অলকানন্দা

আজ সম্ভবত শেষ দেখা। অথচ অসীম দেখে মুগ্ধ হলো প্রথমবারের মতোন। রিমি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। পরনে সবুজ জামা, কপালে রক্তিম সূর্য। ডিসেম্বরের ষোল তারিখ বোধহয় আজ। বাঙালি বিশেষ দিবস ছাড়া লাল সবুজ পরিধান করে না। জিজ্ঞেস করা দরকার। দিন তারিখ মনে থাকে না অসীমের আজকাল। মাথাটাও ভারী। ঠাণ্ডা লেগেছে কিঞ্চিত। খুকখুক করে কাশলো। রিমি জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাডমিন্টন খেলা হয়েছে আবার?’
‘হ্যাঁ।’
‘শীতের রাত্তিরে দুই মিনিট বাইরে হাঁটতে পারো না, ঠাণ্ডা লেগে যায়, শ্বাসকষ্ট হয়, খেলার কী দরকার তবে?’
অসীম চুপচাপ রইল। রিমি হাঁটলো। পাশাপাশি অসীম। আজ রিমি প্রচুর কথা বলবে। অসীম শুনবে। চার বৎসরের সম্পর্কে অসীম যা বলার বলে ফেলেছে। স্বল্পভাষী রিমি শুনে গিয়েছে রোজ। আজ অসীমের পালা। রিমি দারুণ গোছানো মেয়ে। অসীমের ধারণা, রিমি যা বলবে তা মনে মনে ইতোমধ্যে কয়েকশো বার সম্পাদনা, পরিমার্জন, পরিবর্ধন ও সংক্ষেপন করা।
‘আমাদের সম্পর্ক কয় বৎসর হলো অসীম?’
‘চার?’
‘এই চার বৎসরে তোমার কখনও মনে হয়েছে যে, সম্পর্কটা ঠিক যাচ্ছে না আগের মতো? কেমন যেন যান্ত্রিক সব। রোজকার দেখা হওয়া, কথা বলা, চুমু খাওয়া। মনে হয়েছে?’
অসীম চট করে জবাবটা দিলো না। একটু ভাবলো। তারপর হাঁটা জারি রেখে বলল, ‘অনেকবার। আমি গুনিনি তবে আমার ধারণা পনের থেকে বিশ বার মনে হয়েছে, সম্পর্কটা ঠিক যাচ্ছে না। যখনই মনে হয়েছে, আমি তোমার থেকে দূরত্ব নিয়েছি। এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ সর্বোচ্চ একমাসও।’
‘হ্যাঁ। এটা তোমার কথা বলছো। আমাকে জিজ্ঞেস করো আমার কখনও মনে হয়েছে কিনা এমন?’
অসীম তাকালো রিমির দিকে। রিমির থুতনির ডানদিকে একটা তিল। প্রথমবার যখন ছবি পাঠিয়েছিল ফেসবুকে, অসীম ঐ তিলটাকে মনে করেছিল স্ক্রিনের দাগ। স্ক্রিনে আঙুল দিয়ে খুঁচিয়েছিলও। পরে জুম করে দেখে বুঝল, ওটা তিল। পরেরদিন অসীম অবশ্য বলে দিয়েছিল এই ঘটনা। রিমি শুনে হাসতে হাসতে শেষ। অসীম কথা লুকাতে পারে না। কথা জমাতে পারে না পেটে। বদহজম হয় তার। রিমি প্রশ্ন প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে। অসীম প্রশ্ন করল, ‘তোমার কখনও মনে হয়েছে এমন?’
