একজন নতুন বউ এর গল্প!

বিশাল এক যৌথ পরিবারের বউ হয়ে এসেছি, চারজন দেওয়ার, তাদের বউ,
চারজন ননদ, আবার তাদের জামাতা,
আর শ্বশুর - শাশুড়ি, এই বিশাল পরিবারের সবার বড় আমার স্বামী, অথচ তাকে সবার শেষে বিয়ে করানো হলো, অনেকের মুখে শুনেছি আমার স্বামী নাকি একটু সাদা- সিধে টাইপের বিধেয় তাকে সবার শেষে বিয়ে করানো হলো। আমার এখন ও মনে পড়লে হাসি আসে যে বিয়ের দিন কী পরিমান বোকা হলে কবুল বলতে গিয়ে কান্না করতে- করতে আশেপাশের সবগুলো মানুষকে ও কান্না করাইছে। আমি অবশ্য দেখিনি, কারন আমার বাবা একজন মাদরাসার শিক্ষক সেই হিসেবে ইসলামিক বিধি- বিধান অনুযায়ী আমরা বড় হয়েছি, কিন্তু মামা ফোন করে আমাকে বললো --- হ্যারে নুজাইফা তোর বাবা তোরে কেমন ছেলের কাছে বিয়ে দিচ্ছে, যে ছেলে এমন সাদা- সিধে যে কবুল বলতে গিয়ে চোখের জলে বণ্যা বানাইয়া ফেললো ।
আমি তখন পুরোপুরি কান্না করে দিলাম, শেষ পর্যন্ত বাবা এমন একটা ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিলো , কিন্তু পরে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মেনে নিলাম, কেননা তিনি যা করে সব তো ভালোর জন্য করেন।
অবশ্য বাবাকে আর কী বলবো, বাবা তো বিয়েটা দিতে চাননি, কেননা ওনি চেয়েছেন আমার বিয়েটা যেনো একজন আলেমের সাথে হয়।
কিন্তু ওনার মা অথ্যাৎ আমার শাশুড়ি বাবার পা অবধি ধরা বাকি ছিলো, আর তাছাড়া আমার শ্বশুর ও অনেক পরহেজগার তাই বাবা আর না করতে পারলোনা। যাইহোক বিয়েটা ঝাকঝামক ভাবে হয়নি, মসজিদেই হয়েছে।



অতঃপর যখন শ্বশুরকুলে পা রাখিলাম অবাক না হয়ে পারলাম না, আগে কার যুগের সেই পুরোনো তিনতলা বাড়ি, নিচে বিশাল বড় উঠোন, আর চারপাশে গাছ- গাছালী, আর সবকিছু কেমন যেনো সেকেলে অবশ্য বাড়িকে আর কী বলবো আমার উনিইতো সেকেলের একজন, ভাগ্য ক্রমেই হয়তো এতোদিন অবদি বেঁচে আছে, কেন বললাম, তা পরে বলছি। আগে আমার শাশুড়ি মায়ের কথা বলি, আমার শ্বশুরের মাথায় টুপি পরনে পান্জাবী আর লাল - দাড়ী, অথচ আমার শাশুড়ি এতোই নওযোয়ান ও মর্ডান যে তাকে প্রথমদিন দেখে তো আমি শুধু ভেবেছিলাম ---- এনার ৮ টা ছেলে- মেয়ে কেমনে কী?
আর আমার ননদগুলো প্রচুর ঠেস মেরে কথা বলতে পারে এটুকুই অনেক আগেই বুঝে ফেলেছি। আমার জা গুলো কিছু পারুক না পারুক প্রচুর সাজতে পারে আর অন্যের সাথে গায়ের রং আর চেহারা মিলিয়ে তার চেহারা খারাপ হলে তাকে খোটা দিতে পারে।
কিন্তু আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে হয়তো আমার চেহার ও গায়ের রং দুটো একটু বেশিই ভালো দেখে তারা আমাকে ভালো চোখে দেখেনা, এমনকি তারা এ আমার শাশুড়ি কে ও মুখ ফসকে বলে ফেলেছে --- মা দাদাভাই যে সহজ---সরল তার জন্য কী এমন মেয়ে আনা উচিত হলো?
শাশুড়ি মা তখন বললো--- এই মেয়ে পরহেজগার অতএব কোনো সমস্যা নেই।
শাশুড়ি কথা শুনে ওনার দিকে তাকাতেই ওনি আমাকে বল উঠলো --- মা তোমার এ বাড়িতে এসে খারাপ লাগছে কী ?
নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে, না বললাম।
, ও পাশ থেকে আব্বাজান তখন বলে উঠলেন--- দেখোছ দ্বীনদার মেয়ে দেখে লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছে। আর তোমার ওই বউগুলো বিয়ের দিন দুইফোটা চোখেরজল ফেলেছে কিনা সন্দেহ আছে।
ছোট জা তখন হেসে- হেসে বলতে লাগলো --- আব্বা আমি না কখনো চুপচাপ থাকতে পারিনা, তাই বিয়ের দিন ও চুপ থাকিনেই, আর আব্বা আমার মা আমার নাম শখ করে হাসি রেখেছে তাই জীবনে কোনোদিন আমি কাদিনি,আর বিয়ের দিন ও না । আব্বা ওর কথায় তখন মুচকি হাসতে লাগলেন। ও খুব সহজ - সরল টাইপের একটা মেয়ে, সেটা যেদিন ওরা আমাকে দেখতে গিয়েছে সেদিনেই বুঝতে পেরেছি। ওর সাথে আমার প্রথমদিনেই খুব ভাব হয়েছে, তাই এতো পদের মানুষের মাঝে ও আমার শ্বশুরমশাই আর ওর জন্য ভয় লাগছে না।


