ভালবাসা দিবস।
আত্মহত্যা করে মারা গেলো অরু। আমার কানে খবরটা আসতেই, যেনো আকাশটা ভেঙে পরলো আমার উপর। আমি ছুটে গেলাম অরুদের বাড়িতে। সবাই অরুর মরা মুখ দেখছে। আমি পৌঁছাতে সময় লেগে গেলো ১ঘন্টার মতো। আমাকে দেখে অরুর মা আরো বেশি কান্না করতে থাকলো। আমি কি বলে তাকে সান্ত্বনা দিবো জানি না । আমার চোঁখ বেয়ে পানি ঝরছে।
পুলিশ অফিসার বলল,"আপনি রানা সাহেব? "
" জি, বলেন"
"অরু মারা যাওয়ার সময় এটা লিখে রাখছে দেখেন।"
আমি কাগজটা হাতে নিলাম তাতে লেখা"আমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দ্বায়ী না। আর রানা তুমি আমাকে মাফ করে দিও। তোমার সব স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার জন্য। নতুন করে জীবন শুরু করো "
ইতি
ইসরাত জাহান অরু
আমার চোঁখ দিয়ে পানি আরো বেশি করে পরতে শুরু করলো। কাগজটা পড়ে।
পুলিশ বললো, "রানা সাহেব, আপনি আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে। লাশটা এখন আমরা হাসপাতালে পাঠাবো আর ময়নাতদন্ত করবো। লাশের রিপোর্ট করা হলে লাশ নিয়ে আসবেন আপনি। "
-আচ্ছা চলেন।
পুলিশ সাথে অরুর লাশ নিয়ে চলে গেলাম হাসপাতালে। লাশটা দিয়েই আমরা চলে গেলাম থানায়। কিছুক্ষন পরই রিপোর্ট আসলে, লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে আমাকেই।
"রানা সাহেব। আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন? অরুর মৃত্যুর জন্য?কারো সাথে সম্পর্ক আছে?"
"না। আমি জানি না, কেনো এমন হলো। আরে না। ও আমার সাথেই"
" আমরা অরুর কল লিষ্ট বের করার জন্য, কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করছি। বিকালেই লিষ্টটা পাবো। আপনি কোন মামলা করতে চান? "
"না, যেহেতু অরু নিজেই মানা করছে এইসব করতে। তবে হ্যাঁ আমাকে কল লিষ্ট আর রিপোর্ট জরুরী দিবেন। "
"আচ্ছা। আপনি যান ঘন্টা খানিক পরই কাজ শেষ হয়ে যাবে বললো ডাঃ আরিয়ান। আমি বলে দিছি রিপোর্ট করতে যা দরকার। তা করে যেনো লাশটা আপনাকে দিয়ে দেয়। "
_আচ্ছা তাহলে গেলাম আমি।
_বিকালে চলে আসবেন।সব রিপোর্ট পেয়ে যাবেন।
আমি থানা থেকে বের হয়ে চলে আসলাম হাসপাতালে। প্রায় ২ঘন্টা অপেক্ষা করার পরই অরুর লাশ নিতে বলছে। একটা এম্বুলেন্সে করে অরুর লাশটা নিয়ে বাাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম।
অরুর বড় ভাই ও বাবা চলে আসছে। সবাই চললাম অরুর লাশ নিয়ে। এম্বুলেন্সে বসে বসে ভাবছি আমাদের কথা।
এইতো ৪মাস আগের কথা।
আমি রানা।সরকারি কলেজে রসায়নের শিক্ষক। কিছুদিন হলো বিসিএস দিয়ে চাকুরী নিলাম। আমার কলেজেরই অনার্স ৪র্থ বর্ষে পড়তো অরু। কলেজে আসার পরই অরুর সাথে পরিচয়। পরিবার থেকেই আমাদের বিয়ে ঠিক হয়। আমাদের কাবিনও হয়ে গেছে। কিছুদিন পরই অনার্স ফাইনাল। তারপরই তুলে নিবে, আমাদের বাড়ি অরুকে।
সব সময়ই অরুর সাথে সময় দিতাম। যদিও শিক্ষকতার কাজে সপ্তাহে তিনদিন একটায়। তিন দিন অনেক দূরে একটা বেসরকারি কলেজে পড়াই। তাই মোবাইলে যোগাযোগ বেশি হয়। দেখা করতে পারি না। সময়ও দিতে পারি না সামনাসামনি । গতকালও ছিলাম শহরের দূরে গ্রামের বেসরকারি কলেজে। সকালেই কল আসলো অরু মারা গেছে, তাই ছুটে আসা।
অরুর লাশটা এনে আমরা মাটি দিয়ে দিলাম। সবাই আমাকে নানান ভাবে বুঝাচ্ছে। সবাই কি করে জানবে আমার ভিতরটা কেমন করে। সারাদিন কেটে গেলো। বিকাল হতেই থানা থেকে কল আসলো।
"রানা সাহেব আপনি আসেন থানায়। কাজ আছে। "
-ওকে আসতেছি।
কিছুক্ষন পরই গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গেলাম থানায়। অরুর রিপোর্টের ফাইল গুলো নিয়ে বসে আছে ইন্সপেক্টর আবির।
= রানা সাহেব, কি করে বলি বুঝতেছি না।
আপনার মতো একজন সম্মানিত ব্যাক্তির সাথে।
-কি হলো শুনি এখন।
=অরু ৭ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। আর এই নিন কল লিষ্ট আপনার পরই একটা নাম্বারে বেশি কথা বলতো অরু। বাকিটা আপনি বাসায় গিয়ে দেখে নিয়েন।
-আচ্ছা চলি।
-কোন সমস্যা হলে আমাকে কল দিয়েন। আমি সবসময়ই আপনার জন্য রেডি।
আমি রিপোর্ট গুলো নিয়ে কি করবো বুঝতেছি না। অরু মা হতে যাচ্ছে, এটা কি করে হয়। আমি তো আজ পর্যন্ত ছুঁয়েও দেখি নি। অনেক স্বপ্ন সুন্দর করে সংসার করবো দুজন। এটা কি হলো। আমার সাথে।
বাসায় ফিরে ওই নাম্বারে কয়েকটা কল দিলাম তারপরই কলটা ধরলো।
-হ্যালো কে বলছে?
