মাধ্যম
বাবা আর মায়ের দূরত্বটা খুব বেশি না। তারা অনায়াসে একজন আরেকজনের কথা শুনতে পারছেন। তবুও আমাকে তাদের কথাবার্তা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
মা বিরক্ত হয়ে বললেন,
-রাসিফ, তোর বাবাকে বলে দে এই সংসারে আমি শুয়ে বসে কাটাই না।
আমি বাবার মুখের দিকে তাকালাম। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি সেইম কথাটা না বলব বাবা, মায়ের কথার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না।
আমি বললাম,
-বাবা, মা এই সংসারে শুয়ে বসে কাটায় না।
এবার বাবার মুখে রাগী ভাব টা ফুটে উঠল। রেগে বললেন,
-রাসিফ, আমিও অফিসে শুধু এসির নিচে বসে কাটাই না। আমাকেও কাজ করতে হয়। সংসারে টাকাটা এমনি এমনি আসে না।
মা এখন ঠান্ডা হয়ে বসে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। আমি মায়ের চা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। বাবা রেগে বললেন,
-কী হলো রাসিফ? কিছু বলছো না কেন?
আমি বাবার কানে ফিসফিস করে বললাম,
-বাবা, মায়ের চা টা শেষ হতে দাও। নয়ত দেখা গেল চা টা রেগে গিয়ে তোমার গায়ে ছুড়ে মারল।
বাবা কিছুটা চুপসে গেলেন। মায়ের চা খাওয়া শেষ হলো। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-কিছু বলছিলি?
-হ্যাঁ, মা। বাবাও অফিসে শুধু এসির নিচে বসে কাটায় না। বাবাকেও কাজ করতে হয়। আর...
দুর্ভাগ্যবশত বাবার এরপরের লাইন গুলো ভুলে গেলাম। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে মিনমিন স্বরে বললাম,
-এরপর যেন কী?
বাবা রাগে হাতের পেপার টা ডায়নিং টেবিলের উপরে আছড়ে ফেলে চলে গেলেন। আমার মনে হচ্ছিল, বাবা হয়ত পেপারের বদলে একটা কাঁচের মগ ভেঙে ফেললে বেশি আনন্দিত বোধ করতেন। কিন্তু সেটা মায়ের জন্য সম্ভব হলো না।
হিয়া ফোন করেছে। ফোনটা ধরেই বললাম,
-শোনো, আমি একটু ব্যস্ত আছি।
-কী কাজ করছো তুমি?
-বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে। এখন তাদের কথা বলার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছি।
ওপর পাশ থেকে হিয়ার হাসির আওয়াজ পেলাম। হাসতে হাসতে মেয়েটি বলল,
-বাহ, বেশ তো। বেতন কত দিচ্ছে তারা?
-সেটা তো এখনও ঠিক হয়নি।
হিয়া হাসি থামিয়ে এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
-এখন কী এভাবেই চলতে দেবে? শোনো, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তাদের এই কাজ চালিয়ে যাবে তাদের ঝগড়া কিন্তু মিটমাট হবে না। তাদের দুইজনকে কথা বলতে দিতে হবে।
-তাহলে কী করব?
রুমে গিয়ে দেখলাম মা চুপচাপ বসে আছেন। বাবা ড্রইং রুমে বসে আছেন। রেগে আছেন নাকি খুশি আছেন সেটা বোঝা গেল না।
-মা, বাবা এক গ্লাস পানি চেয়েছেন।
মা বললেন,
-তোর বাবা নিজে এক গ্লাস পানি গড়িয়ে খেতে পারে না। আবার বড় বড় কথা!
তবুও মা এক গ্লাস পানি নিয়ে বাবার কাছে গেলেন।
একটু পরেই বাবার চেঁচানোর আওয়াজ শুনলাম। ডাক পেয়ে গেলাম সেখানে।
-কী হয়েছে, বাবা?
-আমি কী তোকে পানি এনে দেয়ার জন্য বলেছি?
-তাহলে কী বলেছ?
-আমি বলেছি তোর মাকে শার্টটা আয়রন করে দেয়ার জন্য।
-ওহ স্যরি, বাবা। আমি হয়ত শুনতে ভুল করেছি।
মা গ্লাসটা রেখেই চলে গেলেন। বাবার পিপাসা না পাওয়া সত্বেও পানির গ্লাস টা হাতে নিয়ে এক ঢোকে পানি টা শেষ করলেন।
বাবার কাছে গিয়ে বললাম,
-মা বাজার থেকে এক আটি লাল শাক আনতে বলেছেন।
ব্যাগ হাতে বাবা বেড়িয়ে গেলেন। বাজারের ব্যাগ উল্টে লাল শাক দেখে মা রেগে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-এসব কী এনেছো?
বাবাও এবার মাকে সরাসরি বললেন,
-চোখে কম দেখছো নাকি? লাল শাক এটা।
-তোমাকে আমি রুই মাছ আনতে বলেছি। লাল শাক কেন এনেছো?
আমি তখন রান্নাঘরের দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাবা হুংকার দিলেন। আমি হুড়মুড় করে রান্নাঘরে ঢুকলাম।
-তুই যে বললি তোর মা লাল শাক আনতে বলেছে। মিথ্যে কেন বললি?
আমি এবারেও তখনকার মত বললাম,
-ওহ স্যরি, মা। শুনতে ভুল করেছি।
তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না কাজটা আমি ইচ্ছে করেই করছি। দুইজনে রাগী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। বাবা, মাকে বললেন,
-শোনো সালেহা, তোমার ছেলে এক নাম্বারের ফাজিল হয়ে গেছে। ওকে দিয়ে আমাদের কথা বার্তা চালানো সম্ভব না। তারচাইতে বরং নিজেরাই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চালিয়ে নেই। কী বলো?
মাও রাজি হলেন। তাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো। মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
কয়েকদিন পরে আবার হিয়ার কল। এবারে কল রিসিভ করে বললাম,
-হিয়া, একটা পিয়নের চাকরি পেয়েছি। আমাকে শুভ কামনা জানাও।
-মানে?
-মানে বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া চলছে। এখন তাদের চিঠিপত্র আদান প্রদান করছি। এখন এখানে বিটলামি করার সুযোগ নেই। দুজনে দুজনের হাতের লেখা খুব ভালো করেই চেনে।
ওপর পাশ থেকে হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে বলল,
-ঝগড়া করুক বা যাই করুক তাদের নিজেদের মধ্যে সেটা সলভ করে নিতে দাও। আর সামনাসামনি কথা না বলা পর্যন্ত সেটা সলভ হবে না।
-তাহলে এখন উপায়?
চিঠি গুলো প্রাপক পর্যন্ত না পৌঁছালে কেমন হয়?
এক মুহূর্ত চিন্তা করে মুচকি হেসে বললাম,
-মন্দ হয় না।
(সমাপ্তি)
মাধ্যম
অরণী মেঘ
Comments
Post a Comment