একদিন_বৃষ্টির_দিন
গাদাখানেক শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে খুব কসরত করে পার্স থেকে মোবাইল বের করে ফোন দিলাম ঘাউড়া ক্রাশকে। বললাম- আমি আপনার অফিসের নিচেই আছি এসে ব্যাগ গুলো নিয়ে যান। ওপাশ থেকে ক্রাশ বলল- আপনি এতক্ষণে এসেছেন? আমি এখন বিজি হয়ে গেছি আপনি বরং উপরে চলে আসুন। আমি হাতের কাজটা শেষ করি ততক্ষণ বসুন। আমি সাথে সাথেই বললাম- না না আমি আপনার অফিসে যাব না আপনি নিচে আসুন। ঘাউড়াটা সাথে সাথে বলল তাহলে নিচে দাঁড়িয়ে থাকুন। আমার কাজ শেষ হতে আধ ঘন্টা লাগবে তারপর আসব। বললাম- মানে কী! আমি রাস্তায় এতক্ষণ কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকব? সে বলল- সেজন্যই তো বললাম ওপরে আসুন। আপনি তো শুনছেন না। অযথা বকবক করে যাচ্ছেন, কাজ আছে আমার রাখলাম। রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বললাম- আচ্ছা আসছি।
এই হচ্ছে শামীম আর শামীমার গল্প। হুম এদের নামে শুধু মাত্র একটা আ-কারের পার্থক্য। নামের সাথে সাথে এদের হাজারটা বিষয়ে মিল। আর এসব দেখে দেখেই শামীম শামীমার ক্রাশ হয়ে গেছে। আকারে ইঙ্গিতে শামীমা সেটা অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু গন্ডারটা কিছুতেই মানছে না। তবে হাল ছাড়বার পাত্রী শামীমা নয়। যা হোক আমি তার অফিসে গিয়ে বসলাম। বললাম- আপনি কী ভালো ভাবে কথা বলতে পারেন না নাকি সারাক্ষণ এমন ঝাড়েন কেন, হুম? শামীম বলল- আপনাকে কথা একবার বললে বুঝেন না কেন? এক কথা বার বার বলতে হয়? বললাম- একবার বললেই সেটা বার বার বলা হয়ে যায়? আজব! সে তখন বলল- কথা একবার বললেই বুঝে নেবেন বার বার বলতে পারব না, আর এত ব্যাগ কিসের? বললাম- আপনার জন্য কিছু জিনিস আছে। প্রত্যেকটা জিনিসের গায়ে চিরকুট লাগানো আছে আগে চিরকুট খুলবেন তারপর র্যাপিং খুলবেন। হা-ভাতের মতন আগেই র্যাপিং খুলবেন না। আপনি এলে সব সময় হাতে কিছু থাকবে এটা কেন? এসব ঠিক না বলে সে কাজে মন দিল। আমি তখন বসে বসে তাকে দেখছিলাম আর মনে মনে গাইছিলাম- "ওহে শ্যাম তোমারে আমি নয়নে নয়নে রাখিব... অন্য কেউরে না আমি চাইতে দিব..." আর ভাবছিলাম আহা এই লোকটা এত মিষ্টি করে হাসে অথচ কথা বলার সময় ঝাল ছাড়া কিছুই বের হয় না! ভেতরটা রসে টইটুম্বুর অথচ দেখাবে শুধু শক্ত খোলসটাই! ঘাউড়া কোথাকার। কী সুন্দর "হাম তুম এক কামরে মে বন্ধ হো..." লোকটা যদি একটু তার খোলস থেকে বেরিয়ে আসত তাহলে সময় গুলো কত রোমান্টিক হতে পারত... আহারে জীবন! ঠিক সেই মুহূর্তে সে তার ডেস্কটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকেই বলল- এই যে আপনি আমার দিকে এইভাবে তাকিয়ে আছেন... আমি তখন লজ্জায় ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বললাম- উফফ আপনি একটা যা তা!
