আমার দায়িত্ববোধ সমূহ
দায়িত্ববোধ বেড়েছে তবে ভালবাসাটা কমে নি।
সকালে নিলুফা এসে একবার ডেকে দিয়ে গেছে। তখন থেকেই চোখ বন্ধ করে জেগে আছি। ভাবছি আজ সারাদিনে কি কি হতে পারে। আজ শুক্রবার, তার মানে আজ অফিসে যেতে হবে না। কিছু আত্মীয় আসার কথা আছে। বাবা মা, আমার এক বছর তিন মাসের ছোট মেয়েটাকে নিয়ে খেলছে। আর অন্যদিকে আমার স্ত্রী নিলুফা বিভিন্ন কাজে কর্মে ব্যস্ত। আমার জন্য তার সময় কোথায়। এখন আবারও মনে হয় আমি একা।
অন্য ছেলেদের মত আমি খুব একটা চালাক চতুর ছিলাম না। ছেলেদের সাথে ঠিকঠাক কথা হলেও মেয়েদের সামনে কেন জানি গুলিয়ে ফেলতাম নিজেকে। গুছিয়ে কথাও বলতে পারতাম না তাদের সামনে। তাই পড়াশুনা শেষ করে যখন চাকরী করছি তখন অব্দি প্রেম নামের শব্দটা আমার জিবনে যুক্ত হয়নি। এমনটা নয় যে কোন মেয়েকে ভাল লাগেনি। ভাল লেগেছে তবে তা কখনও প্রকাশ করা হয় নি। নিজেকে একলা কিভাবে উপভোগ করতে হয় এটা খুব ভালভাবেই শিখেছিলাম এই প্রেম না করার কারনে। অনেক বন্ধুই আমার প্রেম করত। আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তার প্রেমিকের সাথে কথা বলত। আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তারা ফোনেই নানান ভঙ্গিতে কথা বলত। আমি শুধুই হাসতাম এসব দেখে। যে মেয়েদের সাথে ভালভাবে কথাই বলতে পারে না, সে কি প্রেম করবে? তাই প্রেমের ইচ্ছে থাকলেও তা করা হয়নি আমার। চাকরী পাওয়ার পর হঠাত একদিন মা বিয়ের কথা বললেন। আমি সেদিন অফিসে এসে বিয়ের ব্যপারে ভাবছি, তখনি মনে হল, কোন মেয়ে কি আমাকে বিয়ে করবে? বা, যার সাথে বিয়ে হবে সে যদি আগে কারও সাথে প্রেম করে থাকে তাহলে কি হবে? বর্তমানের প্রেমিক প্রেমিকাদের মাঝে এমন কিছু কথাবার্তা আর টেক কেয়ার হয়, যেটা দেখে মনে হয় বিয়ের আগেই তারা স্বামী-স্ত্রী। আরে ভাই যেখানে একটা অনিশ্চিত সম্পর্কের ভিত্তিতে একজন ছেলে আর একজন মেয়ে নিজের সবকিছুর বহিঃপ্রকাশ করে দিতে পারে সে পরবর্তিতে নিজের স্বামী বা স্ত্রীকে কি দিবে। যেই ভালবাসা পাওয়ার অধিকার শুধুই তার স্বামীর বা স্ত্রীর সেই ভালবাসা তারা আগেই কাউকে দিয়ে দিচ্ছে। অথচ তারা সবাই জানে যে এটা একটা অনিশ্চিত সম্পর্ক। এরকম খুব কম মানুষই ভাগ্যমান যারা প্রেম করার পর একে অপরকে বিয়ে করতে পারে। এটা জেনেও কি কোন ভাল মানুষের মনে এটুকু চিন্তা হয় না যে আমরা একটু সতর্ক হয়ে প্রেম করি। প্রেম করলেই যে আমাদের মাঝে বিয়ে হবে এমনটা তো কোথাও লিখা নেই। হয়ত চেষ্টা করতে পারি তবে না হলে ভেবে দেখি তো, আমরা কি আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষের সাথে ধোঁকাবাজি করলাম না?? অফিসে বসে কাজের সাথে এসব কথা অনেকখন হল ভেবে চলেছি। সিদ্ধান্ত নিলাম আমি ব্যাচেলর হয়েই ভাল আছি তাই বিয়ে করছি না। বাসায় এসে মাকে জানালাম যে বিয়ে করছি না। কথাটা বলতেই মা কেমন গম্ভীর হয়ে গেলেন। আমি রুমে চলে আসলাম। একটু খারাপ লাগবে কিন্তু পরে ঠিক হয়ে যাবে। রাত প্রায় দশটা বাজে তবুও কেউ খাওয়ার কথা ভাবছে না। এদিকে আমার খিদেও পেয়েছে। তাই পেটে হাত বুলোতে বুলোতে ছোট বোনটার ঘরে গেলাম। গিয়েই দেখলাম সেখানে মা বাবাও আছে। আমি যেতেই বললাম, আজ কি খাওয়া করবে না কেউ? আমার খুব খিদে পেয়েছে, জলদি কেউ খেতে দাও। বাবা বলল, নিজে নিয়ে খা। আমরা কি তোর চাকর নাকি? আমি শুধু অবাক হয়ে বললাম, আজব এখানে চাকরের কি হল। আগেও তো কেউ খেতে দিত। আজ কি এমন হল? ছোট বোনটা ক্লাস সেভেন এ পরে। শেষে ও বলল, আচ্ছা ভাইয়া তুই বিয়ে করতে চাচ্ছিস না কেন? মা আর কতদিন এই সংসার একা চালাবে? আমি এবার বুঝতে পারলাম ঘটনা কি। ছোট বোনটাকে বললাম, তুই চুপ থাক। বেশি পাকনা হওয়ার দরকার নেই। বাবা মার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি বিয়ের ব্যপার নিয়ে ভেবেছি। আজকাল যে ধরনের মেয়ে বেড়িয়েছে তাদের ব্যপারে তো তোমরা জানই। জেনেশুনে কেনই বা বিপদ ডেকে আনছো? মা বলল, সব মেয়েই কি এক হল? আমরা তো দেখেশুনেই তোর বিয়ে দেব তাই না? আমি বললাম হ্যা কিন্তু, ( মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) বাবা বললেন, কোন কিন্তু নয়। আমরা কাল থেকে মেয়ে দেখব তোর বিয়ের জন্য। তোর বিয়ের বয়স হয়েছে তাই এটা আমাদের দায়িত্ব। আর তোর যদি কোন মেয়ে পছন্দ থাকে তো আমাদের বলতে পারিস। আশা করব তুই আমাদের কথার বরখেলাপ করবি না। আমি মাথা নিচু করে শুধু হ্যা সুচক মাথা নাড়ালাম। তখনি সবাই একটু স্বাভাবিক হল। মাকে দেখলাম অনেক খুশি হয়েছে। মা বলল, নিজের একটা ছেলে আমার, একটু ভালভাবে বিয়ে দেব বলে কত ইচ্ছা আমার। যাক ইচ্ছেটা তবে পুরন হতে যাচ্ছে বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেলেন। আমি বললাম, এবার খুশিতো তুমি। এখন দয়া করে খেতে দাও খিদে পেয়েছে অনেক। মা তখন গালটা টেনে একটু হেসে বলল, আয়, খেতে আয়। খাবার টেবিলে খাওয়ার দেখে আমি অবাক। সব আমার পছন্দের। ছোট বোনটা বলল, তোর জন্য রান্না করেছে সব। এখন এসব খাবার খাবি আর কয়েকদিন পর তোর বউয়ের ঝাড়ি খাবি হাহাহা। আমি বললাম, তুই চুপ কর নাহলে আজকে তোকেই খাব। ও বলল, বিয়ে করলে তোর বউকে এসব রাগ দেখাস হুম। বাবা মা দুজনেই এবার হাসলেন। আমিও হেসে ফেলে ছোট বোনটাকে বললাম, বিয়ে করলে তখন তোকে আর ঘুরতে নিয়ে যাব না। তোর জন্য আইসক্রিম নিয়ে আসবো না। সব বউকে নিয়ে হবে। এটা শুনে ছোট বোনটা বলল, কচু, তুই ঘুরতে না নিয়ে গেলে কি হবে আমি ভাবির সাথে ঘুরতে যাব। ভাবি আমাকে আইসক্রিম খাওয়াবে। তখন তোর কাছে কে আসবে হুম? এটা