‘না। টানা তিন বৎসর আমার একটা মুহূর্তের জন্য মনে হয়নি, এই সম্পর্ক ঠিক যাচ্ছে না। প্রতিটা মুহূর্তে আমি তোমাকে ভালোবেসেছি অসীম। প্রতিটা মুহূর্ত নতুন ছিল আমার জন্য। এমনকি যে সময় তুমি আমার থেকে দূরত্ব নিতে, ঐ সময়গুলো পর্যন্ত।’
‘তুমি আমাকে বুঝতে পারো ভালো। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে আমাদের সম্পর্ক প্রথম বৎসরেই ভেঙে যেত।’
রিমি হাসলো। অসীম দৃষ্টি ফেরালো না। হাসতে হাসতে যে মেয়ে সমুদ্র তৈয়ার করে ফেলে চোখে, ঐ সমুদ্র হতে স্নান বিনে চোখ ফেরানো পাপ। রিমি পলক ফেলে বলল, ‘ওটা তিন বৎসরের গল্প। শেষ একটা বৎসর তুমি আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেছো?’
‘হ্যাঁ।’
‘যেমন?’
‘তুমি কখনই আমি ফোন রাখার আগে ফোন রাখতে না। শেষ একটা বৎসর আমাদের মধ্যে ফোনে কম কথা হয়েছে, নিজ থেকে ফোন রেখেছো প্রতিবার। দেখা কম হয়েছে। চুমু খাওয়ার সময় তোমার ঠোঁট জোড়া ছিল নিস্তেজ। জড়িয়ে ধরায় ছিল ঢিলেঢালা ভাব।’
‘আমাকে কখনও বলোনি তো?’
‘আমি বাস্তববাদী মানুষ রিমি। তুমি যা বলবে, বলো। আমি শুনে বিরাট কষ্ট-টষ্ট পাবো, কান্নাকাটি করবো, এইসব মনেও এনো না। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবো। তুমি বলো।’
রিমি থামলো। হাঁটা বন্ধ। মুখোমুখি। ওদের ডানপাশে একটা লতা গাছ। অন্য একটা গাছ জড়িয়ে বেয়ে উঠা। পাতাগুলো সরু, সবুজ। হলুদ রঙা ফুল ফুটেছে। কী ফুল অসীমের জানা নেই। অসীম রিমির চোখের দিকে তাকিয়ে। রিমি চোখ নামালো না। তাকিয়ে থেকেই বলল, ‘অভি। অভির সাথে আমার প্রায় প্রতিদিন কথা হয়। শেষ একটা বৎসর আমি তোমায় একফোঁটাও ফিল করিনি।’
‘পরিচয় কবে থেকে?’
‘জানুয়ারির তের অথবা চৌদ্দ তারিখ। আমার একটা ফ্রেন্ড থেকে আমার নাম্বার নিয়েছিল। প্রথম দুয়েকদিন অল্প কিছুক্ষণ কথা হয়েছে। প্রচণ্ড হাসাতে পারে এই ছেলে। আমি পাত্তা দিইনি। তারপর কেমন করে জানি না, রোজ কথা হতে লাগলো। এক-দুই মিনিট থেকে টাইমটা ত্রিশ-চল্লিশ মিনিটও পৌঁছুলো। তুমি যখন দূরত্ব নিয়েছো আমার থেকে, তখন এমনও রাত গেছে, সারারাত কথা বলেছি ওর সাথে আমি।’
‘আসো হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে বলো।’
অসীম হাঁটলো। পাশাপাশি হাঁটলো রিমি। কণ্ঠস্বরে চেপে রাখা উচ্ছ্বাস, হাত নাড়িয়ে জানালো, ‘অভি জানতো আমার সম্পর্ক আছে তোমার সাথে। তারপরও কথা বলতো। কারণ, আমি তাকে বলতে দিতাম। আমার ভালো লাগতো। তোমার মনে আছে? একদিন আমি তোমায় বললাম আমার বাসায় মেহমান। দেখা করতে পারবো না।’
‘হ্যাঁ।’
