একটু বেশি অকারণ ভালোবাসা

গায়ে প্রচন্ড জ্বর।লেপ কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি।বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।বৃষ্টির এই মুহূর্তগুলো আমার খুব ভালো লাগে।বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে বৃষ্টি উপভোগ করার মজাই আলাদা।কিন্তু হঠাৎ করেই গায়ে জ্বর বেধে বসলো।জ্বরের প্রকোপটা এতোটাই বেশি ছিলো যে চোখ মেলে জানালার পাশ দিয়ে তাকিয়ে বৃষ্টির এই মনোরম দৃশ্যটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছেনা।মনটা খারাপ হয়ে আছে।একটু ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করছিলাম।ভাবছিলাম মনের অজান্তের অনেক স্মৃতি।এসব ভাবতে ভাবতে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনেই ছিলোনা। হঠাৎ করে একটা মিষ্টি সুরের আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। চোখ খুলে চেয়ে দেখি নেহা আমার পাশে বসে থেকে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
.
নেহা আমার স্ত্রী। আমরা বিয়ে করেছি প্রায় দুবছর পেরিয়ে গেছে।দুজন দুজনকে ভালোবেসে বিয়ে করলেও পরিবারের সম্মতি নিয়েই আমাদের বিয়েটা হয়েছে।নেহার সাথে পরিচয় ভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকে।দুজনে একই বিষয়ে পড়াশুনা করতাম।যেদিন নেহাকে প্রথম দেখেছিলাম সেদিন থেকেই ওর প্রেমে পড়ে গেছিলাম।ভাগ্যিস প্রপোজটা তাড়াতিস করে ফেলেছিলাম।তা না হলে আজকে হয়তো ও আমার থেকে অনেক দূরে থাকতো।
.
যেদিন থেকে নেহাকে ভালোবেসেছিলাম সেদিন থেকে এক মুহূর্তের জন্য ওকে মনের আড়াল করিনি।আজো নেহাকে আগের মতোই ভালোবাসি।হয়তো আগের মতো ওর সাথে ঘুরতে যেতে পারিনা।ওর কিছু দুষ্টমির ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে পারিনা তবুও কখনো কোনো অভিযোগ করেনা নেহা।নিজের মতো করে সংসারটাকে সুন্দর মতো চালিয়ে নেয়।প্রতিদিন অফিস করে এসে নেহাকে ঘুরতে যাওয়ার খুব ইচ্ছে হয় কিন্তু ব্যস্ততার জন্য আর হয়ে উঠে না।মাস শেষে বেতনের টাকা এনে সম্পূর্ণ ওর হাতেই তুলে দিই।সেটাতে কিভাবে পুরো একটা মাস চলা যায় তার সবই ও দেখে।আমার সামান্য অসুখ হলেও ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে।সারাক্ষণ আমার পাশে বসে থাকে।কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।আর যখন কোনো কিছু আমি চিন্তায় অস্থির হয়ে যায় নেহা তা খুব ঠান্ডা মাথায় সমাধান করে দেয়।মাঝেমাঝে ওর ভালোবাসার কাছে ওর জন্য আমার ভালোবাসা নেহাতি কম মনে হয়।তবুও ওকে ভালোবেসে যেতে চাই আজীবন।কিছু অকারণে,অবাধ্য শাসনে।
.
হঠাৎ করেই নেহার ডাকে স্মৃতির পাতা থেকে বাস্তবে ফিরে আসলাম।
--এই শুনছো! এখন কেমন লাগছে? জ্বরটা কি কমেছে?(নেহা)
--হুম কিছুটা।
--তোমার জন্য কি রান্না করবো বলোতো? স্পেশাল কিছু খেতে মন চাইছে?
খাওয়ার কথাটা শুনে একটু ভাবনার জগতে উঁকি দিলাম। এমনিতেই জ্বরের কারণে মুখে রুচি নেই তারমধ্যে আবার বৃষ্টির দিন।ভাবলাম খিচুরি রান্না হলে মন্দ হতো না।
.
