আমার আপন মানুষ (পর্ব-৭/শেষ)
-কি বলবেন আব্বা বলেন? (আমি)
-তুমি কি বুঝতে পেরেছো কিছু? (বাবা)
-হ্যাঁ, আমার কিডনি নষ্ট হয়নি। এটা
আপনার নাটক ছিলো জুঁইয়ের আসল রুপটা
প্রকাশ পাওয়ার জন্য তাইনা আব্বা?
-হ্যাঁ, তবে আরেকটা সত্য লুকিয়ে আছে।
তা বাবা হয়ে ছেলেকে কিভাবে বলবো
বুঝতে পারছি না।
-কি সেটা? বলেন।
-তার আগে বলো, আমি যা জানতে চাইবো
তার সত্য জবাব দেবে কিনা?
-হ্যাঁ দেবো, বলেন।
-তুমি সব ধরনের নেশা করো কতোদিন
ধরে?
-আব্বা ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। যেদিন প্রথম
আপনাদের কাছে জুঁইয়ের কথা বলেছিলাম
আর সেদিন আপনারা সরাসরি ওকে ভুলে
যেতে বলেন।
তারপরেও কয়েকদিন বলার পরেও যখন
মেনে নিলেন না ঠিক তখন থেকেই আমি
আপনাদের না জানিয়ে নেশার জগতে চলে
যাই। আমি সব ধরনের নেশার জিনিষ পান
করতাম নিয়মিতই।
আমি একটা মেয়ের জন্য আপনাদের না
জানিয়ে এই অন্যায়টা করেছি।
আমায় দয়া করে ক্ষমা করে দেন আব্বা।
এসব বলে বাবার দিকে তাকালাম...ওনার
চোখে পানি!
-কি হয়েছে আব্বা, কাঁদছেন কেনো?
-আমরা তো তোমায় কোনকিছুর অভাব
দেইনি কখনো।
শুধু ঐ একটা মেয়েকে ভুলে যেতে
বলেছিলাম।
কারন মেয়েটির পরিবার সম্পর্কে জানতাম।
ওরা ভালো মনের মানুষ না, স্বার্থপর।
আর তুমি আমাদের না বলেই এমন জঘন্য পথ
বেছে নিলে?
জানো এতে কতো বড় ক্ষতি হয়েছে
তোমার?
-কি হয়েছে আমার? বলেন আব্বা।
-এই নাও, রিপোর্ট টা পড়ে দেখো। আমি
কিডনি নষ্টের ব্যপারটা রিপোর্ট না
দেখেই ডাক্তার কে বলতে বলেছিলাম যে
তোমার দুইটা কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে এইটা
বলে দেওয়ার জন্য। কারন এতে তুমি বুঝতে
পারবে কে আপন মানুষ আর কে নকল
ভালোবাসার মানুষ।
কে তোমার আপন, কে তোমার পর। হা
বুঝতেও পেরেছো এখন।
কিন্তু আসল রিপোর্টটা পেয়ে... আর বলতে
পারছে না বাবা। বাচ্চাদের মতো কাঁদছে।
আমি রিপোর্টটা হাতে নিয়ে পড়তে
লাগলাম...
আমার এক ধরনের ক্যান্সার হয়েছে। তবে
সময়মতো এর সঠিক চিকিৎসা করালে এই
ক্যান্সার নাকি ভালো হতে পারে। তার
আগে একটা অপারেশন করাতে হবে। প্রচুর
টাকা লাগবে এই চিকিৎসায়।
তারচেয়ে বড় কথা এই অপারেশনে মৃত্যু।
হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।কারন অপারেশন
সাকসেস হলে অনেকটা বেচে থাকার
আশ্বাস পাওয়া যাবে।
-রিপোর্ট পড়ে খুব বেশি অবাক লাগছে না
আমার।
কারন বেশ কিছুদিন হলো আমার কেমন
জানি লাগে।
মাঝে মধ্যে ভিতরে কষ্ট হয়। কখনো কখনো
গলা থেকে মুখ দিয়ে রক্ত আসে।
কখনো আবার মাথা ঘুরে পড়ে যাই।
আবার কখনো ভিতরের যন্ত্রনায় একা একা
লুকিয়ে কাঁদি।
কাউকে বলতে পারিনি। বুঝতে পারতাম
আমার ভিতরে বড় কোন সমস্যা হয়েছে।
কিছুদিন হলো তাই সব নেশা বাদ দিয়ে শুধু
সিগারেট টানি। তাও খুব বেশি না।
আমি ভেবেছিলাম সব ছেড়ে দিয়ে সবার
অজান্তে নিজের চিকিৎসা করাবো।কারন
আজ
আপন মানুষ গুলোর জন্য হাজার বছর
বাচতে ইচ্ছে করছে। বাবা আমার কাধে
হাত রেখেছে।
-আমি ব্যপারটা এখন না বললেও পারতাম
খোকা।
কিন্তু ঘরে একটা মেয়েকে এনে দিয়েছি।
মেয়েটা খুবই ভালো। আমি জানি তুমি ওকে
স্ত্রী হিসেবে মেনে নাওনি। আমি চাই
আল্লাহ্ যতদিন তোমায় ভালো রাখে অন্তর
ততোদিন মেয়েটাকে আপন