‘মিথ্যা বলেছিলাম। অভির সাথে আমি নয়াদুয়ার গিয়েছিলাম। ওর গাড়ি করে। তুমি আর সবার মতো নও, তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এখন ঠিক এই মুহূর্ত থেকে ভাবতো আমি অভির টাকা পয়সার বিষয়টায় দৃষ্টি রাখছি। তুমি ভাববা না, জানি। তাও তোমাকে সত্যটা বলি, অভির সাথে কথা বলার আট মাসের মাথায় আমি জানতে পারি তার গাড়ি আছে, তার বাবার ব্যবসা আছে, সে তার বাবার সমস্ত ব্যবসা, অর্থ-সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকার। আবার এটাও বলি, একদম না দেখে, না জেনে, না শুনে প্রেমে পড়ে যাবো, অমন মেয়েও আমি নই। প্রতিটা মেয়েকে বিয়ের পর পুরুষের বাড়ি গিয়ে উঠতে হয়। যে বাড়ি থাকে ইট পাথরের কিংবা টিনের খড়ের, ওটা ঘর বানাতে হয়। ঘর বানাতে জানে না পুরুষ। ওরা জানে টাকা উপার্জন করতে। ঘরটা আদিকাল থেকেই বানায় নারী। তাই কোনো নারী প্রেম ভালোবাসা আবেগ অনুভূতি ইত্যাদির পাশাপাশি যদি পুরুষের আর্থিক দিকটা দেখে, তাকে দোষারপ কোরো না। তুমি করবা না আমি জানি। যদি কখনও অবচেতন মনে আসে, তাই বলা।’
‘আমি ওসব ভাবছি না রিমি। আমি ওসব ভাবি না। কিন্তু, আমিও তো জব করি। ছোটখাটো জব না। মোটামুটি চলতে পারার মতো।’
‘অসীম, আমি তোমায় ভালোবাসতে পারছি না আর। এমন না যে আমি তোমায় অপছন্দ করি, আমি শুধু ভালোবাসতে পারছি না আগের মতো। আগের মতো অনুভূতিটা নেই। বুঝতে পারছো?’
অসীম মাথা দুলালো উপর নিচ। এই অনুভূতি বুঝার ক্ষমতা তার আছে। চার বৎসরের সম্পর্কে বিশ থেকে পঁচিশবার এই অনুভূতিতে আক্রান্ত সে নিজেও হয়েছে। মাথা দুলিয়ে বলল, ‘অভি প্রপোজ করেছে?’
‘হ্যাঁ। একসপ্তাহ আগে।’
‘এক বৎসর ধরে আমায় জানাওনি কেন?’
‘আমি কনফিউজড ছিলাম। তুমি আর অভির মধ্যে আমাকে বেস্ট অপশন চুজ করতে হতো। একটা মানুষ অত সহজে বুঝা যায় না। যখন বুঝলাম, তখন মনে হলো, আমরা যেটা টানছি জোর করে এতদিন, মানে এই সম্পর্কটা, এটার একটা সমাপ্তি দরকার।’
‘তা ঠিক।'
অসীম কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা আমাদের কি কিছু ফেরত দিতে হবে?’
‘কী ফেরত দেবে?’
‘অনেকেই তো ব্রেকাপের সময় রিং-টিং ফেরত নিয়ে নেয়। আমার একটা বন্ধু ব্রেকাপের পর উপহার দেয়া জামা, চিঠি, রিং, ঘড়ি সহ খুলে জুতো জোড়া পর্যন্ত ফেরত নিয়ে এসেছিল।’
রিমি শব্দ করে হেসে উঠল। হাসলে রিমির চোখজোড়া ছোট হয়ে আসে। মন খুলে হাসলে ঐ ছোট ছোট চোখ দু’টোয় জল জমে মুক্তোদানার মতোন। রিমির চোখে জল জমলো। হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি ফাজিল হয়েছো বেশী। আমার কিছু লাগবে না। যা থাকার, থাকুক। আমরা অন্য সবার মতো নই। এই যে আমি তোমায় মন খুলে এইসব বলতে পারলাম, আর কাউকে বলতে পারতাম?’
‘নাও নাও। পরে আবার খোঁটা দিবা।’
রিমি ঠোঁট বাঁকালো, দুষ্টুমি খেলা করল চোখে তার, ‘দিবো না। অভির টাকা পয়সার অভাব আছে? অভির কথা কেন বলছি? আমি সামনে জব করলে আমার টাকা পয়সার অভাব থাকবে ভেবেছো?’