খিচুরির কথা শুনে নেহা একটু অপেক্ষা করতে বলে মাথা হাত বুলিয়ে চলে গেলো।আমি আবারো ঘুমিয়ে পড়লাম।কিছুক্ষণ পর,ঠিক কতক্ষণ তা বলতে পারবো না।নেহা এসে আমাকে জাগিয়ে তুলে খেতে দিলো।শরীরটা দূর্বল ছিলো বলে খাবার তুলে খেতে কষ্ট হচ্ছিলো।
--দাও আমি খাইয়ে দিচ্ছি (নেহা)
--তোমাকে কষ্ট করতে হবেনা।আমি খেয়ে নিতে পারবো।
--চুপ! ঢং করবে না।আমি খাইয়ে দিচ্ছি। চুপচাপ খাবারটা খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিবে।
মাঝেমাঝে নেহার মিষ্টি শাসন ওর প্রতি আমাকে আরো গভীরভাবে টানে।মনে হয় সারাটা যেন এভাবেই ওর পাশে থাকতে পারতাম।কজনের ভাগ্যেই বা এমন মেয়ে জুটে,যে মেয়ে নি:স্বার্থ ভাবে কাউকে ভালো যেতে পারে।
.
মুখটা তেতো হয়েছিলো তাই ভালো করে খেতে পারলাম না।অল্প কিছু খেয়ে ওষুধ টা খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আমাকে খাইয়ে নেহা বাসার ছোটখাটো কাজ করতে লেগে গেলো।শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগছিলোনা তাই নেহাকে বলে খুব কষ্টে বারান্দায় গিয়ে চেয়ারে বসে রইলাম।বৃষ্টি অনেকটা কমে গেছে।
.
সারাদিন আকাশটা মেঘে আচ্ছন্ন ছিলো।এখন বিকাল বেলা।শরীরটা একটু ভালো লাগছিলো বলে ছাদে হাটাহাটি করছিলাম।আস্তে আস্তে কালো ছায়া নেমে আসলো পৃথিবীর বুকে।আজকের সন্ধ্যাবেলার আগমন প্রতিদিনের চেয়ে একটু আলাদা।নিশ্চুপ,নিস্তব্ধ এক ঘন কালো ছায়া পৃথিবীকে নিজের মধ্যে আড়াল করে দেয়।
.
বাসায় ফিরে এলাম।এসে দেখি নেহা বারান্দায় দাড়িয়ে আছে।কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখতেই ও চমকে গেলো।আমার দিকে ফিরে তাকানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে চোখ মুছতে গিয়েও কয়েক ফোটা জল আমার দৃষ্টিতে এসে অপরাধীর মতো ধরা দিলো।নেহাকে কখনো এভাবে চোখের জল ফেলতে দেখিনি।আজ ওর কান্না আমার হৃদয়ে এক অচেনা ঝড় তুলে দিলো।চোখের জল মুছে দিয়ে নেহাকে বুকে টেনে নিলাম।জানিনা হয়তো আরো কতদিন এভাবে নিজেকে আমার কাছে থেকে আড়াল করে কেঁদেছে।
.
--নেহা, কাঁদছো কেন?
--কই না তো!
--তুমি আমাকে মিথ্যে বলছো।তোমার চোখ বলে দিচ্ছে তুমি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছো।বলোনা কি হয়েছে।
টপটপ করে আরো কয়েক ফোঁটা জল নেহার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো।চোখের জলগুলোও অবুঝ।জানেনা কিছু সামনে নিজেকে প্রকাশ করতে নেই।তা না হলে তারা অশ্রুসিক্ত মানুষের চেয়ে বেশি কষ্ট পায়।
--নেহাল তুমি আমাকে পেয়ে খুশি তো? আমি কি সত্যিই তোমার মনে জায়গা করে নিতে পেরেছি তো?