শামীম হাতের কাজ শেষ করে একটা ব্যাগ বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল এটা আপনার, এখন চলুন। বললাম- কী আছে এতে? বলল- দিলাম তো আপনাকেই খুলে কী দেখতে পাবেন না? তার দিকে একটা আহত রাগী লুক দিয়ে কিছু না বলে বেরিয়ে গেলাম তার সাথে। তবে লোকটা যতই মুখরা হোক সব সময় খেয়াল করেছি সব কিছুতে সে চূড়ান্ত ভদ্রতা বজায় রাখে। রিকশায় উঠতেই সে হাত গুটিয়ে এমন শক্ত হয়ে বসল যেন গায়ে টাচ লাগলেই শক লেগে যাবে! কিন্তু রাস্তা খারাপের কারণে ঝাঁকুনি লেগে দুজনার স্পর্শ লেগে যাচ্ছিল। বললাম- ইস রাস্তাটা এত খারাপ না... সে তখন বলল- আসলে সবই আমাকে ছোঁয়ার বাহানা, হুহ। আমি তখন তার দিকে কঠিন একটা লুক দিয়ে মনে মনে ভাবলাম, দেখ এর পরের বার কী করি? এরপর ঝাঁকুনি লাগতেই ইচ্ছে করে ওর গায়ের উপর গিয়ে হুমরি খেয়ে পরলাম আর ও সাথে সাথেই ধরে ফেলে বলল- ওফ, এখন কী কোলে উঠে বসবেন নাকি? বললাম- হ্যাঁ বসব, নেবেন? সে সাথে সাথে বলল- এক ধাক্কা দিয়ে রিকশা থেকে ফেলে দিব। আমি একটা ভেংচি কেটে বললাম- এছাড়া আর পারবেনই বা কী?
একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম দুজন। তারপর কী খাবো সেটা নিয়ে একচোট কথা শুনিয়ে অর্ডার করল। আমার খাওয়া দেখে সে বলল- এত কম খেয়ে শরীরকে কষ্ট দেন কেন? আমি কিছু বললাম না। মনে মনে বললাম এতই যদি বোঝেন তো একটু খাইয়ে দিলেই তো পারেন? শামীম তখন বলে বসল আমি কাউকে খাইয়ে দিব ওসব ভাবার কোন কারণ নেই, নিজ দায়িত্বে ভালো করে খান। আমি তখন লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম... লোকটা কী করে মনের কথা বুঝে ফেলল? সব সময় এমন হয়! আর আমি আরও বেশি এর প্রেমে পরি।
বাসায় এসে রাতে তার দেয়া গিফট খুলতেই দেখি একটা শাড়ি!!! কাল রঙা সুতি শাড়ী সাথে এক মুঠ রেশমি চুড়ি, এক পাতা টিপ আর একটা নেইল পলিশ। চুড়ি? তাও আবার আজই!!! ভীষণ অবাক হলাম। সাথে ছোট্ট একটা চিরকুট, তাতে লিখা-
"যথা সময়ে আপনার জন্মদিনের গিফট দিতে পারিনি... অনেক শুভেচ্ছা রইল... চিঠি লিখার অভ্যেস নেই তাই প্রিয় কবিতা দিয়ে শেষ করছি-
"পুড়িয়ে আমার মন আর দেহ
উড়িয়ে উড়িয়ে দেখছ ছাই,
সত্যি করে বলতো সখী
আসলে তোমার কী যে চাই?"
ভালো থাকবেন, অনেক অনেক ভালো থাকবেন।"
উফ... কী সুন্দর কবিতা আর এইটুকুন মাত্র কথা! আর কিছু কী লিখতে পারত না? ঘাউড়া কোথাকার। কিন্তু এই ছোট চিরকুটটাই কতবার যে পড়লাম তার ঠিক নেই। আর শাড়ি নিয়ে মনে মনে কত কী ভেবে ভেবে যে সময় কাটে আমার...