শুনে আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম, আগে বিয়েটা হোক তারপর দেখা যাবে। পরেরদিন অফিস থেকে এসেই দেখি কিছু আত্মীয় ড্রয়িং রুমে বসে আছে। বাবা মা তাদের সাথে কথা বলছেন। আমি সামনে গিয়ে সবাইকে সালাম দিতেই বাবা মা পরিচয় করিয়ে দিলেন। একজন বাবার বয়সী লোক উনি নাকি আমার দাদুর ভাইয়ের ছেলে মানে আমার বাবার চাচাতো ভাই মানে আমার চাচা। পাশেই উনার স্ত্রী। আর তার পাশে উনার মেয়ে। মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে আছে। আমি ভালমন্দ জিজ্ঞেস করতেই সে মাথা উঠিয়ে একটু হাসলো। মেয়েটাকে হাসতে দেখেই ভাল লেগে গেল। মনে মনে বলছি আমার বাবা মা কি এই মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছে না। স্নিগ্ধ চুলের সাথে কি মহনীয় হাসি মেয়েটার। পরোক্ষনে আবার মনে হল, এতো সুন্দর একটা মেয়ে, কখনও সিংগেল থাকতে পারে না। নিশ্চয়ই অনেকগুলো প্রেম করেছে। তখনিই মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমি রুমে এসে ফ্রেশ হতে গেলাম। কিছুক্ষন পর মা বাবা রুমে আসলো। আমাকে এসেই বলল, নিলুফাকে তোর কেমন লাগলো। আমি বললাম, কে নিলুফা? মা বলল, আরে যেই মেয়েটা বসে ছিল ওখানে। আমি বুঝতে পারলাম মেয়েটির নাম নিলুফা। বললাম, ভালই, খারাপ না। কিন্তু কেন জিজ্ঞেস করছো? বাবা বলল, এই মেয়েটির সাথে তোর বিয়ে হতে যাচ্ছে তাই জানতে এলাম তোর ভাল লেগেছে কিনা। আমি বললাম, কালকেই তোমরা মেয়ে দেখতে চাইলে আর আজকে একেবারে পাকা কথা হচ্ছে। বাবা বলল, শুধু পাকা কথাই না সপ্তাহ বাদেই তোদের বিয়ে আর আজ শুধু আংটি পরাবো। তুই পান্জাবিটা পরে বাইরে আয়। আমি খুশি হব না দুঃখ পাব ভেবে পাচ্ছি না। মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ভয় পাস না আমরা আছি তো। সোনা ছেলেটা কত বড় হয়ে গেলি তুই। আমি বললাম, আফসোস, বড় হয়ে গেছি আমি। কিছুক্ষন পর বাইরে বের হয়ে দেখি আরও কিছু লোকজন এসছে। আংটি পরানো হল। এরপর সবাই চলে গেল। সারাজিবন দেখে আসলাম মেয়ের বাড়িতে যেয়ে ছেলে পক্ষ আংটি পড়িয়ে আসে আর আমার বেলায় হল উল্টো। হাসব না কাঁদব ভেবে পাচ্ছি না। বোনটাকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, সব আগে থেকেই ঠিক করা ছিল শুধু তুই সেদিন বিয়েতে না করে টেনশনে ফেলে দিয়েছিলি। আমি হা হয়ে আছি এটা শুনে। তখন বোনটা আবারও বলল, এখন কোন টেনশন নেই। তবে এই দুদিন কত টেনশনে ছিলাম তোর জন্য জানিস? আমি ওর মাথায় একটা আস্তে করে মাইর দিয়ে বললাম, খুব পাকনামি তাই না? ও হেসে ফেলে বলল, যাই বল, ভাবিকে কিন্তু আমার সেই পছন্দ হইছে। আমি হাসলাম। সপ্তাহ খানেক বাদে আমার বিয়ে হল। বাসর ঘরে ঢুকে আমি দরজা আটকিয়ে বিছানার সামনে গিয়ে দাড়াতেই নিলুফা নিচে নেমে এসে পায়ে সালাম করল। আমি তাকে উপরে উঠিয়ে বললাম, আসলে কি বলতে হয় আমি জানি না। মেয়েটি মাথা নিচু করেই আছে। আপনি ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পরুন অনেক ধকল গেছে আপনার উপর আজ। এটা বলেই যখন আমি সোফায় বসতে যাচ্ছিলাম তখন নিলুফা আমায় বলল, আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কি ওযু করে এসে আমার সাথে দুইরাকাত নফল নামাজ পড়বেন? আমি এটা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। এখনকার মেয়েরাও কি তবে এসব মেনে চলে। আমি বললাম, হুম অবশ্যই। দুজনে ওযু করে এসে নামাজ পরলাম। নামাজ পড়া হলে আমি তাকে ঘুমিয়ে পরতে বললাম। নিলুফা বলল, আপনিও শুয়ে পরুন, আপনিও নিশ্চয়ই আজ খুব ক্লান্ত। আমি বালিশ নিয়ে সোফায় যাচ্ছিলাম তখন নিলুফা বলল, কোথায় যাচ্ছেন? আমি কিছু না বলে চুপ করে থাকলাম। নিলুফা বলল, আপনার বিছানাটা অনেক বড়। আমাদের দুজনের সুন্দর হয়ে যাবে। আমি ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলাম। নিলুফা হঠাত হেসে ফেলল। বলল, আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? আমি সত্যি একটু নারভাস হয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু ওকে সেটা বলা যাবে না। তাই নিলুফাকে বললাম, না ভয় পাব কেন। নিলুফা বলল, তাহলে আপনার ঘরে আপনিই ধীরে ধীরে চলছেন যে। আমি কিছু বললাম না। নিলুফা আবারও বলল, চলেন আজ রাতটা গল্প করেই কাটিয়ে দিই। এবার আমি একটু স্বস্তি পেলাম। মেয়েটা অনেক কথা বলল আমার সাথে। আমি শুনেই গেলাম সব। শুধু তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য হা হু বলে যাচ্ছিলাম। একটু পরেই ও বলল, ছাদে যাবেন? আমি হেসে বললাম, চলুন। ছাদে এসে ও আমার পাশে বসল। চাঁদটাকে দেখা যাচ্ছে না তবে পাশেই মনে হল একটা চাঁদ বসে আছে। বুঝতে পারলাম মেয়েটা অনেক সহজ সরল। সবকিছু সহজে মানিয়ে নিতে পারে। হঠাত সে বলল, আপনি এতো চুপচাপ কেন? এই বিয়েতে কি আপনি খুশি না? আমি এবার নিজের মনে যেসব কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল সেসব বললাম। মেয়েদের ব্যপারে আমার যা মনোভাব এবং আমি কেমন ছেলে তা সবটাই বললাম। তখন সে বলল, এজন্য আপনার মা বলছিল যে মা ছেলেটাকে একটু মানিয়ে নিও। আমি চুপ করে সামনে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটা আমার সামনে এসে বলল, জানেন আমি কখনও প্রেম করিনি। চেয়েছিলাম নিজের মনের মত কোন মানুষকে পেলেই তাকে নিজের করে নেব। আমি বললাম, তো, আপনি কি পেয়েছেন আপনার মনের মানুষকে? নিলুফা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, মনে হচ্ছে পেয়েছি তবে মানুষটা একটু ভিতু। আমি হাসলাম। নিলুফা বলল, আপনি কি আমায় মেনে নিতে পেরেছেন? আমি