বেলা গেল। ওরা হাসলো খুব। হাঁটল। তারপর অসীম থামলো। রিমি থামলো। দু’জন ফের মুখোমুখি। রিমির স্পষ্ট মনে পড়ল, প্রথম যেদিন অসীমের সঙ্গে তার দেখা হলো, এমনই মুখোমুখি, ওর হাস্যোজ্বল মুখচ্ছবির দিকে তাকিয়ে সারাদিনের সমস্ত পরিশ্রম, ক্লান্তি, বিষাদ, গোপন যত দুঃখ পুষা ছিল বুকে, সব হালকা হয়ে গিয়েছিল টুপ করে। আজও হলো। অসীমের চোখের দিকে তাকানোর পর রিমি অনুভব করল, বুক থেকে ইয়া বড়ো পাথর নেমে গেল সুরসুর করে যেন। অসীম হাত বাড়ালো। হ্যান্ডশেক! রিমি মৃদু হেসে জড়িয়ে ধরল তাকে। দূরে আসমান দিয়ে উড়ে গেল সন্ধ্যাবেলার একঝাঁক পাখি।
.
রিমির সাথে আমার দেখা হলো মোটামুটি সাত-আট বৎসর পর। আমি অসীম নই, আমি অভিও নই। তাও আমি এই গল্পের অন্যতম প্রধান একটা চরিত্র। আমাদের দেখা হলো দুলালী স্টেশন। আমি বসে অপেক্ষা করছিলাম আমার স্বামীর। আমার স্বামীর ট্রেন এসে পৌঁছুনোর কথা দুপুর বারোটায়। আমি হাতঘড়ি দেখলাম, বারোটা বেজে দশ মিনিট। ট্রেন আসার নাম নেই। আমার হাতে ঘড়ি দেখে সময় জিজ্ঞেস করতে আসা নারীর দিকে তাকিয়ে রীতিমতো ভিমরি খেলাম। এবং শুকরিয়া আদায় করলাম, আমি পুরুষ নই। পুরুষ হলে ঘর সংসার ফেলে এই নারীর হাত ধরে পরবর্তী ট্রেনে উঠে যেতাম নির্ঘাত। একটা মানুষ এমন নিখুঁত সৌন্দর্য নিয়ে জন্মায় কী করে ভেবে পেলাম না। নারী হলুদ শাড়ি পরেছেন। আমার মাথায় ঘুরল শুধু অলকানন্দা ফুল। যত্ন করলে তো ফোটে, অযত্নেও বেড়ে উঠে ঘরের আঙিনায় এই লতা, এত সুন্দর। অলকানন্দা নামটা রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম।
‘আপনি কার জন্য অপেক্ষা করছেন?’
বাস্তবে ফেরত আসলাম। নারী প্রশ্ন করেছেন। চটপট উত্তর দিলাম।
‘আমার স্বামীর জন্য।’
‘বাহ। আমিও। আমি কিন্তু আপনাকে চমকে দিতে পারবো। দেখবেন?’
নারী প্রশ্ন প্রশ্ন চোখে তাকালেন। আমি মনে মনে হাসলাম। এই নারী ইতোমধ্যেই আমাকে চমকে দিয়েছেন সৌন্দর্য দিয়ে। আর কী চমকানোর বাকি তার।
‘আপনি ম্যাজিশিয়ান?’
‘তা বলতে পারেন। আচ্ছা আপনাকে বরং চমকে দিই। আপনার স্বামীকে আমি চিনি।’
আমি চমকালাম না। নারী আমার স্বামীর দিককার আত্মীয়-স্বজন হবেন নির্ঘাত। তার আবার আত্মীয়-স্বজনের কমতি নেই। আমাদের বিয়ের সময় একবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল সবাইকে। উচিৎ শিক্ষা হয়েছে তারপর। আমার আবার অত হৈ-হুল্লোড় পছন্দ না। কিন্তু নারী এত সৌন্দর্য, নারীকে হতাশ করতে ইচ্ছে হলো না। আমি চমকানোর ভান করলাম।
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। আপনার স্বামী একটা মহা বেয়াক্কেল মানুষ। আমি তাকে কত খুঁজেছি, পাত্তা পাইনি। উধাও একদম। কোথায় থাকছেন আপনারা?’