ওদিকে রাতে ঘুমুতে যাবার আগে শামীম আমার দেয়া গিফট গুলো খোলে। প্রথম গিফটের চিরকুটে লিখা "মাঝে মাঝে একা লাগলে এইটা বের করবেন আর জ্বেলে বসে থাকবেন দেখবেন ভালো লাগবে।" বের করে দেখে কারালারফুল ডেকোরেটেড মরিচা বাতি। খুব সুন্দর জিনিস। তারপর অন্য একটা প্যাকেটের চিরকুট খুলল তাতে লিখা- "আপনার অফিসের ডেস্কটপের পাশে রাখবেন ভালো লাগবে।" খুলে দেখে একটা ফ্লাওয়ার ভাস ফুল সহ, খুব সুন্দর। তারপরের চিরকুটে লিখা- "এইটা আপনার বার্থডে গিফট। যদিও দেবার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু নাছোড়বান্দা আপনি গিফট না নিয়ে ছাড়লেন না। (এদের জন্মদিন ৮দিনের ব্যাবধানে একই মাসে) তবে এটা আপনি আজই খুলবেন না। কবে খুলবেন জানি না, তবে সেদিনই খুলবেন যেদিন আপনার প্রচন্ড মন খারাপের দিন হবে।" সে এইটার র্যাপিং না খুলে রেখে দিল। শামীম জানে এটাতে এমন কিছু আছে যা তার মন ভালো হবার কারণ হবে। আর ছিল একটা জায়নামাজ। এটা পেয়ে সে সবচেয়ে বেশি খুশি হল। সে সব তুলে রেখে চিঠি বের করল। মেয়েটা সব সময় চিঠি নিয়ে আসে। এর এই অভ্যাসটা এত মিষ্টি লাগে! দুষ্টুমি, ভালো লাগা আর মান অভিমানে ভরপুর সব চিঠি। আর কথায় কথায় আমাকে মারার ইচ্ছে! কী দাঙ্গাবাজ মেয়ে। আশ্চর্য মেয়েটা আজকের চিঠিতে রেশমি চুড়ির আবদারের কথা লিখেছে! এই মেয়েটার সাথে কেন আমার এত কাকতালীয় ঘটনা ঘটে??? যতই একে দূরে ঠেলতে চাই এ যেন ততই আমার কাছে চলে আসে। না চাইতেও একটু একটু করে হৃদয়ে ঠিকই জায়াগা করে নিচ্ছে মেয়েটা! এর অদ্ভুত ধৈর্য আর পাগলামো ঠাসা ভালোবাসা দেখে দূরে থাকাও যাচ্ছে না। কী যে করি একে নিয়ে???
কিছুদিন পর কোন এক মন খারাপের সময়ে শামীম শামীমার দেয়া সেই না খোলা গিফটা খোলে। খুলে দেখে সুন্দর একটা জার আর সেটা ভর্তি রোল করে বাঁধা ছোট ছোট এত্তগুলো চিরকুট। প্রতিটা চিরকুট যেন মন ভালো হবার এক একটা গল্প! কী প্রচন্ড ভালোবাসা, ভালো লাগা আর দুষ্টুমি জড়িয়ে আছে প্রতিটা চিরকুটে! শামীম কয়েকটা চিরকুট পড়ে রেখে দেয়। তার মনেহয় সব পড়ে ফেললেই তো শেষ হয়ে যাবে! তারপর থেকে যখনই তার মন খারাপ হয় জারটা খোলে আর কিছু চিরকুট পড়ে... দুশ্চিন্তা গুলো হয়ত চলে যায় না কিন্তু জারটা খুললেই তার মন ভালো হয়ে যায়।
একদিন মেঘলা আকাশ দেখে শামীমকে ফোন করে বললাম- আজ একটু দেখা করা যায়? খুব দরকার... সে যথারীতি ঝাড়ি দিয়ে বলল- থাকেন তো সুখে টোকা দিলেই বাজে। আপনার মতন ফ্রি বসে থাকি না অফিসে অনেক কাজ আছে। বললাম- উফফ সব সময় শুধু ঝাড়ে... প্লিজ, দেখুন না পারবেন কিনা? বলল- ঠিক আছে আসুন কিন্তু বেশি সময় দিতে পারব না বলে রাখলাম। আমি খুশি হয়ে বললাম- ওকে আমি ঘন্টা খানেকের মধ্যে আসছি। তারপর ফোন রেখে রেডি হতে বসলাম। খুব যত্ন করে তার দেয়া শাড়িটা পরে চোখে গাঢ় কাজল দিয়ে সাজলাম। জীবনে প্রথম কারো উদ্দেশ্যে সাজলাম। এ পর্যন্ত অনেকবার চিঠি লিখলেও জীবনে প্রথমবার একটা প্রেমপত্র লিখলাম...