করে নাও। আল্লাহর কাছে নামাজ পড়ে
দোয়া করো তোমার রোগটা যেনো ভালো
করে দেয়।
আর তোমার চিকিৎসা আমি করাবো।যতো
টাকা লাগে। প্রয়োজনে সব জমি বিক্রি
করে দেবো।
-হা আব্বা। নাঈমার এর জন্যই আজ খুব
বেশি কষ্ট হচ্ছে।
মাত্র কয়টা দিন হলো ও আমাদের বাড়িতে
এসেছে। অথচ কতোটা ভালোবাসে ও
আমায়।
-হ্যাাঁ খোকা। আর এই ব্যাপারটা তোমার
মা বা পরিবারের অন্য কাউকে জানাবে
না কিন্তু।
আর আজকেই তোমাকে বাড়িতে নিয়ে
যাবো।
তবে তোমার যে ক্যান্সার হয়েছে এটা
পরিবারের কাউকে জানানো দরকার নাই।
সবাই এই নিয়ে টেনশনে থাকবে। শুধু কিডনি
নষ্টের ব্যাপারটা মিথ্যা এটাই বাড়ির
লোক জানবে।
তবেঐ জুঁই নামের মেয়েটাকে ডিভোর্স না
দেয়া পর্যন্ত এটা সবাইকে জানানোর
দরকার নাই।
বাড়িতে এসে দুইদিন পরই কোর্টে গিয়ে
আগে জুঁই নামের মেয়েটাকে মুক্তি দিলাম।
ডিভোর্স দিলাম ওকে।
আজ আমি চিন্তা মুক্ত। আজকেই আমি
আমার বউ "নাঈমা" কে বউয়ের অধিকার
দেবো। আজকেই হবে আমাদের নতুন করে
বাসর রাত।
রাত আট'টা বাজে। খাওয়া দাওয়া সেরে
ঘরে ঢুকলাম।
একটুপর নাঈমা এলো ঘরে,,,ওকে কাছে
ডাকলাম...
-আজকে বউ সাজবে তুমি। নিজ হাতে
তোমায় সাজিয়ে দেবো আমি।
আজকে হবে আমাদের বাসর রাত।
নাঈমা লজ্জায় মাথা নিচু করে আমার
কাছেমআসে।
আমি ওকে নিজ হাতে শাড়ি, গয়না পড়িয়ে
বউ সাজিয়েছি।
ও হাসছে মিটিমিটি। সাজানো শেষে
খাটে বসে আছে আমার লক্ষি বউ.......
নাঈমা।
আমি উঠে ওর ঘোমটা সরিয়ে দিলাম।
ঠিক একটা পরী"কে দেখতেছি আমি। কি
সুন্দর লজ্জাময় হাসি ওর।
-এই নাঈমা...
-হুমম বলো...
-আমি তোমায় খুব কষ্ট দিয়েছি এই কয়টা
দিন তাইনা।
-নাহ আমি কষ্ট পাইনি।
গভীর রাতে যখন তুমি উঠে আমার কপালে
একটা চুমু দিতে আমি তখন ঘুমের ভান করে
থাকতাম। তখন আমার সব কষ্ট দূর হয়ে
যেতো। যখন ঘুমের মধ্যেই তোমার ঐ বুকে
জড়িয়ে নিতে তখনই বুঝতাম এই লোকটা
অনেক ভালো। শুধু আমায় বউ হিসেবে মেনে
নিতে পারছে না পরিস্থিতির কারনে।
তোমার ভালোবাসার মানুষ যদি তোমার
হতো তবে সত্যিই আমি সব মেনে নিতাম।
এমন একটা মানুষের ঘরে চাকরানী হয়ে
থাকলেও সুখ। এই কথাগুলো বলে নাঈমা
আমার বুকে মাথা রাখে।
আমি ওকে বুকের উপর নিয়ে বিছানায় শুয়ে
পড়ি।
ওর মুখটা আমার মুখের সামনে।
কিছুটা লজ্জাময় হাসি দিয়ে আমায় বুকের
মধ্যে জড়িয়ে ধরে।
আমি ওর মিষ্টি ঠোটের দিকে তাকাই। ও
যেনো আমার চাহনিটা বুঝে পেলে।
অবশেষে শুরু হয় আমাদের নতুন জীবন।
ভোরে উঠে চেয়ে আছি নাঈমা এর ঘুমময়
মুখের দিকে।
আগামিকাল আমার অপারেশন। হয়তো হতে
পারে এটাই আমার শেষ দিন।
তাই এই সত্যটা ওকে জানানো দরকার।
ওকে ধীরে ডাক দিয়ে বুকে জড়িয়ে
নিলাম।
ধীরে ধীরে ওকে সব খুলে বললাম।
ও আমায় আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে
বলে...
তোমার কিচ্ছুই হবে না।
আমি নামাজ পড়ে তোমার জন্য দোয়া
করবো।
আল্লাহর কাছে আমার স্বামীর প্রান
ভিক্ষা চাইবো।
দেখবে তুমি ঠিকই সুস্থ হয়ে যাবে।
-হ পাগলি তাই যেন হয়। আল্লাহ্ আমাকে
ভালো করলে আমরা তার দেখানো পথেই
সংসার শুরু করবো।
আমার "আপন মানুষ" কে বুকে নিয়ে নতুন
করে জীবন সাজাবো।
এইভাবে কাটিয়ে দিব বাকি জীবন
যেখানে ভালোবাসা টুকু শুধুই
তোমার...........।
সমাপ্ত।
Comments
Post a Comment