কিছু না বলে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে হাত দিয়ে জড়িয়ে নিলাম। অদ্ভুত এক শিহরন বয়ে গেল নিজের মনে। আমি নিলুফাকে বললাম, তুমি আমাকে আপনি করেই ডেকো। তোমার মুখে আপনিটাই ভাল লাগে আমার। আর তোমার উত্তর মনে হয় পেয়ে গেছো। ও বুকে মাথা রেখে বলল, হুম পেয়েছি। এরপর থেকে আমরা অনেক সুখে দিন কাটাতে লাগলাম। অফিসে যাওয়ার সময় টাই বেধে দেওয়া, কিছু দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটি, অফিসে পৌছে ফোন দেওয়া, লান্ঞ্চে খেয়েছি কিনা, তারাতারী যেন ফিরি, আসার সময় বোনটা আর ওর জন্য আইসক্রিম নিয়ে আসা, মাঝে মাঝে ঘুরতে যাওয়া, হঠাত বৃষ্টিতে ভেজা, ছাদে বসে চাঁদ দেখার সাথে একে অপরের সাথে কাটানো কিছু স্বরনীয় মুহুর্ত দিয়েই কেটে গেলো একটি বছর। এনিভার্সারীর দিনে সে আমাকে সবচেয়ে বড় খুশির সংবাদ দিয়েছিল। হ্যা, আমি নাকি বাবা হতে চলেছি। এর পর থেকে তার অনেক খেয়াল রাখি আমি। আগেও রাখতাম তবে তখন একটু বেশি করে রাখি। একদিন দুপুরে অফিসে কাজ করছি এমন সময় মা ফোন দিয়ে হাসপাতালে আসতে বলল। আমি বসকে বলে দ্রুতো চলে আসি। কিছুক্ষন পরেই ডাক্তার আমার একমাত্র মেয়ে অদ্রিকে আমার হাতে তুলে দেন। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করি আমার স্ত্রী কেমন আছে। ডাক্তার নিশ্চিন্ত মুখে বলেন উনিও ভাল আছেন। এর পরে আমরা নিলুফা আর অদ্রিকে নিয়ে সবাই বাসায় ফিরি। সবাই বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। নিলুফাও অদ্রিকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকত। প্রথম প্রথম কিছু মনে হত না কিন্তু পরে একসময় খেয়াল করলাম নিলুফা আমায় খুব একটা বেশি সময় দেয় না। অদ্রি যখন আমার কোলে থাকে তখন নিলুফা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে। কখনও রান্নার কাজে কখনও ছোট বোনটার সাথে কিসের সব কথা কখনও আবার বাবা মার সাহায্য। সব ভাল কাজই করে শুধু আমার জন্যই তার সময় হয় না। এখন কথাও আর ঘুরতে যাওয়া হয় না। বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। ছাদে বসে একসাথে চাঁদ দেখতে দেখতে একে অপরকে আর কিছু বলাই হয় না। সময় কোথায় তার এতো। প্রতিদিন অফিস করে এসে ফ্রেশ হয়ে অদ্রিকে যখন নেই তখন সে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে। রাতে খাবার পর নিলুফা অদ্রিকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে বাকি কাজ সেরে এসে ঘুমিয়ে পরে। আমারও কোন কাজ নেই তাই আমিও ঘুমিয়ে পরি। বাসার সব লোকের জন্য সময় আছে শুধু গত একবছর ধরে তার আমার জন্য কোন সময় নেই।এখন তার সাথে শুধুই কথা হয় মা বাবার কি লাগবে, ছোট বোনটার কি লাগবে, অদ্রির কি শেষ হয়ে গেল, কি আনতে হবে এসব। আমি যে তার স্বামী, তার সাথে আমার নিজেরও কিছু কথা থাকতে পারে এটা সে এখন বুঝেই না। কদিন থেকেই আমি একা চলতে শুরু করেছি। কারও সাথেই কথা বলছি না। অফিসে যাওয়ার সময় নিজে টাই বেধে নিলুফা কে না বলেই চলে যাচ্ছি। এরকম বেশ কয়েকদিন থেকেই হচ্ছে। কিন্তু কারও কোন প্রতিক্রিয়া দেখছি না।
কিরে ভাইয়া এখনো ঘুমাচ্ছিস তুই। আমি হাসলাম। এতোক্ষন চোখ বন্ধ করে শুয়ে এসবি ভাবছিলাম। ছোট বোনটা এসে বলল এটা। হেসে আস্তে করে বললাম, আমার আবার ঘুম বলেই ফ্রেশ হতে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে আসতেই ড্রয়িং এ কিছু আত্মীয় এসছে দেখলাম। নিলুফা রুমে এসে আমাকে কিছু জিনিস কিনে আনার কথা বলে। আমি না শুনেই বললাম, অফিসের কাজে একটু বাইরে যেতে হবে আজ। ফিরতে রাত হবে। বলেই রেডি হয়ে বাইরে চলে এলাম। নিলুফা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। রাতে বাসায় ফিরতে প্রায় দশটা বেজে গেল। সত্যি বলতে কোন কাজ ছিল না। নিজেকে একটু শান্তির জন্য বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলাম একা। এজন্যই বিয়ে করতে চাইনি আমি। রাতে এসে দেখি বাবা মা সবাই বসে আছে। আমি রুমে এসে ফ্রেশ হলাম। বাবা মা বলল, আজ বাইরে না গেলেই হত না? আমি বললাম, জরুরী কাজ ছিল তাই যেতে হয়েছে। এটা শুনে বাবা বলল, ঠিক আছে খেতে আয়। আমি বললাম, খেয়ে এসেছি আমি, তোমরা খেয়ে নাও। মা বলল, বউমা তোর জন্য না খেয়ে আছে আর তুই খেয়ে এসেছিস? আমি বললাম, কে বলেছিল তোমার বউমাকে না খেয়ে থাকতে? বলেই রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। অদ্রি পাশে শুয়ে আছে। আমিও চোখ বন্ধ করে আছি। একটু পরে নিলুফা এসে পাশে শুয়ে পড়ল। পরেরদিন সকালে নিলুফা ঘুম থেকে ডেকে তুলল। উঠে দেখি সে এখনো দাড়িয়ে আছে সামনে। আমি তাকে দেখে বললাম, কিছু বলবে? সে কিছু না বলে চলে গেল। একটু পরে ফ্রেশ হয়ে অফিসের জন্য রেডি হচ্ছি এমন সময় আবার নিলুফা রুমে এলো। আশ্চর্য হচ্ছি গত একবছরে এরকমটা খুব কমই হয়েছে। সে এসে আমার টাই বেধে দিতে যাচ্ছিল কিন্তু টাইটা নিজে নিয়ে হাসিমুখে বললাম, আমি পারবো পরে নিতে। এটা বলেই রেডি হয়ে একটু নাস্তা করে অফিসে এলাম। অফিসে আসার কিছুক্ষন পরে নিলুফা ফোন দিয়ে বলল, আজ বিকেলে কি একটু সময় দিতে পারবেন? আমি একটু ভেবে বললাম হ্যা পারবো। তখন ও বলল, তাহলে বিকেল চারটায় নদীর পাড়ে থাকবেন। বিকেল চারটা বাজার আগেই সেখানে পৌছে গেলাম। সবুজ শাড়ি সাথে খোলা চুলে সামনের জনকে অমায়িক লাগছিল। হ্যা সামনে নিলুফাই দাড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে বললাম,
- অনেক আগেই চলে এসেছে।
- আপনিও তো আগে এসেছেন।(নিলুফা)
- (তর্ক করার ইচ্ছে নেই তাই বললাম) কেন ডেকেছো?