প্রিয়তমেষু,
আদুরে আলোয় জড়িয়ে থাকা ঠান্ডা আবেশিত অলস সকাল বেলায় ধোয়া ওঠা এক কাপ চায়ের উষ্ণ চঞ্চল ভালোবাসা আপনায়। আপনার এলোমেলো চুলের ঘুম জড়ানো মুখের সাক্ষী হোক আমার প্রতিটি সকাল। আর আমার চুড়ির আহ্লাদী রিনিঝিনি সুরে দিনের প্রথম প্রহর শুরু হোক আপনার। বিনিময়ে দু'লাইন কবিতা চাই। খুনসুটি আর ভালোবাসায় মাখা পুরো একটা গল্প চাই। বুকে কাঁপন তোলা স্পর্শ চাই। চাই মুহূর্ত গুলো জমে যাক আপনার হাসিতে। আপনার উষ্ণ ভালোবাসার শিহরণ খেলে যাক আমার হৃদয় জুড়ে। "আজ আপনার কোনো কাজ নেই শুধু আমায় ভালোবাসা ছাড়া। আজ আপনি আমার সারাবেলা" বলে হুটহাট আহ্লাদী আবদারে জড়িয়ে থাকতে চাই।
আপনার হাতে হাত গুঁজে দিয়ে রাতের আকাশ দেখতে চাই। হুট করে যদি কখনো আকাশ থেকে তারা খসে পড়তে দেখি তো চোখ বন্ধ করে আল্লাহ্র কাছে আপনাকেই আমি চাই। গল্পে গল্পে যখন মাঝ রাত হয়ে যাবে তখন আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে একসাথে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে চাই। আপনি কি বুঝতে পারেন, আমার প্রতিটি নির্ঘুম রাত্রির কারণ আপনি? হুটহাট তন্দ্রা যখন আসে আপনিও তখন আসেন। আপনি এলে স্বপ্নরা সব প্রজাপতির রঙিন ডানায় চড়ে উড়ে বেড়াতে শুরু করে! তন্দ্রা ভাঙতেই সে রঙের ছটায় আমি মুখ লুকাই। আপনার কানের কাছে তখন গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলে বলতে ইচ্ছে করে "ভালোবাসি"। দিন শেষে আপনার প্রশান্তির জায়গা হতে চাই। চাই পরম নির্ভরতা আর ভরসা হয়ে পাশে থাকুন আজীবন। একটা একটা খুচরো পয়সার মতন ভেঙে চুড়ে আপনার কাছে নিজেকে জমা রাখতে চাই। পুরো পৃথিবীকে বুঝিয়ে দিতে ইচ্ছে করে ভালোবাসলে কতটা ডুবে যাওয়া যায়... কতটা মিশে যাওয়া যায়। আপনি যে আমার আত্নারই একটা অংশ। হুম, এ আমার সহজ স্বীকারোক্তি "আমি আপনাতে করি বাস"। আপনি আমার "আপনি, তুই আর হ্যাঁ তুমিও"। যতটা তুমিময় হলে কাউকে ছেড়ে যাওয়া যায় না ভুলে যাওয়া যায় না আপনি আমাকে ঠিক ততটাই তুমিময় করে ফেলেছেন!
"যতদূর চোখ যায়, যতদূর যায় না,
সবখানে অদ্ভুত, তুমিময় আয়না।"
আপনার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার ফাগুনবেলা। আপনার হাতে হাত রেখে আমার প্রতিটি দিন আসুক আরাধ্য ফাগুন হয়ে। ফাগুনের অপেক্ষায়...
