জেদি মেয়ের ভালোবাসা

ঠাআআআআআসসসসস
---এই আপনি কে, এভাবে রুমে ঢুকে রোগির
গায়ে হাত তুলছেন কেন????
---চুউউউউপপপ। না হলে পরের থাপ্পরটা আপনার
গালে পড়বে বলে দিলাম।
---মানে কি আপনি এমন করছেন কেন, দেখছেন
তো উনি অসুস্থ ।
---এই তুই চুপ করবি না দিব একটা??? ও শারিরীক
নয় মানসিক ভাবেও অসুস্থ । আর একটা শব্দ করবি
না।
ধমক শুনে নার্স একদম চুপ হয়ে গেলো। আর একটা
শব্দও করছে না।
আমি লিপির দিকে ফিরলাম, এতখনে চোখ
বেয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে। গালের উপর
চার আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে।
এমনিতেই কিছুদিন ঠিক মত না খেয়ে শরিরের
যে অবস্থা করেছে তার উপর এই কাজ।
সকালে যখন ওর বাবা আমার রুমে এসে বলল
লিপি সুইসাইড করার চেষ্টা করেছিল, ওর মা
দেখে ফেলাতে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে
যায়। এই যাত্রা রক্ষা পেয়েছে।
তখন কেমন যেন লাগতে লাগল। রাগও হল বেশ।
কথাগুলো বলে লিপির বাবা আমার হাত ধরে
কাঁদতে লাগল, একমাত্র মেয়ে যদি এভাবে
সুইসাইডের চেষ্টা করে তাহলে কোন বাবা মা
সহ্য করতে পারে।
উনার কান্না দেখে লিপির উপর রাগটা
বেড়ে গেলো।
তাই উনার থেকে সব জেনে হাসপাতালে
চলে আসি।
রুমে ঢুকে লিপির বেডের গিয়ে দাঁড়াই
আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলেতে
যেতেই বসিয়ে দিলাম এক থাপ্পর।
আমি যে রুমে ঢুকেছি নার্স তা বুঝতেই
পারেনি, তিনি অন্য দিকে ঘুরে কাজ
করছিলেন।
আরে আমি না করেছি বলেই কি আত্নহত্যা
করতে হবে, দেশে ছেলের অভাব পড়ছে,
জীবনের মায়া নেই, নিজের ভালবাসাই সব
যে বাবা মা এত কষ্ট করে জন্মদিল, কোলে
পিঠে করে মানুষ করল তার কোন মূল্য নেই???
তাদের তোকেনিয়ে দেখা সপ্নগুলো কী
মরিচিকা হয়ে রবে????
অন্য একটা ছেলের জন্য সব শেষ করে দিবি তুই…..
বছর দুয়েক হল আমি লিপিকে পড়াই, আমাদের মত
গরিব ঘরের ছেলেদের পড়ালেখার খরচ এই
টিউশনি করেই চালাতে হয়। বাবা মায়ের
সামর্থ নেই এত টাকা খরচ করে পড়াশোনা
করানোর, যদিও তাঁরা চেষ্টার ত্রুটি রাখে
না।
বেশ কয়েকটা টিউশনির মাঝে লিপিরটাও
একটা।
লিপি ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, আগের বছর
পরিক্ষায় ভাল করাই লিপির বাবা আমার
বেতন বাড়িয়ে দেন, যখন ম্যাস থেকে বের
করে দেয়া হল তখন তাঁদের বাসার
চিলেকোঠাই ঠাইও মিলেছিল।
ম্যাসের মালিক হঠাত করেই ম্যাস ছেড়ে
দিতে বলল, তিনি নাকি এটা ভেঙে
বিল্ডিং করবেন। চিন্তা পড়ে গেলাম কি করব
এখন কই যাব।
আমাকে চিন্তিত দেখে লিপির মা জিগেস
করে কিছু হয়ছে নাকি। তাকে খুলে বলতেই
লিপির বাবার সাথে আলোচনা করে আমাকে
থাকতে দেই, থাকা খাওয়া সবই তাদের
পরিবারের সাথে।
এক বাড়িতে থাকার ফলেই আরো বেশি সময়
কাটতে লাগল লিপির সাথে।