- অনেকদিন ধরে আমরা ঘুরতে বের হই না তাই আজ আসতে বললাম।(নিলুফা)
- একটু ভুল বললে নিলুফা। অনেকদিন আমি কারও সাথে ঘুরতে যাই না। তুমি নিহার সাথে ঠিকই ঘুরতে বের হও। ( নিহা আমার ছোট বোনের নাম) আর এতোদিন আমার সাথে ঘুরতে আসনি আজও না আসলে কিছু হত না।
- (করুন চোখে তাকিয়ে) আপনি এভাবে কেন বলছেন?(নিলুফা)
- কেন বলব না বলতে পার। তোমার মনে পরে কবে তুমি আমি একসাথে একটু আমাদের কথা বলেছি। আগে প্রতিদিন অফিসে গেলে কথা বলতে, লান্ঞ্চে কথা বলতে, জলদি আসতে বলতে। এখন কি আর বল এসব? কবে আমরা একসাথে ছাদে বসে নিজেদের মনের কথা একে অপরকে বলেছি মনে পরে তোমার? তোমার মা বাবার জন্য সময় হয়, নিহার জন্য সময় হয়। আমি জানি এসব করা জরুরী। তাই বলে আমাকে এই একটা বছরে একটু সময় দেওয়া যেত না। বিয়ের আগে একা ছিলাম। তুমি এসে আমার একাকিত্বকে নিজের করে নিয়ে আমাকে তোমার সাথে মানিয়ে নিলে। এই একবছর কি তাহলে আমাকে শাস্তি দিলে? আমি তো আবারও একা হয়ে গেছি।
- আসলে সংসারের প্রায় সব কাজ আমাকে করতে হয়। মার বয়স হয়েছে। নিহার পড়াশুনা রয়েছে। বাবার বিভিন্ন কাজ আছে। তাই এই পরিবারটা আমাকেই দেখতে হয়। অদ্রিকে অনেক দেখাশোনা করতে হয়। তার প্রতিদিন খাওয়ানো, কাপড় ধোয়া এসব কিছু করতেই দিন পার হয়ে যেত। রাতে আপনি এলে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পরতেন। তাহলে বলুন আমি কিভাবে সময় দেব। (নিলুফা)
- তাই বলে তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষকেই ভুলে যাবে। আজ যেমনভাবে ডেকেছো, পারতে না অন্যদিন এভাবে ডাকতে। খুব বেশি কিছু কি চেয়েছিলাম। অফিসে যাওয়ার আগে একটু কাছে আসতে পারতে না। অফিসে থাকাকালীন একটিবার ফোন দিতে পারতে না। জানি অনেক ক্লান্ত হয়ে রাতে ঘুমাও তুমি। তবুও কোন এক জোৎস্না রাতে ছাদে আমার কাধে মাথা রেখে গল্প করা যেত না। ঘুম থেকে উঠানোর সময় কি একটু আমার সামনে থাকা যায় না। আমিও সারাদিন অফিসে কাজ করি। ক্লান্ত হয়ে এসে অদ্রিকে আমিও দেখাশোনা করি। তুমি বলতে পারও কবে আমরা আমাদের মেয়েটার সাথে একসাথে খেলেছি। আমি কি বুঝবো তবে। ভালবাসা আমার প্রতি হারিয়ে গেছে এটাই তো বুঝতে হবে।
- ভালবাসাটা কখনই হারায়নি। ঘুম থেকে উঠিয়ে আপনার জন্য নাস্তা তৈরী করতে হয় আমার। তাই উঠিয়ে দিয়েই রান্নাঘরে যেতে হয়। অদ্রির জন্য অফিসে যাওয়ার পর আর কথা বলতে পারি না আপনার সাথে। তাকে খাওয়াতে হয়, ঘুমোতে হয়। রাতে বাসায় এসে আপনি ঘুমিয়ে পরেন তাই আর ডাকি না। আমার কি ইচ্ছে হয় না আমার মনে বাস করা সেই মানুষটার সাথে একটু সময় কাটাতে।(নিলুফা)
- এসব বলে আর কি লাভ বল। আমরা আর আগের মত নেই। এটা মানতে হবে।
- এই বাড়িতে আসার পর আমার অনেক দায়িত্ব রয়েছে। অদ্রি হওয়ার পর তার পেছনেই অনেকটা সময় দিতে হয়। কিন্তু এতসবের পরেও আপনাকে আমার সময় দেওয়া উচিত ছিল। এর জন্য আমি অনেক দুঃখিত। কিন্তু তাই বলে কি আপনি পারতেন না? আমি তো প্রতিটা দিনই অপেক্ষা করতাম, এই বুঝি আপনি আইসক্রিম হাতে বাসায় এলেন। শুক্রবারে কোন এক বিকেলে বুঝি আমায় নিয়ে ঘুরতে যাবেন।(নিলুফা)
- থাক আর বলোনা। আমি একাই ভাল আছি আবারও। বলেই চলে আসছিলাম তখনি নিলুফা আমার হাতটা ধরে বলল, একবার আমাকে সুযোগ দিন প্লিজ। আমি ক্ষমা চাচ্ছি আপনার কাছে। আমি বললাম, ক্ষমা চাচ্ছ কেন, আমি তো কোন শাস্তি দিচ্ছি না। তুমি তো ভালই আছো। ও বলল, এভাবে আর ইগনোর করবেন না আমাকে। আপনার এই ইগনোর করাটাই যে আমার শাস্তি। আমি যে সহ্য করতে পারি না। এতো কাজের পরও আমি তো এটা ভেবেই বেঁচে আছি যে আপনি আমার পাশে আছেন। আমি বললাম, এতদিন কি তবে আমার খুব ভাল লাগছিল? ও বলল, আপনার প্রতি আমার ভালবাসা বিন্দুমাত্র কমে নি বরং দিনদিন বেড়েছে। শুধু সাংসারিক দায়িত্ববোধটা একটু বেড়ে গেছে। তবুও বলছি এবারের মত কি ক্ষমা করা যায় না বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো। আমি চিন্তা করছি, আসলেই কি দোষটা তার একার। আমিও তো পারতাম তাকে কিছুটা সময় নিজে থেকে দিতে। কিন্তু এখন এই মেয়ের কান্নাটা আমার একদমি সহ্য হচ্ছে না। তাই তার মাথায় হাত দিয়ে বললাম, এই কান্না করবেনা একদম। কতসুন্দর করে সেজে এসেছো এভাবে কান্না করার জন্য। ও বলল, আর হবে না এরকম। প্লিজ ক্ষমা করে দাও। আমি তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললাম, আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কি আছে। আমিতো তোমারই অর্ধাঙ্গ। এখন বাসায় চলো অদ্রি অনেকখন আমাদের ছাড়াই আছে। চোখের পানি মুছে দুজন একসাথে বাসায় চললাম। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ও বলল, আজ আপনার বুকে মাথা রেখে ঘুমাই? আমি হেসে তাকে আমার বুকে টেনে নিলাম। পাশেই আমার মেয়ে অদ্রি ঘুমিয়ে রয়েছে। পরেরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে ঠিক আগের মত করে ও টাই বাধতে আসল। টাই বাধা হলে আমি তাকে জড়িয়ে নিলাম। ও লজ্জা পেয়ে বলল, কি করছেন। আমি বললাম, একবছর আগে যা করতাম। এতো লজ্জার কি আছে। ও বলল, অনেকদিন পর তাই একটু...আমি হেসে বললাম চল তাহলে তোমার লজ্জাটা ভেঙ্গে দিই আগে। একটু দুষ্টুমি করে যখন অফিসে আসলাম তখন ফোনে মেসেজ আসলো, দায়িত্ববোধটা একটু বেড়ে গেলেও ভালবাসাটা কিন্তু অনেক গুনে বেড়েছে। আমি হাসলাম মেসেজটা পড়ে। রিপ্লাই করলাম, দায়িত্বটা ভাগাভাগি করে নিতে পারি তবে ভালবাসাটা শুধুই আমার চাই। নিলুফা তখন ফোন দিয়ে বলল, আজ আসার সময় আইসক্রিম নিয়ে আসবেন তিনটা। আমি বললাম তিনটা কেন। ও বলল, একটা নিহা, একটা অদ্রি আর একটা রাতে শুধু আপনি আর আমি বলেই ফোন কেটে দিল। আমি ভাবলাম, এই সব গুনগুলই তো তার ভালবাসা যেটা মিস করেছি এই একটি বছর। তবে এখন এই ভালাবাসার প্রহরগুলো শুধুই আমার জন্য......