‘বেয়াক্কেল’ শব্দ শুনেই নিশ্চিত হলাম, এই নারী আমার স্বামীর বন্ধু। খুব কাছের বন্ধু। গাধা, বেয়াক্কেল, গরু এইসব শব্দ কাছের বন্ধুদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। নারী আমায় ইতোমধ্যেই আপন ভাবা শুরু করেছেন। নইলে আমার স্বামীকে আমার সামনে ‘বেয়াক্কেল’ বলার স্পর্ধা দেখাতেন না। যদি এই নারী স্বামীর বন্ধু হোন, আমি আশ্চর্য হবো বৈকি। আমার স্বামীর সব বন্ধু আমার চেনা।
‘আমরা এই তো, স্টেশনের কাছেই থাকি। ওর থাকার তো ঠিক ঠিকানা নেই, আজ এইখানে, কাল ঐখানে। চাকুরি ঐ রকম, কী আর করা। কিছু মনে করবেন না, আপনাকে কিন্তু আমি চিনতে পারছি না। আমাকে কিভাবে চিনলেন? আপনাকে আমাদের বিয়েতে দেখিনি।’
নারী মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘আমাকে বিয়ের দাওয়াত দেয়নি। যোগাযোগ নেই। আপনাকে কিভাবে চিনলাম এখন বলবো না। আপনার স্বামী আসলে বলবো। ওকে আপনার সামনে দু’য়েকটা ঘুষি দিলে রাগ করবেন?’
আমি হেসে ফেললাম। নারী আবদার করছেন। সত্যিকারের আবদার। চোখের পাপড়ি কি সুন্দর, মাঘের রাত্তিরে লজ্জাবতী গাছের পাতায় শিশির জমে থাকতে দেখেছিলাম একবার, টর্চ মারার পর ঝিকিমিকি করে উঠেছিল তা, বহু আগে। তারপর দেখলাম দুলালী স্টেশন। পাশে বসা নারীর চোখে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার নাম কী?’
‘নাম বললে তো চিনে ফেলবেন। আমার নাম আপনি শুনেছেন আমি জানি। আপনার স্বামী বলেছে অনেকবার হয়তোবা।’
‘মৃন্ময়ী?’
নারী চমকালেন। আহা ম্যাজিশিয়ান! আমিই চমকে দিলাম বোধহয়। মনে মনে হাসলাম আরেকচোট। নারী মাথা নাড়ালেন ডান বাম। স্বামীর একমাত্র বন্ধু, যার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, তার নাম মৃন্ময়ী। নারী যদি মৃন্ময়ী না হোন, তবে কে? আমার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যই বোধহয় ট্রেন আসলো লম্বা বাঁশি বাজিয়ে। নারী উঠে দাঁড়ালেন। চকচকে মুখ তার। আনন্দিত। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। থেমে যাওয়া ট্রেনের কামরা থেকে স্বামী নেমে আসতেই হাত ধরে টেনে আনলাম তাকে। নারীর সামনে। মুখোমুখি। নারী থমকে দাঁড়ালেন। ভ্রুঁ জোড়া কুঁচকে গেল তার। আমি হাসিমুখে বললাম, ‘আপু, এই যে সায়ান। আমার স্বামী।’
‘অসম্ভব।’
নারী বিড়বিড় করলেন। সায়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে আমায় জিজ্ঞেস করল, ‘কে উনি?’
‘আমি তো জানি না। বলল, তোমাকে চেনে।’
নারী তাকিয়ে রইলেন সায়ানের দিকে। আমি নারীর দিকে তাকালাম তারপর। চোখজোড়া শুষ্ক। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি সায়ানকে চেনেন না?’
‘না।’
‘সায়ান আমার স্বামী। আমাদের পাঁচ বৎসরের সংসার। আপনার কি কোথাও ভুল হচ্ছে?’
