বললামঃ-
- ভয় পাবার কিছু নাই। এই বাড়িতে সবাই
তোমার বয়সেই বৌ হয়ে আসে। তোমাকে
সবাই বুঝবে শুধু চৌধুরী ছাড়া।
মিহি কিছু বললো না। কিছুক্ষণ পর রিকশা
করে মিহির বাবা আসলো। মিহির বাবার
ডাক শুনে মিহি দৌড়ে ঘর থেকে বের হলো।
বাবা মেয়ে এক ডগা কেঁদে নিলো। মিহির
চোখে বাড়ি যাবার ঘুম তাড়া। মিহির বাবা
বলে গেলেন দুদিন পর তোকে নিতে আসবো।
চিন্তা করিস না।
দুদিন পর মিহিকে নিয়ে মিহির বাবার
বাড়ি আসলাম। মিহি যেনো প্রাণ ফিরে
পেলো। সমস্যা হলো রাতে। মিহি এমনিতেই
আমাকে ভয় পায়।
আমি কাছে ও যাই না। কিন্তু এক চৌকিতে
দুজনের রাতে ঘুমানোর বিছানা করে
দিলেন মিহির মা। আমি জানি মিহি আমার
কাছে আসবে না।
আমি রাতে খেয়ে একাই শুয়ে পরলাম।
দরজার খীল দিয়ে। কিছুক্ষণ পর মিহির
মায়ের ডাক শুনে দরজা খুললাম। মিহিকে
নিয়ে এসেছে।
আমি বললামঃ-
- ছোট মানুষ। এতো কিছু বুঝে না। একটা
রাতই তো। থাকুক না আপনার সাথে।
আমার কথা শুনে মিহি হাসলো। আমার উপর
খুশি হয়ে মিহি বলে গেলো, আপনি না
অনেক ভালো। আমি মনে মনে বললাম, হ্যাঁ
শুধু বাবাই বুঝলো না।
পরের দিন আবারো আমাদের বাড়িতে এসে
পরলাম। এক গাধা পিঠা থেকে শুরে করে
কাপড়চোপড় দিয়ে দিয়েছে মিহির সাথে।
কিন্তু মিহি একটু ও স্বাভাবিক হলো না।
এভাবে দিন কাটতে থাকে। আমি মিহিকে
ছুঁয়ে ও দেখি না। এমনি তে মিহি ও আমার
থেকে দশ হাত দূরে দূরে থাকে। আমাকে
আমার বাবার মতোই ভাবে।
এক দিন দুদিন করে এক মাস পেরিয়ে
গেলো। বাবা ইশারা ইঙ্গিতে উত্তরসূরির
আগমনের ব্যাপারে জানতে চায়। আমি
জানি তা সম্ভব না।
এতো দিন মিহি ভালোই ছিলো। চাচীরা
নিজের মেয়ের মতো করেই দেখেছে। আর
চৌধুরী ও কিছু বলে নি। কিন্তু এখন থেকে
ঠিকই বলবে। শুধু বলবে না।
মানসিক অত্যাচার তো স্বাভাবিক ভয় হচ্ছে
না শারীরিক নির্যাতন ও করে! আজকে
আবার চৌধুরী বললো ভারতে যেতে। খুবই
জরুরী।
ব্যবসায়ের কাজ সহ বড় ফুফুর শ্বশুরবাড়িতে
বেড়াতে যাওয়া। আমি কালকে চলে যাবো।
মিহি তা জানে না। মশারির ছোট ছোট
ছিদ্র দিয়ে আমি আমার খাট থেকে মিহির
মুখটা দেখছি। না জানি কতো দিন এই মুখটা
না দেখে থাকতে হয়। ভোর বেলা রিকশা
হাজির।
স্টেশন পর্যন্ত রিকশা করেই যেতে হবে।
মিহির কাছে কোনো ফোন ও নেই। বাড়িতে
একটাই ফোন সেটা ও চৌধুরীর কাছে
থাকে। আরেকটা আমার।
এই আকাশ বাতাস খাল বিল সহ বড় বড়
দালান আমার ভালো লাগছে না। দক্ষিণা
বাতাস ভালো লাগছে না। কিছুক্ষণ পর
হয়তো মুরগীদল ডেকে উঠবে।
তার সাথে সাথে মিহি জাগবে।
প্রতিদিনের মতো উঠে হয়তো আমাকে আর
দেখবে না। একটু অবাক হবে। তারপর দুদিন
পরে হয়তো বাবার কাছ থেকে জেনে নিবে।
দেশান্তর হলো। লম্বা ভ্রমণ। ফুফু আমাকে
দেখে খুশি হলো। কিন্তু বিয়ের কথা শুনে মন
খারাপ করলো। চৌধুরীর কী পরিকল্পনা!
এখানে এসে জানতে পারলাম যে আমাকে
এক টানা সাত বছর থাকতে হবে!