সকালে নিলুফা এসে একবার ডেকে দিয়ে গেছে। তখন থেকেই চোখ বন্ধ করে জেগে আছি। ভাবছি আজ সারাদিনে কি কি হতে পারে। আজ শুক্রবার, তার মানে আজ অফিসে যেতে হবে না। কিছু আত্মীয় আসার কথা আছে। বাবা মা, আমার এক বছর তিন মাসের ছোট মেয়েটাকে নিয়ে খেলছে। আর অন্যদিকে আমার স্ত্রী নিলুফা বিভিন্ন কাজে কর্মে ব্যস্ত। আমার জন্য তার সময় কোথায়। এখন আবারও মনে হয় আমি একা।
অন্য ছেলেদের মত আমি খুব একটা চালাক চতুর ছিলাম না। ছেলেদের সাথে ঠিকঠাক কথা হলেও মেয়েদের সামনে কেন জানি গুলিয়ে ফেলতাম নিজেকে। গুছিয়ে কথাও বলতে পারতাম না তাদের সামনে। তাই পড়াশুনা শেষ করে যখন চাকরী করছি তখন অব্দি প্রেম নামের শব্দটা আমার জিবনে যুক্ত হয়নি। এমনটা নয় যে কোন মেয়েকে ভাল লাগেনি। ভাল লেগেছে তবে তা কখনও প্রকাশ করা হয় নি। নিজেকে একলা কিভাবে উপভোগ করতে হয় এটা খুব ভালভাবেই শিখেছিলাম এই প্রেম না করার কারনে। অনেক বন্ধুই আমার প্রেম করত। আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তার প্রেমিকের সাথে কথা বলত। আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তারা ফোনেই নানান ভঙ্গিতে কথা বলত। আমি শুধুই হাসতাম এসব দেখে। যে মেয়েদের সাথে ভালভাবে কথাই বলতে পারে না, সে কি প্রেম করবে? তাই প্রেমের ইচ্ছে থাকলেও তা করা হয়নি আমার। চাকরী পাওয়ার পর হঠাত একদিন মা বিয়ের কথা বললেন। আমি সেদিন অফিসে এসে বিয়ের ব্যপারে ভাবছি, তখনি মনে হল, কোন মেয়ে কি আমাকে বিয়ে করবে? বা, যার সাথে বিয়ে হবে সে যদি আগে কারও সাথে প্রেম করে থাকে তাহলে কি হবে? বর্তমানের প্রেমিক প্রেমিকাদের মাঝে এমন কিছু কথাবার্তা আর টেক কেয়ার হয়, যেটা দেখে মনে হয় বিয়ের আগেই তারা স্বামী-স্ত্রী। আরে ভাই যেখানে একটা অনিশ্চিত সম্পর্কের ভিত্তিতে একজন ছেলে আর একজন মেয়ে নিজের সবকিছুর বহিঃপ্রকাশ করে দিতে পারে সে পরবর্তিতে নিজের স্বামী বা স্ত্রীকে কি দিবে। যেই ভালবাসা পাওয়ার অধিকার শুধুই তার স্বামীর বা স্ত্রীর সেই ভালবাসা তারা আগেই কাউকে দিয়ে দিচ্ছে। অথচ তারা সবাই জানে যে এটা একটা অনিশ্চিত সম্পর্ক। এরকম খুব কম মানুষই ভাগ্যমান যারা প্রেম করার পর একে অপরকে বিয়ে করতে পারে। এটা জেনেও কি কোন ভাল মানুষের মনে এটুকু চিন্তা হয় না যে আমরা একটু সতর্ক হয়ে প্রেম করি। প্রেম করলেই যে আমাদের মাঝে বিয়ে হবে এমনটা তো কোথাও লিখা নেই। হয়ত চেষ্টা করতে পারি তবে না হলে ভেবে দেখি তো, আমরা কি আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষের সাথে ধোঁকাবাজি করলাম না?? অফিসে বসে কাজের সাথে এসব কথা অনেকখন হল ভেবে চলেছি। সিদ্ধান্ত নিলাম আমি ব্যাচেলর হয়েই ভাল আছি তাই বিয়ে করছি না। বাসায় এসে মাকে জানালাম যে বিয়ে করছি না। কথাটা বলতেই মা কেমন গম্ভীর হয়ে গেলেন। আমি রুমে চলে আসলাম। একটু খারাপ লাগবে কিন্তু পরে ঠিক হয়ে যাবে। রাত প্রায় দশটা বাজে তবুও কেউ খাওয়ার কথা ভাবছে না। এদিকে আমার খিদেও পেয়েছে। তাই পেটে হাত বুলোতে বুলোতে ছোট বোনটার ঘরে গেলাম। গিয়েই দেখলাম সেখানে মা বাবাও আছে। আমি যেতেই বললাম, আজ কি খাওয়া করবে না কেউ? আমার খুব খিদে পেয়েছে, জলদি কেউ খেতে দাও। বাবা বলল, নিজে নিয়ে খা। আমরা কি তোর চাকর নাকি? আমি শুধু অবাক হয়ে বললাম, আজব এখানে চাকরের কি হল। আগেও তো কেউ খেতে দিত। আজ কি এমন হল? ছোট বোনটা ক্লাস সেভেন এ পরে। শেষে ও বলল, আচ্ছা ভাইয়া তুই বিয়ে করতে চাচ্ছিস না কেন? মা আর কতদিন এই সংসার একা চালাবে? আমি এবার বুঝতে পারলাম ঘটনা কি। ছোট বোনটাকে বললাম, তুই চুপ থাক। বেশি পাকনা হওয়ার দরকার নেই। বাবা মার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি বিয়ের ব্যপার নিয়ে ভেবেছি। আজকাল যে ধরনের মেয়ে বেড়িয়েছে তাদের ব্যপারে তো তোমরা জানই। জেনেশুনে কেনই বা বিপদ ডেকে আনছো? মা বলল, সব মেয়েই কি এক হল? আমরা তো দেখেশুনেই তোর বিয়ে দেব তাই না? আমি বললাম হ্যা কিন্তু, ( মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) বাবা বললেন, কোন কিন্তু নয়। আমরা কাল থেকে মেয়ে দেখব তোর বিয়ের জন্য। তোর বিয়ের বয়স হয়েছে তাই এটা আমাদের দায়িত্ব। আর তোর যদি কোন মেয়ে পছন্দ থাকে তো আমাদের বলতে পারিস। আশা করব তুই আমাদের কথার বরখেলাপ করবি না। আমি মাথা নিচু করে শুধু হ্যা সুচক মাথা নাড়ালাম। তখনি সবাই একটু স্বাভাবিক হল। মাকে দেখলাম অনেক খুশি হয়েছে। মা বলল, নিজের একটা ছেলে আমার, একটু ভালভাবে বিয়ে দেব বলে কত ইচ্ছা আমার। যাক ইচ্ছেটা তবে পুরন হতে যাচ্ছে বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেলেন। আমি বললাম, এবার খুশিতো তুমি। এখন দয়া করে খেতে দাও খিদে পেয়েছে অনেক। মা তখন গালটা টেনে একটু হেসে বলল, আয়, খেতে আয়। খাবার টেবিলে খাওয়ার দেখে আমি অবাক। সব আমার পছন্দের। ছোট বোনটা বলল, তোর জন্য রান্না করেছে সব। এখন এসব খাবার খাবি আর কয়েকদিন পর তোর বউয়ের ঝাড়ি খাবি হাহাহা। আমি বললাম, তুই চুপ কর নাহলে আজকে তোকেই খাব। ও বলল, বিয়ে করলে তোর বউকে এসব রাগ দেখাস হুম। বাবা মা দুজনেই এবার হাসলেন। আমিও হেসে ফেলে ছোট বোনটাকে বললাম, বিয়ে করলে তখন তোকে আর ঘুরতে নিয়ে যাব না। তোর জন্য আইসক্রিম নিয়ে আসবো না। সব বউকে নিয়ে হবে। এটা শুনে ছোট বোনটা বলল, কচু, তুই ঘুরতে না নিয়ে গেলে কি হবে আমি ভাবির সাথে ঘুরতে যাব। ভাবি আমাকে আইসক্রিম খাওয়াবে। তখন তোর কাছে কে আসবে হুম? এটা শুনে আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম, আগে