নারী আমার হাত ধরে ফেললেন খপ করে। আমার হাতের অনামিকা আঙুলে একটা রিং। রুপোর আংটি। গায়ে খোদাই করা নাম, অসীম। নারী আমার হাত শক্ত করে ধরে চোখের দিকে তাকালেন সরাসরি। কড়া স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই রিং অসীমের। তুমি কোথায় পেয়েছো?’
পৃথিবী গোল। এর একদিক দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে অনেকদূর পথ অতিক্রম করার পর নিজেকেই ফের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বলা হয়, সব মানুষ ঘুরে ফিরে দেখা পায় নিজেদের তাই। নারীকে আমি চিনতে পারলাম। যদিও আমাদের কোনোদিন দেখা হয়নি এর আগে, কোথাও। অথচ নিয়তি আমাদের মুখোমুখি করল। কোনো এক দুপুরবেলায়। মাথার উপর যখন সূর্য। নারীর খপ করে ধরা হাত। শীতল চোখ। আমি নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার নাম রিমি?’
রিমি ঢোক গিললেন। সম্ভবত কান্না গিলে ফেললেন। মাথা উপর নিচ করলেন দ্রুত। আমি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেললাম। ব্যাগ থেকে একখানা চিরকুট খুলে হাতে দিলাম তার। এই চিরকুট আমি পেয়েছিলাম সাত বৎসর আগে। সেদিনও ছিল এমন দুপুর। মাথার উপর ছিল খসখসে সূর্য।
.
‘প্রিয় অপরিচিত,
আমি জানি না আপনি পুরুষ নাকি নারী। আপনার বয়স কত। আপনি দেখতে কেমন। আমি শুধু আপনার ঠিকানাটা জানি। আমি অসীম। আপনি যখন এই চিঠি পড়বেন, তখন আমি বেঁচে নেই। আমার মৃত্যু হবে খুব স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়ায়। আমি গলায় দড়ি দিচ্ছি না, বিষ খাচ্ছি না, ছাদ থেকে লাফ দিচ্ছি না, ব্লেড দিয়ে হাতও কাটছি না। আমার ঠাণ্ডা লাগলে শ্বাসকষ্ট হয়। এত বেশী হয় যে, ইনহেলার নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। আমার সঙ্গে থাকে সবসময় ইনহেলার। আমি একটু আগে সব ইনহেলার ডাস্টবিনে ফেলে এসেছি। এবং ঠিক করেছি আজ রাতে ছাদে উঠবো।
আজ রাত বেছে নেওয়ার দু’টো কারণ আছে। প্রথমত, আজ ঠাণ্ডা পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। সন্ধ্যার পর পর ঘন কুয়াশায় ছেয়ে গেছে ইতোমধ্যে। দ্বিতীয়ত, আজ বাসার পাশেই একটা ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। মাইক লাগানো হয়েছে ছয়টা। রাত দেড়টা পর্যন্ত প্রচণ্ড আওয়াজ থাকবে। আওয়াজ থাকা দরকার। আমি রাত সাড়ে দশটায় ছাদে উঠবো। চুপচাপ ছাদের এক কোনে লুকিয়ে থাকবো, যতক্ষণ না বাসার কেয়ারটেকার এসে ছাদের দরজা বন্ধ করে দেয়। আমাদের এই বাসার ছাদের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় রাত এগারটায়। তালা মেরে দেওয়া হয় বাইরে। আমি এগারটা পর্যন্ত লুকিয়ে থাকবো। তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকবো ছাদে। কুয়াশায় জমে