দিন কাটে না। সময় এগুতেই চায় না। মন
খারাপ নিয়ে পরে থাকি। মিহির সাথে
ফোনে কথা বলার ও কোনো উপায় নেই।
চৌধুরী দেয় না।
এটা আমাদের দুজনের শাস্তি। প্রায় চার
বছর পর একটু সুযোগ হলো চৌধুরীর দয়ায়।
মিহির কান্নাকাটি হয়তো সীমা ছাড়িয়ে
যাচ্ছিলো। আমি ফোন রিসিভ করতেই ঠোঁট
কাঁপছে। কোনোরকম ডাক দিলামঃ-
- মিহি।
মিহির স্থদ্ধ কান্না শুনতে পাচ্ছি। কোনো
কথা বলতে পারছে না। চোখের দরজা দিয়ে
স্বেচ্ছায় পানি ঝরছে। কিছু মুহূর্ত পর মিহি
বললোঃ-
- কেমন আছেন?
- ভালো, তুমি কেমন আছো?
- ভালো না। একদম ভালো না।
- জানি।
- ঠিক করে বলেন না। আপনি সত্যিই ভালো
আছেন?
আমি আর জবাব দিতে পারলাম না। চৌধুরী
মিহির হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে
বললোঃ-
- যথেষ্ট হইছে।
তবু ও মেনে নিতে হবে। শত হলে ও আমার
জন্মদাতা। উনার জন্যই পৃথিবীর আলো
বাতাস গায়ে লাগছে। দীর্ঘ সময় পর আমার
কারাগার বন্ধী শেষ হলো।
আগের যুবক উজ্জ্বল চেহারা আর নেই। বয়স
ত্রিশ পেরিয়েছে। তবু ও অনেক আনন্দ
লাগছে। আজকে আকাশ বাতাস ভালো
লাগছে। দালানকোঠা ও ভালো লাগছে।
দক্ষিণা বাতাস যেনো মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। সব
কিছু পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। সবুজ
গাছপালার জায়গায় শুধু দালান বানানোর
চেষ্টা। সব কিছুতে নতুনত্ব।
আমি আজকে দেশে ফিরবো তা মিহি জানে
না। বাড়ির রাস্তায় রিকশা আর চলে না।
সিন এন জি আর অটো চলমান। বাড়ির
গেইটটা নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে।
উঠানে পদার্পণ করতেই কারো নজরদারি
লক্ষ করলাম। চৌধুরী লম্বা করে বললোঃ-
- কে?
আমি অবাক হয়ে লোকটাকে দেখছি। সব
কিছুতে নতুনত্বের ছুঁয়া লাগলে ও এই
লোকটার গায়ে লাগে নি। চৌধুরীর ডাক
শুনে মিহি ঘর থেকে তাড়াহুড়ো করে বের
হলো।
মিহিকে দেখে বুকটা যেনো মোচড় দিয়ে
উঠলো। ছোট্ট মিহিটা আজ অনেক বড় হয়ে
পরেছে। শাড়িটা এখন দিব্যি সামলাতে
পারছে।
ছেলে মানুষী এখন হয়তো আর করে না।
আমাকে চিনতে পেরেছে মনে হয়। মাথায়
কাপড় দিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। চোখ
বেয়ে বর্ষার পানি।
আমি কোনো রকম বললামঃ-
- আমি।
মিহি ছুটে আসতে পারছে না চৌধুরীর জন্য।
এর মাঝে চাচীরা ও হাজির। চৌধুরী আমার
সাথে কথা না বলে চলে গেলো। মিহি
এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে আমি
সামনে উপস্থিত।
ঘরে যাওয়ার পরে বললোঃ-
- চেহারার এই অবস্থা কেনো?
- বুড়ো হয়ে গেছি না?
- কে বললো? আমি কিন্তু সে কথা বলি নি।
আমি হাসলাম। এবার আমাদের এক খাট
থাকবে। এক মশারির আস্তরণে ঘুমাবো। এখন
আর কোনো সমস্যা নেই। চৌধুরীকে
নাতিনের মুখ দেখাতে। চৌধুরী হয়তো
গ্রামের চেয়ারম্যানের সাথে টক্করে হেরে
গিয়েছে কিন্তু আমি জিতে গিয়েছি। মিহি
আলমারিতে কাপড়চোপড় গোছাচ্ছে আমি
বললামঃ-
- মিহি।
- হুম।
- আসো।
- আছিই তো, বলেন।
- চলো যুদ্ধে লেগে পরি।
- কীসের যুদ্ধ?
- এবার পূর্ণবাসে গেলে ও চৌধুরীকে
নাতিনের মুখ দেখিয়েই যাবো।
কথাটা বলতেই মিহি স্থির দাঁড়িয়ে হাত
দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে বললোঃ-
- এরকম কথা মুখে বলে না।

Comments