লিপি অবসর পেলেই আমার সাথে গল্প করতে
আসত, আমার রুমে বসে গল্পের বউ পড়ত।
বিভিন্ন সময় আমার বই খাতা ঘাটাঘাটি করত।
ক্রমেই এর মাত্রাটা আরো বাড়তে লাগল।
একটা সময় লক্ষ করলাও ও কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে,
এখন অনেক ফ্রি ভাবে মিশে আমার সাথে,
আমার ঘর গুছিয়ে দেই, মাঝে মাঝে
জামাকাপড়ও ধুয়ে দেই, অল্প অল্প করে আমার
উপর অধিকার খাটাতে শুরু করছে।
এখন যেন একটু বেশিই কেয়ার করে, অধিকার
খাটানোর মাত্রাটাও যেন বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমি এসব লক্ষ করেও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা
করি, কবুও কেন যেন লিপি আরো বেশি করে
কেয়ার করতে থাকে।
এক সময় মনে হলো এখানে থাকা উচিৎ না, তাই
ম্যাস খুজতে শুরু করলাম, আমি চাইনা যারা
আমাকে বিপদে আশ্রই দিল তাদের সন্মানের
কোন ক্ষতি হোক।
এতদিনে খুব ভাল করেই বুঝে গেছি কেন ও এত্ত
কেয়ার করে, অধিকার খাটাই।
কিছু দিন পরে একটা ম্যাসে সিটও পেয়ে
গেলাময়, সেদিনই রাতে খাওয়ার সময় লিপির
বাবা মাকে বললাম কথাটা, তিনারা তেমন
কিছু বললেন না। সুধু বললেন কোন সমস্যা না হলে
যেন এখানেই থেকে যায়…..
পরের দিন সন্ধায় যখন পড়াতে গেলাম
লিপিকে তখন আসল ঘটনার মুখোমুখি হতে হলো।
পড়া শুরু করার আগেই লিপি প্রশ্ন ছুড়ে দিল কেন
আমি এই বাড়ি ছাড়ছি???? এখানে কী অসুবিধা
আমার????
আমি কোন উওর দেই নি, আসলে দেয়ার মত উওর
তো নেই, কারনটা যে ও নিজেই…… কী করে বলব
তুমিই কারন…..
---কী হলো বললেন না যে???
---ওসব বাদ দাও, পড়তে বস।
---আগে আমার প্রশ্নের উওর দিন।
---এবাড়িতে আর কত দিন, বিপদের সময় আশ্রই
পেয়েছিলাম সেটাই অনেক।
---এটাই কারন নাকী আমি আসল কারন টা।
এবার আর বলার কি আছে, তাই চুপ করে আছি।
---আপনি যাই করেন আর বলেন, আমি আপনাকে
পছন্দ করি আর সে জন্যই এত্ত কেয়ার করি। আমি
আপনাকে ভালবাসি। আর আপনি যদি এই বাড়ি
ছাড়েন তো আমি নিজেকে শেষ করে ফেলব,
এখন সিদ্ধান্ত আপনার…..
বলেই লিপি টেবিল থেকে উঠে পড়ল,, আমিও
কিছুখন বসে উঠে এলাম, রুমের বাইরে আসতেই
লিপির মা বলল
---রাশেদ পড়ানো শেষ বাবা???
---জ্বী আন্টি লিপির নাকি শরির খারাপ
ওপড়বে না আজ।
---ওওও, আচ্ছা যাও তাহলে…..
নিজের রুমে এসে ভাবতে লাগলাম এখন কি
করে। মেয়েটা যেভাবে বলল তাতে করে মনে
হচ্ছে ও যা বলছে তাই করতেও পারে। আবার
আমিও পাডব না ওকে গ্রহন করতে, একে তো
গরিব ঘরের সন্তান, তার উপর বাবা মায়ের
অনেক আশা ভরসা, নিজের কিছু ছোট্ট ছোট্ট
সপ্নো……
কঠিক এক দোটানায় পড়ে গেলাম, অনেক ভেবে
আপাতত ম্যাসে ফেরার চিন্তাটা বাদ দিলাম,
দেখি কি হয়, লিপির পরিক্ষার পর না হয়
ভাবব….
রাতে খেতে গেলে লিপির বাবাও নিষেধ
করল আপাতত ম্যাসে যেতে।
দেখে মনে হলো তিনি হয়ত আসল কারনটা
জানেন না….