যাবো একটু পর। মাথা ভারী হবে, শ্বাসকষ্ট শুরু হবে। গড়াগড়ি খাবো ছাদজুড়ে। কপালের রগ ফুলে উঠবে। টিকতে না পেরে পাথুরে দেয়ালে আঁচড় কাটবো। মাথা ঠুকবো। মৃত্যুর আগমুহূর্তে প্রতিটা মানুষ বাঁচতে চায়। হোক দুনিয়ার ডিপ্রেশনে তার জগত আচ্ছন্ন। শ্বাস নিতে না পেরে আমি হয়তোবা চিৎকার করবো, যাতে কেউ শুনতে পায় আমার চিৎকার, আর আমাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। কিন্তু আমার চিৎকার কেউ শুনবে না, কারণ বাইরে থাকবে মাইকের প্রচণ্ড আওয়াজ। আমার হাতে একটা উপায় থাকবে শুধু। ছাদ থেকে লাফ দেওয়া। কিন্তু তাতেও আমি মরে যাবো। বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাসা নয়তলা উঁচু। মৃত্যু নিশ্চিত।
মানুষ চট করে মরে যায় না। জীবনের কোনো না কোনো সময় অতল সমুদ্রে সব মানুষই পড়ে। তাও কোনো একটা খুঁটি থাকে তাদের, যেটা ধরে উঠা যায়। আমার ঐ খুঁটি নেই। বাবা থাকলে হয়তো ঘাড় টিপে ধরে বাজার করতে পাঠাতো, সারাদিন ঘরে বসে থাকি আমি। মা থাকলে ঝাড়ু দিয়ে পিটাতো। একটা বোন থাকলে আবদার করত কোনো একটা খেলনা কিনে দেয়ার। ভাই থাকলে একটা দামী ফোন চাইতো। আমায় ওদের জন্য বেঁচে থাকতে হতো। আড্ডা দিতে হতো বন্ধুর সঙ্গে। আমার অমন কোনো বন্ধুও নেই বুঝলেন।
কেন মরে যাবো বলি।
এক সপ্তাহ হলো আমার বিচ্ছেদ হয়েছে। ভ্রুঁ কুঁচকাবেন না। প্রেম ভালোবাসার জন্য মরে যাওয়া ঠিক না। প্রেম ট্রেনের মতো, আসবে যাবে, আসবে যাবে। পরিবারের কথা ভাবা দরকার। জীবন মূল্যবান। তুচ্ছ কারণে মরে যাওয়া ঠিক না। হারাম। জাহান্নাম। সব আমি জানি। আমার ঠোঁটস্থ। আমি রিমিকে ভালোবাসি। আমাদের খুব সুন্দর একটা বিচ্ছেদ হয়েছে বুঝলেন? এত সুন্দর করে আজকাল মানুষ আলাদা হয় না। বিচ্ছেদ মানেই তো মানুষ বুঝে অপরপক্ষকে ব্লক করে দেয়া, গালি দেয়া, ঘৃণা করা ইত্যাদি। রিমির সাথে শেষবার দেখা হলো আমার। রিমি আমায় জড়িয়ে ধরল। চার বৎসরের সম্পর্ক ছিল আমাদের। শেষ একটা বৎসর ভালো যায়নি যদিও। রিমি প্রেমে পড়ল অভির। সে যাক, আমাদের দুইজনের বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল। আমরা হাসলাম। মজা করলাম। বিদায় নিলাম।
জীবন থেমে থাকে না। আমাদের ভবিষ্যত আছে। আমরা আবার প্রেমে পড়ব। বিয়ে করবো। সংসার করবো আলাদা। আমি হাসিমুখে এইসব ভাবছিলাম। আপনাকে সত্যিটা বলি, রিমির সাথে শেষ দেখা করে আসার পর সারা রাস্তা আমার একটুও খারাপ লাগেনি। আমার বুকটা প্রথম কেঁপে উঠল রাত এগারটায়। ঘুমাচ্ছিলাম। ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। বারান্দায় গেলাম। হাতে ফোন। ফোনের দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা কেঁপে উঠল বুঝলেন? কেমন মোচড় দিয়ে হাড় ভাঙে না মানুষের? অমন একটা তীব্র ব্যথা। ঠাণ্ডা লাগা ছাড়াই শ্বাসকষ্ট শুরু হলো আমার। ইনহেলার নিলাম। এবং তার পরদিন একই ব্যথা ক্ষণিক পর পর জেগে উঠতে দেখে বুঝলাম, আমি আর সামনে পা বাড়াতে পারবো না। আমার পথ বন্ধ। গন্তব্য নেই। আমি আটকে গেছি মাঝখানে কোথাও। শহর ছাড়লাম। একটা বাসা নিলাম। যোগাযোগ শেষ।