ইতি
আপনার কেউ না হওয়া আমি।
চিঠিটা একটা কবিতার বইয়ে রেখে সেটা নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। রিকশায় উঠতেই বৃষ্টি নেমে গেল... গেলাম ভিজে! কী করব বুঝতে পারছিলাম না... এখন তাকে আসতে বললে নির্ঘাত কিছু রাম ঝাড়ি দিয়ে দিবে। আর এভাবে ভিজে দাঁড়িয়েও থাকতে পারছি না লোকজন সব তাকিয়ে আছে। তাই ৫টা টকটকে লাল গোলাপ নিয়ে তার অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম।
তার অফিসে ঢুকতেই সে আমাকে দেখে এক প্রকার আতকে উঠে বলল- একি! আপনি এমন গোসল করতে করতে চলে এসেছেন কেন? এটা তো অফিস আপনার বেডরুম নয় এই বুঝটাও আপনার নেই নাকি? বললাম শুনুন, রাস্তায় কেউ গোসল করে না, হুট করে বৃষ্টি নেমে গেলে আমি কী করব? বলল- তো বাসায় চলে যেতে পারলেন না? আমি তখন রাগে দুঃখে সজোরে একটা হাঁচি দিয়ে বললাম- ঠিক আছে এটা ধরুন আমি চলে যাচ্ছি। সে হয়ত বুঝল, হাত বাড়িয়ে বইটা নিয়ে বসতে বলে ডেস্ক থেকে একটা টাওয়েল বের করে দিয়ে বলল ভালো করে মুছে নিন আমি আপনার জন্য কফি নিয়ে আসছি। নয়ত ঠান্ডা বাঁধিয়ে পরে তো আমাকেই দোষ দেবেন, হুহ। দু'মিনিট পর এক মগ কফি এনে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল কী যে মুশকিলে ফেলেন না আপনি। আমি তখন চুপচাপ কফিতে চুমুক দিচ্ছিলাম। সে তখন বইটা বের করল আর হাতে নিতেই চিঠির খামটা পেয়ে গেল। বলল আপনি মনেহয় ৬০ এর দশকের মতন পুরনো নয়ত এ যুগে কেউ চিঠি লিখে? আমি চোখ বড় বড় করে বললাম এটা কী হলো? আপনি এখন এটা খুলছেন কেন? রাখুন। সে বলল আশ্চর্য তো, আমার জিনিস আমার যখন ইচ্ছে হয় খুলব তাতে আপনার কী? আমি এখনই খুলব এটা। একদম ভালো হচ্ছে না কিন্তু বলেই ছোঁ মেরে খামটা নিয়ে নিলাম। সে বলল- এটা কী হলো? দিন বলছি? বললাম- না, দেব না। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল- দিন? বললাম "না"। সে তখন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল- দেবেন নাকি জোর করে নেব? আমি তখন উঠে দাঁড়িয়ে হাত পেছনে নিয়ে বললাম আপনি এখন কেন খুলতে চান তাহলে? দিব না। সে এক পা সামনে এগিয়ে এলো। আমি তখন দু'পা পিছিয়ে গেলাম। সেও তখন দু'পা এগিয়ে এলো... আমি আরও একটু পেছনে যেতেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল! সে তখন আমার দু'পাশে দেয়ালে হাত রেখে আটকে দিয়ে বলল- এখন? আমার হার্টবিট এত মাত্রায় বেড়ে গেল যেন হার্ট লাফিয়ে বের হয়ে আসবে। চোখ বন্ধ করে ফেললাম... সে তখন তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি তুলে কানের কাছে এসে বলল "মন চায় হৃদয় জড়াতে কারো চিরো ঋণে"। এই সাধারণ শাড়িটাতেও আজ আপনাকে অসাধারণ লাগছে। বৃষ্টি কন্যা আমার তো ইচ্ছে হচ্ছে কিছু ভুল করে ফেলি... আমার তখন দম বন্ধ হবার জোগাড়! এরও পুরো এক মিনিট পর সে মুচকি হেসে খামটা আস্তে