যাইহোক হাসি আমাকে নিয়ে সোজা উপরের ঘরে চলে আসে, ওনার ঘরে নিয়ে যেতেই আমার কেমন জানী অস্বস্তি লাগছিলো, কারন ঘরটা এতো পরিমান অগোছালো, নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে, পুরো বাড়িটা পুরোনো হলে রং করা, একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখে মোটামুটি ভালোই লাগছিলো কিন্তু ওনার ঘরটাই রং করা তো দূরে থাকে যে অবস্থা তাতে আমার প্রায় শ্বাস নিতে ও কষ্ট হচ্ছিলো। আমার এই অবস্থা দেখে হাসি বলতে লাগলো ---- ভাবি তোমার ভীষন কষ্ট হচ্ছে না তাইনা?
আমি তখন একটু হেসে বললাম --- না।
হাসি তখন বলে উঠলো---- কী করবা বলো তোমার জামাই, মনসুর আলী, যে পরিমান গাঁধা তাতে তো ঘরের এই অবস্থা হবেই।
একটু চমকে উঠে বললাম ---- মানে?
----- বুঝবে-- বুঝবে এসে যখন পড়েছো, খুব শীঘ্রই বুঝে যাবে। যাইহোক এখানেই মনসুর আলী থাকে, আর আজ থেকে তুমি ও এখানে থাকবে।


ওর কথা শুনে ওর দিকে হা করে তাকাতেই ও আমাকে বলে উঠলো--- চমকানোর কিছু বলিনি, তোমার জামাই কে কেউ সম্মান করেনা, সবাই মনসুর আলী অথ্যাৎ ওনার নাম ধরেই ডাকে, বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে ওনাকে আমি দাদা বলতেই ভাবীরা আমাকে ভীষণ বকেছে, সবাই আব্বাজানের সামনে তাকে সম্মান দেখায়, আমি ওতো অভিনয় করতে পারিনা ওদের মতো তাই তোমাকে সব সোজা - সাপটা বলে দিচ্ছি ।
শান্ত কন্ঠে ওকে জিজ্ঞাসা করলাম--- কিন্তু কেন?
----- সব এখনেই জানলে হবে, আস্তে - আস্তে তুমি নিজেই সব বুঝে যাবে।
যাইহোক আমি আসি আর তোমার কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে বলো ভুল করে ও আর কেউকে বলবেনা, যদি বলো তাহলে আব্বাজানকে বলো।