বিয়ের দুইবছর পর নেহার মুখে এরকম কথা শুনে সত্যিই আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি।যে মেয়েটা আমাকে ভালোবাসায় জীবনটা পূর্ণ
করে দিয়েছে তার মুখে এমন কথা শুনে আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না।আলতো করে আমার হাত দুটি নেহার গালে রাখলাম।
--নেহা, আমি তোমাকে বউ হিসেবে পেয়েছি এর চেয়ে সুখের আমার জীবনের আর কিছুই হতে পারেনা।আমি সারাটি জীবন এভাবেই তোমার পাশে থেকে,তোমার হাতে হাত রেখে কাটিয়ে দিতে চাই।আমার হৃদস্পন্দনে তুমি মিশে আছো।তোমাকে ছাড়া আমার পৃথিবী এই রাত্রির মতোই অন্ধকারে ছেয়ে যাবে।
--আমার কেনো জানি খুব ভয় হয়।যদি কোনো কারণে তোমাকে হারিয়ে ফেলি।আমি তোমাকে হারাতে চাইনা।তোমাকে ভালোবেসে আমি হাজারো জনম কাটিয়ে দিতে চাই।
--নেহা, তুমি আমাকে এতো ভালোবাসো কেন?
--জানিনা।তবে তোমার পাশে থাকলে,তোমার স্পর্শ পেলে আমি সব দুঃখ নিমিষেই ভুলে যায়।
.
আবারো বৃষ্টি হচ্ছে।আর এদিকে আমার প্রিয়তমার চোখ দিয়ে এখনো অশ্রু ঝরে পড়ছে।চোখের জল মুছে দিয়ে আলতো করে নেহার কপালে ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিলাম।দুজনে মিলে রুমে আসলাম।কারেন্ট না থাকার কারণে নেহা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলো।মোমবাতির হালকা আবছা আলোয় আজ আমি অন্যরকম এক নেহাকে দেখতে পেলাম।খাওয়া শেষ হলে দুজনে মিলে বসে গল্প করতে লাগলাম।
--এই, চলোনা ঘুমিয়ে পড়ি।রাত তো অনেক হলো।
--সবেমাত্র ৯টা বাজে।এটা অনেক রাত হলো? আর একটু অপেক্ষা করো,তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।
--কি সারপ্রাইজ?
--সেটা না হয় পরেই দেখো।নেহা একটা গান শুনাও না? অনেকদিন হলো তোমার গান শুনিনা।
আমি নেহার কোলে শুয়ে গান শুনলে লাগলাম।ওর সুরের কাছে পৃথিবীর সব সুর আমার কাছে শূন্য মনে হয়।
.
রাত দশটা।আজ নেহার ২৬তম জন্মদিন। অসুস্থতার জন্য কিছুই করতে পারিনি।কোনো গিফট ও কিনতে পারিনি।হাটু গেড়ে বসে নেহার হাতে চুমু খেলাম।
--শুভ জন্মদিন নেহা! এভাবেই তুমি হাজারো বছর বেঁচে থাকো।তোমাকে আর একটু বেশি ভালোবাসার সুযোগ দাও।
খুশিতে নেহা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
--তুমি মনে রেখেছিলে আজকে আমার জন্মদিন!। তুমি একটা পাগল! উইশ করার জন্য তোমাকে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে জেগে থাকার কি দরকার ছিলো।
--আই এম সরি নেহা! তোমাকে জন্মদিনের কিছু উপহার দিতে পারলাম না।
নেহা আমাকে আলতো করে চিমটি কেটে বললো,তুমিই আমার সবচেয়ে বড় উপহার।আমার আর কিচ্ছু চাইনা।তোমাকে সরাজীবনে ভালোবেসে যেতে চাই।শেষ নিশ্বাসের আগ পর্যন্ত।

Comments