করে হাত থেকে নিয়ে সরে গিয়ে বলল- আপনার মুখটা সত্যিই দেখার মত হয়েছিল। কেমন ভয় পাইয়ে দিলাম বলুন? ওদিকে আমি লজ্জায় লাল হয়ে তাকাতে পর্যন্ত পারছি না... ইসসস লোকটা একদমই যা তা! সে আমার অবস্থা বুঝতে পেরে বলল- সরি, আমি হয়ত একটু বেশি করে ফেলেছি... আমি মুখ নিচু রেখেই বললাম- বাড়ি যাব আমি। সে বলল- কি কারণে এলেন তা তো কিছু বললেন না? ঠিক আছে সে নাহয় অন্য সময় জেনে নেব, আজ থাকুক। চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
বাহিরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছিল। যেমন বৃষ্টি দেখলে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হয় তেমন বৃষ্টি হচ্ছিল। যে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে প্রিয় মানুষটার সাথে পাশাপাশি বহুদূর হেঁটে যেতে ইচ্ছে হয়...। শামীম একটা রিকশা ডেকে নিজেই উঠে পড়ল! আমি অবাক হয়ে বললাম- আপনি কোথায় যাচ্ছেন? সে বলল- আবহাওয়া খুব রোমান্টিক তাই আপনাকে একা ছাড়ছি না, উঠুন। আমি রিকশায় উঠলাম আর মনে মনে ভাবলাম- এই ব্যাটাকে তাহলে শেষ পর্যন্ত সত্যিই রোমান্টিকতা ধরল! নট ব্যাড... লাভ ইউ বৃষ্টি। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, এ তো বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না, ভিজলেই অসুখ বাঁধিয়ে ফেলে। তখন বললাম- আপনি শুধু শুধু কেন এলেন? ভিজে অসুখ করলে তো এই আমাকেই বকে আস্ত রাখবেন না। সে বলল- আমি যদি আপনার জন্য ভিজে অসুখ বাঁধাতে পারি আপনি আমার জন্য ২/৪ টা বকা খেতে পারবেন না? বললাম- আর আপনাকে নিয়ে যে তখন দুশ্চিন্তা আর খারাপ লাগা কাজ করবে তার কি হবে? সে বলল- আমার জন্য আপনার এত লাগে কেন? বললাম- হুহ, লাগতে আমার বয়েই গেছে। অসুখ করলে এসে মেরে আরও পা দুটো ভেঙে দিয়ে যাব। শামীম তখন হাসতে হাসতে বলল- দাঙ্গাবাজ মেয়ে। তারপর আস্তে করে আমার হাত ধরল... আমার হার্টবিট কয়েকটা মিস হয়ে হাতুরি পেটানোর মত বেড়ে গেল! শামীম সেটা খেয়াল করে বলল- ড্রামা কুইন, এত অল্পতেই যদি এমন বেহাল দশা হয় তাহলে প্রেম করবেন কীভাবে? ছেড়ে দিব? আমি তখন লাল, নীল, বেগুনী হয়ে গিয়ে তার হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরলাম। আর মনে মনে বললাম- "এই শহরে রোজ বৃষ্টি নামুক, প্রেমিক হৃদয়গুলো এভাবেই রোজ হাসুক।"
#একদিন_বৃষ্টির_দিন
লেখাঃ শামীমা জামান
**
গল্পের শামীম আর শামীমা চরিত্র দুটো সত্য। তাদের বাস্তব গল্পটা আরও অনেক অনেক বেশি নাটুকে। যতটা নাটুকে হলে বিশ্বাস হতে ইচ্ছে হয় না ততটা নাটুকে। তবে তাদের বাস্তব গল্পটায় এমন হ্যাপি এন্ডিং নেই... লেখকদের এই এক সুবিধে তারা তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্পে রঙ ছড়াতে পারে। কিন্তু বাস্তব গল্পের লেখকের ইচ্ছে তো ছিল অন্য রকম...😥
Comments
Post a Comment