এই বলে হাসি নিচে চলে যেতেই একা ঘরে ভাবতে লাগলাম--- ব্যাপারটা কী? কোনো সমস্যা আবার আছে নাকি? যাইহোক স্বামীর নামটা আমার খাস--- মনসুর আলী, কিন্তু এই মনসুর আলী দেখতে কেমন? আল্লাই জানে।
এই বলে হাসতে - হাসতে কাপড় বেঁধে কাজে নেমে পড়লাম, খাটের তলায় একটা ঝাড়ু পেলাম ব্যস সেটাকে নিয়ে পুরো ঘর - দুয়ার ঝাড়ু দিলাম, এতো ময়লা যে আমার প্রায় হাঁপানি উঠে গেলো। এতো নোংরা কেন মনসুর আলী, হায় আল্লাহ শেষমেশ একটা নোংরা ব্যাটার সাথে আমার বিবাহ হলো।


এই বলে কাঁদতে- কাঁদতে ঝাড়ু খাটের তলে রাখতে গেলাম --- ঠিক তখনি পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠলো--- আপাজান আপনে কী এ বাড়ির নতুন কাজের মেয়ে?
কথাটা শুনে টাসকি খেয়ে গেলাম, একটু রাগ নিয়ে উঠে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখি বিশাল দেহের অধিকারী একজন পুরুষ মাথায় হালকা চুল, মুখে দাড়ী, বাবরি কোকড়ানো চুল, পরনে একটা পান্জাবী তাও আধীযুগের, গায়ের রং টাও বেজায় কালো।
লোকটিকে দেখে অন্যদিকে মুখ করে ফিসফিস করে বলতে লাগলাম--- এ আবার কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম। নিশ্চয় এ বাড়ির কাজের লোক, পোশাকেআশাকে তো তাই মনে হচ্ছে ।
আমার নিরবতা দেখে লোকটি তখন আবার বললো --- আহারে আপা আপনে দেখতে কতো সুন্দর তাও পেটের দায়ে কাজ করতে হচ্ছে!!!
একটু চেঁচিয়ে - লোকটিকে বললাম ---- সম্মান দিয়ে কথা বলুন, আমি এ বাড়ির বড় বউ ।
লোকটি তখন বললো,--- আপনে এ বাড়ির বড় বউ, ও আচ্ছা আগে কইবেন না। আমার পরিচয়টা জেনে নিন আমি এ বাড়ির বড় ছেলে ।
---- জোরে চিৎকার দিয়ে বললাম--- কী!!!!
লোকটি তখন কান্নামাখা কন্ঠে বললো --- আপামনি আস্তে, আপনার চিৎকারে আমার কান্না চলে আসছে, এই দেখেন পান্জাবী দিয়া পানি মুছতে আছি। বিশ্বাস করুন আমি এটা বলিনি আম্মা কইছে আমি নাকি এ বাড়ির বড় ছেলে ।
----- আমি নুজাইফা।
---- নামটা কই যেনো শুনছি, ও মনে পড়ছে আম্মা কইছে আমার বউয়ের নাম ও নাকি নুজাইফা।
--- কাঁদতে-- কাঁদতে বললাম --- আমি মনসুর আলীর বউ।
লোকটি ও তখন কাঁদতে-- কাঁদতে বললো ---- আমার নাম ও তো মনসুর আলী।
-----অ্যা,অ্যা,অ্যা হায় আমার এ কী সর্বনাশ হলো ।
মনসুর ও তখন বলতে লাগলো ------ আপা আমার ও কী সর্বনাশ হলো।
---- রেগে বললাম --- ওই আপনার কী সর্বনাশ হলো?
---- আগে বলেন আপনে কে আপা?
---- অ্যা, অ্যা চুপ আমি আপা নই মনসুর আলীর বউ নুজাইফা।
---- ও, কিন্তু মনসুর আলী আমার নাম তার মানে আপনার আমার বউ?
--- হ্যারে গাঁধা। আমি কালেই বাবার বাড়ি চলে যাবো।
-----কিন্তু কেন আপামনি?
--- চুপ একদম চুপ আর একবার ও আপামনি বলবেন না। চলে যাবো আপনার মতো একটা গাঁধার সাথে বিয়ে হওয়ায়।

Comments