যায় হোক সব আগের মতন চলতে লাগল, আগের মতই
লিপির কেয়ার অধিকার খাটানো, ও হয়ত
ভেবেছিল আমিও ওকে পছন্দ করি, কিন্তু সেটা
তো ভুল….
একদিন রুমে বসে বই পড়ছিলাম, বিকেলের
দিকে লিপির আগমন হলো
---আসতে পারি???
---ও, তুমি এসো এসো….
---কি করছিলেন???
---এইতো বই পড়ছিলাম। তুমি এই সময়।
---কেন আসতে মানা????
---তা কেন, কিন্তু এভাবে সময় অসময় আমার রুমে
আসাটা মানায় না।
---কেন মানায় না শুনি, আমাকে কি আপনার
পছন্দ না????
---দেখ আমি তোমাকে শুধু আমার ছাত্রী ভাবি
ভিন্ন কিছু নয়, আমি কখনই তোমাকে
ভালবাসতে পারব না, বাস্তবতাকে মানতে
শেখ, আমার উপর আছে বাবা মায়ের অনেক
আশা ভরসা, নিজের কিছু সপ্নো, তার উপর তুমি
মোটামুটি উচ্ছবৃত্ত পরিবারের সন্তান, আমার মত
নিম্নবৃত্তদের সাথে তোমার যায় না।
---ভালবাসা কী ধনি গরিব দেখে হয়???
---তা হয় না, তবুও কিছু চাহিদা থাকে জীবন
চলার পথে, যা পুরন করার সামর্থ আমার নেই।
---আমি না হয় অপেক্ষা করব আপনার সে সময় না
আসা পর্যন্ত।
---তোমাকে আর কিছুই করতে হবে না,
পড়াশোনাই মন দাও তোমাকে নিয়ে তোমার
বাবা মায়ের নিশ্চয় কিছু সপ্ন আছে সেগুলো
নষ্ট করে দিও না……
---আমি তাদের সপ্ন নষ্ট করছি না, আমার
সপ্নোগুলো সত্যি করার চেষ্টা করছি……
---চুপ একদম চুপ, আর একটা কথাও বলবা না। আমি
চাইনা তোমার আমার মাঝে কোন সম্পর্ক হোক,
আর যদি তুমি বারাবাড়ি কর তবে আমি এই
বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।
এখন নিজের রুমে গিয়ে পড়তে বস…… বেশ করা
গলাই বললাম কথা গুলো…..
দু’চোখপানিতে টলমল করছে, ওড়না দিয়ে চোখ
মুছে বেড়িয়ে গেলো…
দরজায় গিয়ে আবার পেছন ফিরে তাকিয়ে
বলল
---আমিও দেখব, যদি আপনাকে না পাই তবে আর
কারো হব না…..
বলেই চলে গেলো।
শরির খারাপের বাহানা করে দুদিন আর যাইনি
পড়াতে, তিন দিনের দিন গেলাম পড়াতে, এর
মাঝে খাইতে গেলেও লিপির সাথে দেখা
হয় নি। কয়েক দিন হয়ত কষ্ট পাবে একটা সময় ঠিকই
সব ভুলে যাবে…..
চুপটি করে বই নিয়ে বসল, আগের মতন আর চঞ্চল
নেই, অনেক শান্ত মনে হচ্ছে, মুখটা মলিন হয়ে
আছে, চোখের নিচে কালো দাগ
সেদিনের মত ভাল ভাবেই পড়িয়ে আসি, আরো
সপ্তা খানিক সেভাবেই যাই, দিন দিন
মেয়েটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে,
খাওয়াদাওয়া করে না ঠিক মতন, ক্লাসে যায়
না…..
সপ্তা খানিক পরে শুক্রবার জুম্মার নামাজ পড়ে
এসে শুয়ে আছি লিপির বাবা এলো…
----রাশেদ আছো বাবা???
---জ্বী, আঙ্কেল আসুন আসুন….
