এক জন বোবা মেয়ে !

ওরা মোট পাঁচজন।দুইজন পাহারাদার,হাতে লম্বা লম্বা লাঠি।সদর দরজায় দাড়িয়ে আছে লাঠি হাতে নিয়ে।আর বাকি দুজন নওশের মোল্ল্যার ঘরের দরজায় দাড়িয়ে।নওশের মোল্ল্যা আমার বস্ত্র হরণের জন্য উন্মাদ প্রায়।আমি কিছুতেই নিজেকে রক্ষা করতে পারছি না।মাঝে মাঝে প্রকৃতি খুব ভয়ংকর হয়ে ওঠে,কিছুই করার থাকে না।নওশের মোল্ল্যা নিজের কাম লালসা চরিতার্থ করার জন্য নিজের নগ্ন শরীরটাকে জানোয়ারের মত ব্যাবহার করল।একটা ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে এটা মায়াবি হরিণ ছেড়ে দিলে ঠিক যেমনটা হয় ঐরকম অবস্থা। আমার চোখ দিয়ে যতটানা পানি পড়েছে তার থেকেও বেশি চিৎকার করছি।কিন্তু আমি বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় সেই চিৎকার কেউ শুনতে পায় নি।কেবল দুটি মাত্র "উ" "উ" শব্দ ঘরের এক দেয়াল থেকে অপর দেয়ালে বাধা পেয়ে থেমে গেলো।
নওশের মোল্ল্যা এই গ্রামের মোড়ল।একটা চোষনক্ষোরও বলা যায়।আমার বাবা সেই ছোট্ট বেলাতেই আকাশের তারা হয়ে গেছে।আমি আর মা বড় স্কুলটার পাশে একটা কুটিরে থাকি।প্রতিদিন লুকিয়ে স্কুলের জানালায় গিয়ে দাড়িয়ে থাকি।রং বেরং এর কাগজ দিয়ে সবাই ফুল পাখি আরো কত্ত কি বানায়!আমারো খুব ইচ্ছে করে।
মা নওশের মোল্ল্যার বাড়িতে কাজ করে।সেই সুবাদেই লোকটার আমার উপর লোলুপ দৃষ্টি।মা একটা সময় সেইটা বুঝতেও পারে তাই কাজ ছেড়ে দেয়।মাঝে মাঝে মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আর কি সব যেন বিড়বিড় করে বলে।মাঝপথে মাকে থামিয়ে দিয়ে ইশারায় বলি-"আল্লাহ তো আছেই মা"।মা তখন আমার কপালে একটা চুমু একে দেয়।
মা কাজ ছেড়ে দেয়ায় নওশের মোল্ল্যার রাগ দ্বিগুন হারে বেড়ে যায়।রাতের আধারে জোর করে ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যায়।মা বাধা দিতে আসায় ওরা ওদের বড় বড় লাঠির আঘাতে মাকে রক্তাক্ত অর্ধমৃত করে ফেলে রাখে।
আমার যখন জ্ঞান হল তখন দেখি বাড়ির পিছনের নিম গাছটার নিচে ওরা আমাকে ফেলে রেখে গেছে।উঠে দাড়ানোর শক্তি নেই।কোনরকম "উ" "উ" বলে দুইটা শব্দ করলাম।মা ছুটে এসে জাপটে ধরল।
কয়েকমাস পর অনুভব করলাম আমার পেটের ভিতর শিং মাছের মত কি যেন গুতা দেয়।পেটের উপর মায়ের হাতটা রেখে সবটা ইশারায় বুঝালাম।মায়ের বুঝতে কিছু বাকি রইল না।এই প্রথমবার আমি মাকে কাঁদতে দেখলাম।
মা একটা পর্যায়ে স্কুলের মাস্টার কাকাকে সবটা খুলে বলল।মাস্টার কাকা আমার দেখা সবথেকে ভালো একজন মানুষ।বলা যায় সব সাধারনের মাঝে অসাধারণ একটা মানুষ।মাস্টারকাকা মাকে নিয়ে থানায় গেলেন।কিন্তু কোন লাভ হল না।গ্রামের মোড়ল বলে কথা,থানা পুলিশ সবটাই তার হাতে থাকবে এইটাই প্রকৃতির নিয়ম।