বিয়েটা হোক তারপর দেখা যাবে। পরেরদিন অফিস থেকে এসেই দেখি কিছু আত্মীয় ড্রয়িং রুমে বসে আছে। বাবা মা তাদের সাথে কথা বলছেন। আমি সামনে গিয়ে সবাইকে সালাম দিতেই বাবা মা পরিচয় করিয়ে দিলেন। একজন বাবার বয়সী লোক উনি নাকি আমার দাদুর ভাইয়ের ছেলে মানে আমার বাবার চাচাতো ভাই মানে আমার চাচা। পাশেই উনার স্ত্রী। আর তার পাশে উনার মেয়ে। মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে আছে। আমি ভালমন্দ জিজ্ঞেস করতেই সে মাথা উঠিয়ে একটু হাসলো। মেয়েটাকে হাসতে দেখেই ভাল লেগে গেল। মনে মনে বলছি আমার বাবা মা কি এই মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছে না। স্নিগ্ধ চুলের সাথে কি মহনীয় হাসি মেয়েটার। পরোক্ষনে আবার মনে হল, এতো সুন্দর একটা মেয়ে, কখনও সিংগেল থাকতে পারে না। নিশ্চয়ই অনেকগুলো প্রেম করেছে। তখনিই মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমি রুমে এসে ফ্রেশ হতে গেলাম। কিছুক্ষন পর মা বাবা রুমে আসলো। আমাকে এসেই বলল, নিলুফাকে তোর কেমন লাগলো। আমি বললাম, কে নিলুফা? মা বলল, আরে যেই মেয়েটা বসে ছিল ওখানে। আমি বুঝতে পারলাম মেয়েটির নাম নিলুফা। বললাম, ভালই, খারাপ না। কিন্তু কেন জিজ্ঞেস করছো? বাবা বলল, এই মেয়েটির সাথে তোর বিয়ে হতে যাচ্ছে তাই জানতে এলাম তোর ভাল লেগেছে কিনা। আমি বললাম, কালকেই তোমরা মেয়ে দেখতে চাইলে আর আজকে একেবারে পাকা কথা হচ্ছে। বাবা বলল, শুধু পাকা কথাই না সপ্তাহ বাদেই তোদের বিয়ে আর আজ শুধু আংটি পরাবো। তুই পান্জাবিটা পরে বাইরে আয়। আমি খুশি হব না দুঃখ পাব ভেবে পাচ্ছি না। মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ভয় পাস না আমরা আছি তো। সোনা ছেলেটা কত বড় হয়ে গেলি তুই। আমি বললাম, আফসোস, বড় হয়ে গেছি আমি। কিছুক্ষন পর বাইরে বের হয়ে দেখি আরও কিছু লোকজন এসছে। আংটি পরানো হল। এরপর সবাই চলে গেল। সারাজিবন দেখে আসলাম মেয়ের বাড়িতে যেয়ে ছেলে পক্ষ আংটি পড়িয়ে আসে আর আমার বেলায় হল উল্টো। হাসব না কাঁদব ভেবে পাচ্ছি না। বোনটাকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, সব আগে থেকেই ঠিক করা ছিল শুধু তুই সেদিন বিয়েতে না করে টেনশনে ফেলে দিয়েছিলি। আমি হা হয়ে আছি এটা শুনে। তখন বোনটা আবারও বলল, এখন কোন টেনশন নেই। তবে এই দুদিন কত টেনশনে ছিলাম তোর জন্য জানিস? আমি ওর মাথায় একটা আস্তে করে মাইর দিয়ে বললাম, খুব পাকনামি তাই না? ও হেসে ফেলে বলল, যাই বল, ভাবিকে কিন্তু আমার সেই পছন্দ হইছে। আমি হাসলাম। সপ্তাহ খানেক বাদে আমার বিয়ে হল। বাসর ঘরে ঢুকে আমি দরজা আটকিয়ে বিছানার সামনে গিয়ে দাড়াতেই নিলুফা নিচে নেমে এসে পায়ে সালাম করল। আমি তাকে উপরে উঠিয়ে বললাম, আসলে কি বলতে হয় আমি জানি না। মেয়েটি মাথা নিচু করেই আছে। আপনি ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পরুন অনেক ধকল গেছে আপনার উপর আজ। এটা বলেই যখন আমি সোফায় বসতে যাচ্ছিলাম তখন নিলুফা আমায় বলল, আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কি ওযু করে এসে আমার সাথে দুইরাকাত নফল নামাজ পড়বেন? আমি এটা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। এখনকার মেয়েরাও কি তবে এসব মেনে চলে। আমি বললাম, হুম অবশ্যই। দুজনে ওযু করে এসে নামাজ পরলাম। নামাজ পড়া হলে আমি তাকে ঘুমিয়ে পরতে বললাম। নিলুফা বলল, আপনিও শুয়ে পরুন, আপনিও নিশ্চয়ই আজ খুব ক্লান্ত। আমি বালিশ নিয়ে সোফায় যাচ্ছিলাম তখন নিলুফা বলল, কোথায় যাচ্ছেন? আমি কিছু না বলে চুপ করে থাকলাম। নিলুফা বলল, আপনার বিছানাটা অনেক বড়। আমাদের দুজনের সুন্দর হয়ে যাবে। আমি ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলাম। নিলুফা হঠাত হেসে ফেলল। বলল, আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? আমি সত্যি একটু নারভাস হয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু ওকে সেটা বলা যাবে না। তাই নিলুফাকে বললাম, না ভয় পাব কেন। নিলুফা বলল, তাহলে আপনার ঘরে আপনিই ধীরে ধীরে চলছেন যে। আমি কিছু বললাম না। নিলুফা আবারও বলল, চলেন আজ রাতটা গল্প করেই কাটিয়ে দিই। এবার আমি একটু স্বস্তি পেলাম। মেয়েটা অনেক কথা বলল আমার সাথে। আমি শুনেই গেলাম সব। শুধু তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য হা হু বলে যাচ্ছিলাম। একটু পরেই ও বলল, ছাদে যাবেন? আমি হেসে বললাম, চলুন। ছাদে এসে ও আমার পাশে বসল। চাঁদটাকে দেখা যাচ্ছে না তবে পাশেই মনে হল একটা চাঁদ বসে আছে। বুঝতে পারলাম মেয়েটা অনেক সহজ সরল। সবকিছু সহজে মানিয়ে নিতে পারে। হঠাত সে বলল, আপনি এতো চুপচাপ কেন? এই বিয়েতে কি আপনি খুশি না? আমি এবার নিজের মনে যেসব কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল সেসব বললাম। মেয়েদের ব্যপারে আমার যা মনোভাব এবং আমি কেমন ছেলে তা সবটাই বললাম। তখন সে বলল, এজন্য আপনার মা বলছিল যে মা ছেলেটাকে একটু মানিয়ে নিও। আমি চুপ করে সামনে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটা আমার সামনে এসে বলল, জানেন আমি কখনও প্রেম করিনি। চেয়েছিলাম নিজের মনের মত কোন মানুষকে পেলেই তাকে নিজের করে নেব। আমি বললাম, তো, আপনি কি পেয়েছেন আপনার মনের মানুষকে? নিলুফা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, মনে হচ্ছে পেয়েছি তবে মানুষটা একটু ভিতু। আমি হাসলাম। নিলুফা বলল, আপনি কি আমায় মেনে নিতে পেরেছেন? আমি কিছু না