-আমি রানা। আপনি কে বলছেন?
-আমি রাজু। আমার নাম্বার কোথায় ফেলেন? কেনো কল দিছেন?
-আমি অরুর স্বামী। কালকে তুমি আমার সাথে দেখা করো কথা আছে।
-আমি দেখা করতে পারবো না। আর কোন অরুকে চিনি না। আর কল দিবেন না
-আচ্ছা।
মনে হচ্ছে অনেক কারন আছে। আবার রাগ দেখাচ্ছে। পুলিশকে দিয়ে আনতে হবে তাকে।
"আবির সাহেব। ওই নাম্বারটা মনে হয় অরুর মৃত্যুর সাথে জড়ানো। তাকে যত তাড়াতাড়ি পারেন ধরেন। "
পুলিশ বললো,
"আচ্ছা রানা সাহেব। আমরা এখনি নাম্বার লোকেশান বের করে ধরতেছি। "
সারারাত কেটে গেলো, অরুর কথা ভাবতে ভাবতে। সকালে থানা থেকে কল দিয়ে বললো, তাকে আনা হইছে আপনি আসেন। আমিও থানায় চলে গেলাম। তাকে দেখে আমি থমকে গেলাম।
এই রবিন অরুর সাথেই পড়ে। কখনো তাকে দেখি নি অরুর সাথে মিশতে বা কোথায় বসে আড্ডা দিতে,
-রবিন বলো। কি ছিলো তোমার আর অরুর ভিতর?
=স্যার, আমি জানি না।
-অরুর মারা যাওয়ার কথা জানো?
=হ্যাঁ
-আর কি জানো?
=কিছু না।
-আবির সাহেব মনে হয় কথা বের করতে হবে আপনাকে।
পুলিশ অফিসার আবির সাহেব, ইচ্ছে মতো কিছুক্ষণ আঘাত করার পর বলতে শুরু করে।
রবিন বলতে শুরু করে,
"আমি আর অরু গত একবছর আমরা একে অপরকে ভালোবাসতাম । কিছুদিন আগে আপনার আর অরুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, এটা মানতে পারিনি। কি করবো বেকার। তাই তাঁর পরিবারকেও বলতে পারি নি।অরুও আমার সাথে ব্রেকআপ করতে চাইছিলো। আপনাদের বিয়ে ঠিকঠাক হওয়ার পরও আমাদের প্রেম চলতে ছিলো। আপনি সপ্তাহে তিনদিনই থাকেন না শহরে। প্রায় তখন অরুকে নিয়ে ঘুরতে বের হই। কেউ জানে না আমাদের ভালোবাসার কথা। আমি আর অরু ছাড়া। কিছুদিন আগে ভালবাসা দিবস ছিলো। আপনি তখন শহরের বাহিরে। আমি আর অরু ভালবাসা দিবসের দিন হোটেল যাই আর আমাদের ভিতর শারীরিক সম্পর্কও হয়।আমি তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম, অরুকে ছেড়ে দিবো। যা পাবার তা ভালবাসা দিবসেই দিয়ে দিছে আর কি চাই।
দুদিন আগে অরু আমাকে রাতে কল দিয়ে বলে, সে মা হতে যাচ্ছে। আমি তাকে নয় ছয় বুঝিয়ে বলি, রানা সাহেবের সাথে শারীরিক কিছু করে। সে যেনো ওনার বলে চালিয়ে দেয়। আর না হয় এবরশান করুক।
ও কোনটাই করতে রাজি না। ও চাইছে আমি তাকে পালিয়ে বিয়ে করি। আমি না করে দেই। তারপর সকালে শুনি অরু মারা গেছে।
-আবির সাহেব আপনি যা করার করে নিয়েন। (আমি)
-আচ্ছা স্যার। (পুলিশ)
আমি থানা থেকে ফিরছি আর ভাবছি, একটা ভালবাসা দিবস! আমার জীবনটাই উল্টো পাল্টা করে দিলো। ভালোবাসা দিবস মানেই কি অশ্লীলতা। ভালোবাসা মানেই অপ্রাপ্তি চাহিদা পুরুন। যেটা সাথে সাথে ভালোবাসাও শেষ৷ ছাত্র জীবনে কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি নাই। চাকুরী জীবনে অরুকে ভালো লাগলো। পরিবার দিয়ে বিয়ে আয়োজন করলাম৷ জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ। স্বপ্নই দেখে গেলাম৷ আর কিছু হলো না। অরুকে এই কয়েক মাসে অনেক ভালোবেসে ফেলছি।
আমি আবার নতুন করে কাউকে নিয়ে স্বপ্ন করতে হবে। নিজেকে শক্ত করতে হবে।
খালি মাঠে বসে বসে ভাবছি। বাসা থেকে মায়ের কল আসলো। যাই মায়ের কাছে একটু শান্তি হলেও পাবো। এই কষ্টের ভিতর।
----সমাপ্ত----
গল্প - ভালবাসা দিবস।
লেখা-সোলাইমান রানা (দাদা)
Comments
Post a Comment