এর ঠিক এক সপ্তাহ পর আমার মায়ের চাওয়া ন্যায় বিচারের প্রতিদান আমাকেই দিতে হল।রাতের আধারে সেই নরপশুগুলো আবারো হামলা দেয়।আমি তখন ছয় মাসের অন্তস্বঃত্তা।আমার চোখ হাত বেধে ওরা ধরে নিয়ে গেলো আর মাকে বাহির থেকে তালা বন্ধ করে ঘরে আটকে রাখলো।মা চিৎকার করে বার বার বলল-"বাবা,,তোমরা ওকে ছেড়ে দাও।আমরা আর এই গ্রামে থাকবো না।ও কথা বলতে পারে না।আমার বোবা মেয়েটাকে ছেড়ে দাও,ও মরে যাবে"।নিজের জন্য যতটানা কষ্ট হলো মায়ের জন্য আরো বেশি কষ্ট হলো।আমি বোবা বলে ভালোবাসার কমতি নেই এতটুকু।
আমার চোখের বাধন যখন খুলে দেওয়া হল তখন আমি সেই ঘরটায় দাড়িয়ে যেখানে আমার গলার দুটিমাত্র "উ" "উ" শব্দ এক দেয়াল থেকে অপর দেয়ালে বাধা পেয়ে থেমে গেছিলো।এইবার নওশের মোল্ল্যার প্রতিশোধের পালা।
আমার চুলের মুঠিটা ধরে হ্যাচকা টান দিল।পেটে সজোরে লাথি মারলো।মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে।আমার নাক দিয়ে ফোটা ফোটা রক্ত পড়ছে।জোরপূর্বক নিজের লালসা পূর্ণ করতে হায়েনার মত ঝাপিয়ে পড়ল।কিন্তু সেদিন আমি কেবল একজন নারী ছিলাম আর আজ একজন মা ও।শরীরের সব শক্তি দিয়ে নওশের মোল্ল্যাকে একটা থাপ্পড় দিলাম।থাপ্পড় খেয়ে শকুনের দৃষ্টিতে তাকালো সে।
এইবার বাইরের দুজনকে ডাকা হল।ওরা আমাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বাধল।তারপর নওশের মোল্ল্যা সুপারি কাটার যন্ত্রটা নিয়ে এগিয়ে এল।যে হাত দিয়ে থাপ্পড় মেরেছি সেই হাতের পাঁচটা আঙ্গুলই একটার পর একটা কাটতে লাগলো।কোন দাদিমা পান খাবার জন্য যেমন সুপারি কাটেন ঠিক ঐরকম।আর বাকি দুজন মাথার চুলগুলো টেনে টেনে ছিড়তে লাগলো।যেমন জবাই করা মুরগির পশমগুলো টেনে টেনে ছেড়া হয় ঐরকম।একটা সময় ওরা দুজন হাপিয়ে ওঠে।মাথা ভর্তি তখনো অর্ধেক চুল।
হারামখোর গুলো একটা কাজও ঠিকমত পারিস না বলে চেচিয়ে উঠল নওশের মোল্ল্যা।একটা ধারালো চামড়া ছোলা ছুরি নিয়ে নিজেই এগিয়ে এল আর আমার মাথার চামড়াসহ চুলগুলো তুলতে লাগলো।ফোটা ফোটা রক্ত আমার কপাল গড়িয়ে মুখ বেয়ে মেঝেতে পড়তে লাগলো।আমি তখনো নির্বাক হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে।সবশেষে আমার রক্তাক্ত মুখটা একটা পলিথিনে জড়িয়ে শক্ত করে ধরে রাখলো ওরা,যতক্ষণ না মৃত্যু হয়।একটা সময় আর সহ্য করতে পারলাম না।খুব চিৎকার করলাম কিন্তু আমার অন্তরের সেই চিৎকার কেউই শুনতে পায় নি।অবশেষে আধঘন্টা ধস্তাধস্তির পর একই সাথে আমার আর আমার পুচকোটার মৃত্যু হল।আমি জানিই না ও রাজকুমার নাকি রাজকুমারী কিন্তু একটাবার ছুয়ে দেখার খুব ইচ্ছা ছিল।