বলে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে হাত দিয়ে জড়িয়ে নিলাম। অদ্ভুত এক শিহরন বয়ে গেল নিজের মনে। আমি নিলুফাকে বললাম, তুমি আমাকে আপনি করেই ডেকো। তোমার মুখে আপনিটাই ভাল লাগে আমার। আর তোমার উত্তর মনে হয় পেয়ে গেছো। ও বুকে মাথা রেখে বলল, হুম পেয়েছি। এরপর থেকে আমরা অনেক সুখে দিন কাটাতে লাগলাম। অফিসে যাওয়ার সময় টাই বেধে দেওয়া, কিছু দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটি, অফিসে পৌছে ফোন দেওয়া, লান্ঞ্চে খেয়েছি কিনা, তারাতারী যেন ফিরি, আসার সময় বোনটা আর ওর জন্য আইসক্রিম নিয়ে আসা, মাঝে মাঝে ঘুরতে যাওয়া, হঠাত বৃষ্টিতে ভেজা, ছাদে বসে চাঁদ দেখার সাথে একে অপরের সাথে কাটানো কিছু স্বরনীয় মুহুর্ত দিয়েই কেটে গেলো একটি বছর। এনিভার্সারীর দিনে সে আমাকে সবচেয়ে বড় খুশির সংবাদ দিয়েছিল। হ্যা, আমি নাকি বাবা হতে চলেছি। এর পর থেকে তার অনেক খেয়াল রাখি আমি। আগেও রাখতাম তবে তখন একটু বেশি করে রাখি। একদিন দুপুরে অফিসে কাজ করছি এমন সময় মা ফোন দিয়ে হাসপাতালে আসতে বলল। আমি বসকে বলে দ্রুতো চলে আসি। কিছুক্ষন পরেই ডাক্তার আমার একমাত্র মেয়ে অদ্রিকে আমার হাতে তুলে দেন। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করি আমার স্ত্রী কেমন আছে। ডাক্তার নিশ্চিন্ত মুখে বলেন উনিও ভাল আছেন। এর পরে আমরা নিলুফা আর অদ্রিকে নিয়ে সবাই বাসায় ফিরি। সবাই বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। নিলুফাও অদ্রিকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকত। প্রথম প্রথম কিছু মনে হত না কিন্তু পরে একসময় খেয়াল করলাম নিলুফা আমায় খুব একটা বেশি সময় দেয় না। অদ্রি যখন আমার কোলে থাকে তখন নিলুফা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে। কখনও রান্নার কাজে কখনও ছোট বোনটার সাথে কিসের সব কথা কখনও আবার বাবা মার সাহায্য। সব ভাল কাজই করে শুধু আমার জন্যই তার সময় হয় না। এখন কথাও আর ঘুরতে যাওয়া হয় না। বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। ছাদে বসে একসাথে চাঁদ দেখতে দেখতে একে অপরকে আর কিছু বলাই হয় না। সময় কোথায় তার এতো। প্রতিদিন অফিস করে এসে ফ্রেশ হয়ে অদ্রিকে যখন নেই তখন সে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে। রাতে খাবার পর নিলুফা অদ্রিকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে বাকি কাজ সেরে এসে ঘুমিয়ে পরে। আমারও কোন কাজ নেই তাই আমিও ঘুমিয়ে পরি। বাসার সব লোকের জন্য সময় আছে শুধু গত একবছর ধরে তার আমার জন্য কোন সময় নেই।এখন তার সাথে শুধুই কথা হয় মা বাবার কি লাগবে, ছোট বোনটার কি লাগবে, অদ্রির কি শেষ হয়ে গেল, কি আনতে হবে এসব। আমি যে তার স্বামী, তার সাথে আমার নিজেরও কিছু কথা থাকতে পারে এটা সে এখন বুঝেই না। কদিন থেকেই আমি একা চলতে শুরু করেছি। কারও সাথেই কথা বলছি না। অফিসে যাওয়ার সময় নিজে টাই বেধে নিলুফা কে না বলেই চলে যাচ্ছি। এরকম বেশ কয়েকদিন থেকেই হচ্ছে। কিন্তু কারও কোন প্রতিক্রিয়া দেখছি না।
কিরে ভাইয়া এখনো ঘুমাচ্ছিস তুই। আমি হাসলাম। এতোক্ষন চোখ বন্ধ করে শুয়ে এসবি ভাবছিলাম। ছোট বোনটা এসে বলল এটা। হেসে আস্তে করে বললাম, আমার আবার ঘুম বলেই ফ্রেশ হতে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে আসতেই ড্রয়িং এ কিছু আত্মীয় এসছে দেখলাম। নিলুফা রুমে এসে আমাকে কিছু জিনিস কিনে আনার কথা বলে। আমি না শুনেই বললাম, অফিসের কাজে একটু বাইরে যেতে হবে আজ। ফিরতে রাত হবে। বলেই রেডি হয়ে বাইরে চলে এলাম। নিলুফা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। রাতে বাসায় ফিরতে প্রায় দশটা বেজে গেল। সত্যি বলতে কোন কাজ ছিল না। নিজেকে একটু শান্তির জন্য বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলাম একা। এজন্যই বিয়ে করতে চাইনি আমি। রাতে এসে দেখি বাবা মা সবাই বসে আছে। আমি রুমে এসে ফ্রেশ হলাম। বাবা মা বলল, আজ বাইরে না গেলেই হত না? আমি বললাম, জরুরী কাজ ছিল তাই যেতে হয়েছে। এটা শুনে বাবা বলল, ঠিক আছে খেতে আয়। আমি বললাম, খেয়ে এসেছি আমি, তোমরা খেয়ে নাও। মা বলল, বউমা তোর জন্য না খেয়ে আছে আর তুই খেয়ে এসেছিস? আমি বললাম, কে বলেছিল তোমার বউমাকে না খেয়ে থাকতে? বলেই রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। অদ্রি পাশে শুয়ে আছে। আমিও চোখ বন্ধ করে আছি। একটু পরে নিলুফা এসে পাশে শুয়ে পড়ল। পরেরদিন সকালে নিলুফা ঘুম থেকে ডেকে তুলল। উঠে দেখি সে এখনো দাড়িয়ে আছে সামনে। আমি তাকে দেখে বললাম, কিছু বলবে? সে কিছু না বলে চলে গেল। একটু পরে ফ্রেশ হয়ে অফিসের জন্য রেডি হচ্ছি এমন সময় আবার নিলুফা রুমে এলো। আশ্চর্য হচ্ছি গত একবছরে এরকমটা খুব কমই হয়েছে। সে এসে আমার টাই বেধে দিতে যাচ্ছিল কিন্তু টাইটা নিজে নিয়ে হাসিমুখে বললাম, আমি পারবো পরে নিতে। এটা বলেই রেডি হয়ে একটু নাস্তা করে অফিসে এলাম। অফিসে আসার কিছুক্ষন পরে নিলুফা ফোন দিয়ে বলল, আজ বিকেলে কি একটু সময় দিতে পারবেন? আমি একটু ভেবে বললাম হ্যা পারবো। তখন ও বলল, তাহলে বিকেল চারটায় নদীর পাড়ে থাকবেন। বিকেল চারটা বাজার আগেই সেখানে পৌছে গেলাম। সবুজ শাড়ি সাথে খোলা চুলে সামনের জনকে অমায়িক লাগছিল। হ্যা সামনে নিলুফাই দাড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে বললাম,
- অনেক আগেই চলে এসেছে।
- আপনিও তো আগে এসেছেন।(নিলুফা)
- (তর্ক করার ইচ্ছে নেই তাই বললাম) কেন ডেকেছো?