চেয়ার টেনে বসতে দিলাম, বেশ কিছুখন নিরব
বসে রইলেন।
তারপর বললেন
---দেখ বাবা আমার একটাই মাত্র সন্তান, অনেক
আদরে মানুষ করেছি কখনো কোন অপূর্নতা রাখি
নি, সব সময় চেষ্টা করেছি চাওয়ার সাথে
সাথে এনে দিতে।
কিন্তু এবার এমন একটা জিনিস চেয়েছে যেটা
আমি চাইলেই এনে দিতে পারি না, আরো
অনেক জনেরও চাওয়া প্রয়োজন। আমি তোমার
বাবা মাসের সাথেও কথা বলেছি, (যখন নতুন
টিউশনিতে আসি তখন সব কিছু, অর্থাৎ জীবন
বিত্তান্ত দিতে হয়েছিল) তাঁদের কোন
আপত্তি নেই, কিন্তু যার মতটা সবচেয়ে গুরত্বপূর্ন
সেটা হলে তুমি।
এটুকু বলে তিনি থামলেন, কি বলব খুজে পাচ্ছি
না। আর এখন যদি এসবে জরাই তাহলে আমি
লক্ষভ্রষ্ট হতে পারি…..
---আমি জানি তুমি হয়ত ভাবছ আমরা বড়লোক,
তুমি গরিব ঘরের সন্তান, কিন্তু আমি মনে করি
তুমি হয়ত বুঝতে পেরেছো আমরা কেমন বড়লোক
হলেও চাল চলনে সবটাই তুমি জান… তাই আশা
করছি তোমার আর কোন আপত্তি নেই…..
এবার কিছু না বললেই নয়
---আমি চাইনা লিপি আবেগের বসে যে
সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটাকে প্রশ্রই দিতে, ও
এখন যে সময় পার করছে তাতে করে এইটা করাই
স্বাভাবিক, আর আমি এখন আমার লক্ষে এগিয়ে
যেতে চাই…..
---বিয়ের পর তুমি তোমার মতন আর ও না হয়
আমাদের সাথেই থাকবে, পরে যখন তুমি
প্রতিষ্ঠিত হবে তখন না হয় তুলে নিও….
---সেটা করলেও একটা পিছুটান রয়েই যাবে
যে….
---হয়ত রবে, বলেই তিনি চুপ হয়ে গেলেন, কিছুখন
বসে নিঃশব্দে উঠে গেলেন।
কয়েক দিন সব ঠিকই ছিল, মনে হচ্ছিল লিপি
নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে……
কিন্তু আমার সে ভুল ভাঙল সকালে লিপির আব্বুর
কথায়…..
আমি যত দুর জানি আজকেই ওকে হাসপাতাল
থেকে ছেড়ে দেয়ার কথা, নার্সকে বললাম সব
কিছু রেডি করতে…..
তত খনে লিপির বাবাও চলে এলেন, আর মা তো
এখানেই ছিলেন, ওকে রিলিজ করে নিয়ে
এলাম। সন্ধায় পারিবারিক ভাবেই সব ঠিক ঠাক
করেই বিয়েটা হয়ে গেলো……..
তবে শর্ত আমি কিছু একটা না করা পর্যন্ত ও
বাবা মায়ের সাথেই থাকবে, আর আগের মতই,
কোন প্রকার জোর খাটানো চলবে না…….
বিয়ের পর লিপির ঠোটের কোন সূক্ষ হাসি
দেখেছিলাম, কারনটা অজানা নয়, আজ যে
তাঁর জয় হয়েছে……
বিয়ের সময় শর্ত থাকলেও নিজের অধিকার
ঠিকই বুঝে নিয়েছে, সব রকমের খবর দারি করত
থাকে।
কখন ফিরলাম, কখন খেলাম, ছুটির দিন গুলোতে
বিকেল হলেই শাড়ি পড়ে হালকা সাজে চলে
আসবে আমার চিলেকোঠার রুমে, বিয়ের পর
ওদের সাথে থাকতে বললেও আমি যাই নি এই
চিলেকোঠা ছেড়ে…..
এসেই বলবে তারাতারি রেডি হন, ঘুরতে যাব,
এই একটা দিনই কোন ভাবেই ওকে না করতে
পারি না, আমারো ভালই লাগে…. তবে আমার
লক্ষ থেকে সরিনি,, মাস্টার্স পরিক্ষা শেষ আর
কয়েকটা মাস রেজাল্ট দিলেই হলো তারপর
কিছু একটা ম্যানেজ করতে পারলেই
পাগলিটাকে পার্মানেন্টলি এই
চিলেকোঠাই নিয়ে আসব…….
আসলে শর্ত দিয়ে কোন সম্পর্কের সীমা টানা
যায় না। কারন সম্পর্কের গন্ডি যে
সীমাহীন…………

Comments