আমি দেখতে পাচ্ছি,আমার মৃত শরীরটাকে ওরা ধানক্ষেতের ভিতর ছুড়ে ফেলে দিল।সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই আমার মৃত শরীরটাকে উদ্ধার করল গ্রামের সবাই।তারপর আমাকে গোসল দেয়া হল,ধবধবে সাদা কাপড়ে মোড়ানো হল,চোখের উপর টানা টানা করে সুরমা লাগানো হল,জানাজা দেয়া হল আর সেই নিমগাছটার পাশে সাড়ে তিনহাত নিচে আমার মৃত শরীরটাকে কবর দেয়া হল।
ইতিমধ্যে আমার এই নৃশংশ মৃত্যুর খবর আমার গ্রাম,আমার জেলা,আমার বিভাগ এমনকি আমার দেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল।বড় বড় সব পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় আমার ছবি ছাপানো হয়েছে।সবাই দেখছি আবার কাগজের উপর কি সব লিখে রাস্তায় নেমে দাড়িয়ে আছে লাইন দিয়ে।আমার সেইদিনের সেই চিৎকার বুঝি এরা সবাই শুনতে পেয়েছে।কিন্তু এত দেরি কেন করল ওরা?উত্তাল দেশ আর বিক্ষুব্ধ জনতা।
মৃত শরীরটাকে কবরে রাখার পরও পার পেলাম না।তিনদিন পর আমার অর্ধপচিত শরীরটাকে তোলা হল। তারপর একটা বিশাল বড় ঘরে আনা হল।একটা চারপায়ে টেবিলের উপর টানটান করে শুইয়ে দেয়া হল।পেটের ভিতর তখনো ছয় মাসের পুচকোটা।আমি দেখছি বেশ কয়েকজন আমার মৃত শরীরটাকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে।তারমধ্যে একজন মোটা,গোফওয়ালা,মাথায় ঝাকড়া চুল,লম্বাটে দেহ আর হাতে একটা ছুরি যেন এখনি আমার মৃত শরীরটাকে ফালি ফালি করে কেটে পুড়িয়ে খাবে।লোকটি এগিয়ে এলো।আমার তলপেটের একপাশে ছুরি ঢুকিয়ে টানতে টানতে অপর পাশে নিয়ে গেলো।টান দিয়ে পুচকো সোনাকে বের করে আনল।
একটা ছোট্ট রাজকুমারী।গোলাপী রং এর পাতলা পাতলা ছোট্ট দুটি ঠোট।পুচকো পুচকো হাত।ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঙ্গুল।সদ্য গজানো গাছের মত দুই চারটা আবছা চুল।অগণিত ভেজা পশম।এই বুঝি চিৎকার করে কেঁদে উঠবে।আমি ওকে ছুয়ে দেখলাম।ও যদি আজ বাচার সুযোগ পেত তবে নিশ্চয়ই ওর জন্য কেউ হয়ত মমতাজ মহল বানাতো।
আচ্ছা ও কি আমার মতোই কথা বলতে পারবে না!নাকি সবার মতো মা মা বলে পাগল করে দেবে।
আজ দেড় বছর হল এই নিমগাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে আছি।ওরা আমার পুচকিটাকেও ছাড়ে নি।আলাদা করেছে আমার থেকে।কিন্তু সেই জানোয়ার গুলো এখনো আগের মতই বুক ফুলিয়ে চলে।
এদেশে কোন নারী ধর্ষিত হলে,তার জন্য "জাস্টিস ফর উইমেন" স্লোগানে সভা সমিতি,রেলি,মানববন্ধন হয়।ধর্ষিত মেয়েটি অপামার জনতার গণবোন হয়ে যায় কেবল হতে পারে না কারো বউ।বাকি সবাই পার পেয়ে গেলেও সামাজিক মর্যাদা পায় না কেবল পত্রিকার শিরোনাম হওয়া মেয়েগুলো।বড্ড কষ্ট হয় একটা সময় এই দেশটাকে কতই না ভালোবাসতাম।

Comments

Popular posts from this blog

বিভিন্ন প্রকারের রাসায়নিক সারের কাজ।

বিয়ে ছাড়াই বউ!

ভালোবাসার শেষ ইচ্ছা