আমি একটা রেন্ডম ঠিকানায় এই চিঠি পাঠাবো। ঐ ঠিকানায় কে থাকে আমি জানি না। কেউ আদৌ থাকে কিনা, তাও জানি না। কিন্তু পাঠাবো। চিঠির সাথে থাকবে একটা রিং। এই রিং আমায় উপহার দিয়েছিল রিমি। আমার নাম খোদাই করা। আমি মরে যাবো জেনেও একটা আবদার রাখছি আপনার নিকট। আমার শেষ ইচ্ছা বলতে পারেন। এমন সুন্দর একটা পৃথিবী, আমি কোনো একদিন এখানে ছিলাম, এটা কেউ মনে রাখবে না। কোনো চিহ্ন থাকবে না আমার। কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ভাবতে গিয়ে কান্না পেল খুব। মানতে পারছিলাম না ঠিক। তাই রিংটা পাঠালাম। আপনি পুরুষ হোন কিংবা নারী কিংবা অন্য যেকোনো জেন্ডার, যে-ই হোন না কেন, আমার এই রিংটা পরবেন সবসময়। খুলবেন না কোনোদিন। আমি আপনার কাছে আবদার করছি। রিমিকে পাঠালেও পারতাম। কিন্তু অভির সাথে চমৎকার একটা সংসার হবে ওর, কী দরকার গলায় কাটা হয়ে থাকার। তাই আপনাকে পাঠালাম। আমি আপনাকে চিনি না, আপনি আমাকে চেনেন না, আমাদের কখনও দেখা হবে না। আমি একটু পর মরে যাবো। আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, আপনার কোনো একটা আঙুলে আমায় একটু বাঁচিয়ে রাখবেন প্লিজ?
ইতি, অসীম।'
.
রিমি চিরকুট থেকে চোখ তুললেন। সায়ান ডাকলো আমায়। রিমি ঢোক গিললেন। চোখজোড়া ছোট হয়ে আসলো তার। ভরদুপুরে একটা স্টেশনের মাঝখানে অজস্র মানুষের ভীড়ে দাঁড়িয়ে কান্না চাপার সেকি তীব্র চেষ্টা। গলায় স্বর আটকালো বারবার। কিছুটা গলায় র’য়ে গেল, বাকিটা বের হয়ে এলো, গুচ্ছ গুচ্ছ।
‘আমায় এই রিংটা দেবেন? প্লিজ?’
আমি মৃদু হাসলাম। সায়ান ডাকলো ফের। দুই পা সামনে বাড়িয়ে ক্রন্দনরত নারীর গালে আলতো হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বললাম, ‘না।’
‘একটু সময়ের জন্য দেবেন? একটু পরবো। খুলে দিয়ে দিবো আবার। প্লিজ।’
‘না।’
রিমি দুই হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি তাকে পেছনে রেখে হাঁটলাম। পাশে সায়ান। একবার ইচ্ছা হলো পেছন ফিরে তাকাই। ভরদুপুরে মাথার উপর সূর্য নিয়ে আচমকা তীব্র বিষাদে আচ্ছন্ন নারীর গালে একটু হাত বুলিয়ে আসি, কমিয়ে দিই কষ্ট তার। পরক্ষণে মনে হলো, থাক। সায়ানের হাতের আঙুলে আঙুল মিশিয়ে সামনে পা বাড়ালাম।
.
'অলকানন্দা'
শাখাওয়াত হোসেন
(১৭.০২.২০২২)

Comments

Popular posts from this blog

বিভিন্ন প্রকারের রাসায়নিক সারের কাজ।

বিয়ে ছাড়াই বউ!

ভালোবাসার শেষ ইচ্ছা