- অনেকদিন ধরে আমরা ঘুরতে বের হই না তাই আজ আসতে বললাম।(নিলুফা)
- একটু ভুল বললে নিলুফা। অনেকদিন আমি কারও সাথে ঘুরতে যাই না। তুমি নিহার সাথে ঠিকই ঘুরতে বের হও। ( নিহা আমার ছোট বোনের নাম) আর এতোদিন আমার সাথে ঘুরতে আসনি আজও না আসলে কিছু হত না।
- (করুন চোখে তাকিয়ে) আপনি এভাবে কেন বলছেন?(নিলুফা)
- কেন বলব না বলতে পার। তোমার মনে পরে কবে তুমি আমি একসাথে একটু আমাদের কথা বলেছি। আগে প্রতিদিন অফিসে গেলে কথা বলতে, লান্ঞ্চে কথা বলতে, জলদি আসতে বলতে। এখন কি আর বল এসব? কবে আমরা একসাথে ছাদে বসে নিজেদের মনের কথা একে অপরকে বলেছি মনে পরে তোমার? তোমার মা বাবার জন্য সময় হয়, নিহার জন্য সময় হয়। আমি জানি এসব করা জরুরী। তাই বলে আমাকে এই একটা বছরে একটু সময় দেওয়া যেত না। বিয়ের আগে একা ছিলাম। তুমি এসে আমার একাকিত্বকে নিজের করে নিয়ে আমাকে তোমার সাথে মানিয়ে নিলে। এই একবছর কি তাহলে আমাকে শাস্তি দিলে? আমি তো আবারও একা হয়ে গেছি।
- আসলে সংসারের প্রায় সব কাজ আমাকে করতে হয়। মার বয়স হয়েছে। নিহার পড়াশুনা রয়েছে। বাবার বিভিন্ন কাজ আছে। তাই এই পরিবারটা আমাকেই দেখতে হয়। অদ্রিকে অনেক দেখাশোনা করতে হয়। তার প্রতিদিন খাওয়ানো, কাপড় ধোয়া এসব কিছু করতেই দিন পার হয়ে যেত। রাতে আপনি এলে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পরতেন। তাহলে বলুন আমি কিভাবে সময় দেব। (নিলুফা)
- তাই বলে তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষকেই ভুলে যাবে। আজ যেমনভাবে ডেকেছো, পারতে না অন্যদিন এভাবে ডাকতে। খুব বেশি কিছু কি চেয়েছিলাম। অফিসে যাওয়ার আগে একটু কাছে আসতে পারতে না। অফিসে থাকাকালীন একটিবার ফোন দিতে পারতে না। জানি অনেক ক্লান্ত হয়ে রাতে ঘুমাও তুমি। তবুও কোন এক জোৎস্না রাতে ছাদে আমার কাধে মাথা রেখে গল্প করা যেত না। ঘুম থেকে উঠানোর সময় কি একটু আমার সামনে থাকা যায় না। আমিও সারাদিন অফিসে কাজ করি। ক্লান্ত হয়ে এসে অদ্রিকে আমিও দেখাশোনা করি। তুমি বলতে পারও কবে আমরা আমাদের মেয়েটার সাথে একসাথে খেলেছি। আমি কি বুঝবো তবে। ভালবাসা আমার প্রতি হারিয়ে গেছে এটাই তো বুঝতে হবে।
- ভালবাসাটা কখনই হারায়নি। ঘুম থেকে উঠিয়ে আপনার জন্য নাস্তা তৈরী করতে হয় আমার। তাই উঠিয়ে দিয়েই রান্নাঘরে যেতে হয়। অদ্রির জন্য অফিসে যাওয়ার পর আর কথা বলতে পারি না আপনার সাথে। তাকে খাওয়াতে হয়, ঘুমোতে হয়। রাতে বাসায় এসে আপনি ঘুমিয়ে পরেন তাই আর ডাকি না। আমার কি ইচ্ছে হয় না আমার মনে বাস করা সেই মানুষটার সাথে একটু সময় কাটাতে।(নিলুফা)
- এসব বলে আর কি লাভ বল। আমরা আর আগের মত নেই। এটা মানতে হবে।
- এই বাড়িতে আসার পর আমার অনেক দায়িত্ব রয়েছে। অদ্রি হওয়ার পর তার পেছনেই অনেকটা সময় দিতে হয়। কিন্তু এতসবের পরেও আপনাকে আমার সময় দেওয়া উচিত ছিল। এর জন্য আমি অনেক দুঃখিত। কিন্তু তাই বলে কি আপনি পারতেন না? আমি তো প্রতিটা দিনই অপেক্ষা করতাম, এই বুঝি আপনি আইসক্রিম হাতে বাসায় এলেন। শুক্রবারে কোন এক বিকেলে বুঝি আমায় নিয়ে ঘুরতে যাবেন।(নিলুফা)
- থাক আর বলোনা। আমি একাই ভাল আছি আবারও। বলেই চলে আসছিলাম তখনি নিলুফা আমার হাতটা ধরে বলল, একবার আমাকে সুযোগ দিন প্লিজ। আমি ক্ষমা চাচ্ছি আপনার কাছে। আমি বললাম, ক্ষমা চাচ্ছ কেন, আমি তো কোন শাস্তি দিচ্ছি না। তুমি তো ভালই আছো। ও বলল, এভাবে আর ইগনোর করবেন না আমাকে। আপনার এই ইগনোর করাটাই যে আমার শাস্তি। আমি যে সহ্য করতে পারি না। এতো কাজের পরও আমি তো এটা ভেবেই বেঁচে আছি যে আপনি আমার পাশে আছেন। আমি বললাম, এতদিন কি তবে আমার খুব ভাল লাগছিল? ও বলল, আপনার প্রতি আমার ভালবাসা বিন্দুমাত্র কমে নি বরং দিনদিন বেড়েছে। শুধু সাংসারিক দায়িত্ববোধটা একটু বেড়ে গেছে। তবুও বলছি এবারের মত কি ক্ষমা করা যায় না বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো। আমি চিন্তা করছি, আসলেই কি দোষটা তার একার। আমিও তো পারতাম তাকে কিছুটা সময় নিজে থেকে দিতে। কিন্তু এখন এই মেয়ের কান্নাটা আমার একদমি সহ্য হচ্ছে না। তাই তার মাথায় হাত দিয়ে বললাম, এই কান্না করবেনা একদম। কতসুন্দর করে সেজে এসেছো এভাবে কান্না করার জন্য। ও বলল, আর হবে না এরকম। প্লিজ ক্ষমা করে দাও। আমি তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললাম, আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কি আছে। আমিতো তোমারই অর্ধাঙ্গ। এখন বাসায় চলো অদ্রি অনেকখন আমাদের ছাড়াই আছে। চোখের পানি মুছে দুজন একসাথে বাসায় চললাম। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ও বলল, আজ আপনার বুকে মাথা রেখে ঘুমাই? আমি হেসে তাকে আমার বুকে টেনে নিলাম। পাশেই আমার মেয়ে অদ্রি ঘুমিয়ে রয়েছে। পরেরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে ঠিক আগের মত করে ও টাই বাধতে আসল। টাই বাধা হলে আমি তাকে জড়িয়ে নিলাম। ও লজ্জা পেয়ে বলল, কি করছেন। আমি বললাম, একবছর আগে যা করতাম। এতো লজ্জার কি আছে। ও বলল, অনেকদিন পর তাই একটু...আমি হেসে বললাম চল তাহলে তোমার লজ্জাটা ভেঙ্গে দিই আগে। একটু দুষ্টুমি করে যখন অফিসে আসলাম তখন ফোনে মেসেজ আসলো, দায়িত্ববোধটা একটু বেড়ে গেলেও ভালবাসাটা কিন্তু অনেক গুনে বেড়েছে। আমি হাসলাম মেসেজটা পড়ে। রিপ্লাই করলাম, দায়িত্বটা ভাগাভাগি করে নিতে পারি তবে ভালবাসাটা শুধুই আমার চাই। নিলুফা তখন ফোন দিয়ে বলল, আজ আসার সময় আইসক্রিম নিয়ে আসবেন তিনটা। আমি বললাম তিনটা কেন। ও বলল, একটা নিহা, একটা অদ্রি আর একটা রাতে শুধু আপনি আর আমি বলেই ফোন কেটে দিল। আমি ভাবলাম, এই সব গুনগুলই তো তার ভালবাসা যেটা মিস করেছি এই একটি বছর। তবে এখন এই ভালাবাসার প্রহরগুলো শুধুই আমার জন্য......
এছাড়া পড়তে পারেন বাংলালিংক নাম্বার চেক
Comments
Post a Comment