ভালোবাসা
শ্রাবণীকে যখন বিয়ে করে ঘরে তুললাম, তাকে বলা হয়নি কতটা ভালোবাসি। তাকে ভালবাসার কথা গুলো, কখনো বলতে সাহস হয় নি। শ্রাবণী যে কতটা ভালোবাসছি জানি না। বিয়ের কয়েক মাস আগে।
বন্ধু অর্জুনের বিয়েতে গেলাম তখন সপরিবার। গ্রামের বাড়িতে বিয়ে তাঁর। তাই আমার পরিবার যেতে হলো গ্রামে। আদর্শ গ্রামে আগে কখনো যাওয়া হয়নি। বন্ধু সবসময় বলতো তাঁর গ্রামে যেতে। গ্রাম নাকি সৃষ্টির অপরুপ নিয়ে, হাতছানি দেয় তাকে দেখতে। পুরো জেলা খাগড়াছড়ি নাকি একই রকম সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। ঢাকা থেকে আকাশ পথে যাওয়ার সুযোগ নেই। ট্রেনও চলে না ওই জেলায়।
ঢাকা থেকে তাই নিজেদের গাড়ি নিয়ে গেলাম তখন খাগড়াছড়ি। পাহাড়ের আকাঁবাকা রাস্তা দিয়ে যেতে অনেক আনন্দ করলাম। অর্জুন যা বলতো তাঁর চেয়ে হাজার গুন সুন্দর। আগে জানলে তাঁর সাথে প্রতিবারই আসতাম।
সবাই বিয়েতে গিয়ে হাজির। অর্জুন আমাদের জন্য আলাদা দুটা রুম দিলো থাকার জন্য। গ্রামে বাড়ি হলেও অর্জুনের বাবা বিশাল একটা বাড়ি বানিয়েছে। গ্রামে তাঁর বাবার অনেক ব্যবসা ছিলো। মাছ চাষ,ফল চাষ, কৃষি কাজ সব মিলিয়ে গ্রামের একজন সফল ব্যাক্তি। তিনি পড়াশোনা করে , চাকুরী না করে গ্রামেই কিছু করতে চেয়েছেন।
আমরা ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিলাম। সন্ধ্যাঁয় ছিলো গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। বিকালে ক্লান্ত থাকায় বের হওয়া হয়নি রুম থেকে। সন্ধ্যায় সবার আনন্দের উচ্চ স্বরে ঘুম ভাঙলো আমার। রুম থেকে বের হয়ে সবাইকে দেখি, হলুদ দেওয়ার আনন্দ করতেছে। সবাই সবাইকে হলুদ লাগাতে ব্যাস্ত। আমি অর্জুনের পাশে গিয়ে বসে দেখছি সবাই কি করে।
সবার আনন্দের মাঝে চোঁখ গিয়ে পরলো একটা রমনীর উপর। মুখে হাসি, চোঁখে মায়াবী অপলক দৃষ্টি দিয়েই উপভোগ করছে আনন্দ। আমি পুরো সময়টা তাঁর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। এই জীবনে প্রথম কোন মেয়েকে এত ভালো লাগা। হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হলে, রাতে অর্জুন আর আমি একসাথেই ঘুমাতে গেলাম।
আমি অর্জুনকে বললাম, সেই মেয়েটার কথা। কথায়, পরিচয় বলায় সে বলতে পারলো না।
আমি তাকে বললাম সকালে দেখিয়ে দেবো।
সকালে সবাই সবার মতো ব্যাস্ত। মেয়েটাকে দেখে অনেকবার তাঁর পিছুপিছু গেলাম। তাঁর সাথে সাহস করে কথা বলতে পারলাম না। অর্জুনও ব্যাস্ত তাই তাকেও পেলাম না।
সবাই সাজগোজ করে সবাই চললাম মেয়েদের বাড়ি। গাড়িতে সবাই বসলাম। আমি জানালার পাশে বসে, মেয়েটাকে খুঁজার চেষ্টা করলাম। বাহিরে তাকিয়ে ভাবছি, অন্য গাড়িতে উঠলো না তো?
গ্রাম তাই বাস গাড়ি করেই চললো সবাই। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি। তখনই একটা হাতের ছোঁয়া অনুভূব করলাম। আমি ফিরে দেখি সেই মেয়েটা। আমাকে বলছে আরেকটু ভাল করে বসতে। ও বসবে পাশের সিটে । আমার ভিতর কি হয়ে গেলো তখন বুঝলাম না। যাকে খুঁজলাম সে পাশের সিটে বসা।
অর্জুন আমার সামনের সিটে বসা। আমি সিটের ফাঁক দিয়ে অর্জুনকে হাত ধাক্কা দিলাম। অর্জুন আমার দিকে তাকালে, আমি চোঁখ দিয়ে ইশারা করে মেয়েটাকে দেখালাম। অর্জুন একটা হাসি দিলো। আমি কিছু বুঝলাম না তখন।
অর্জুন বলে মেয়েটাকে,"শ্রাবণী ও আমার বন্ধু রানা। গতকাল পরিচয় করিয়ে দিতে মনে ছিলো না"
অর্জুন আমাকে বলে," রানা ও আমার বোন শ্রাবণী। "
অর্জুন আর কিছু না বলে, তাঁর সিটে বসে রইলো।
আমি শ্রাবণীকে কি বলবো বুঝতেছি না তখন । শ্রাবণীও চুপ করে রইলো। কনের বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত, আমি তাকিয়ে ছিলাম শুধু শ্রাবণীর দিকে।
শ্রাবণী নামটা অনেক শুনছি অর্জুনের থেকে। তাঁর বোনের নাম এটাও জানতাম। কখনো তাঁর ছবি দেখাই নি। অর্জুনের বাবা-মা কে দেখছি, শহরে যেতো মাঝে মাঝে অর্জুনের কাছে।
কনের বাড়িতে এসে সবাই বসে বিয়ের কাজ হচ্ছে তা দেখছি। পন্ডিত বিয়ের মন্ত্র পড়ছেন আর অগ্নির পাশে অর্জুন ও কনে ঘুরে, সিঁতিতে সিঁদুর দিয়ে বিয়ের কাজ শেষ করে ফেললেন। সবাই খাবার খেয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম, অর্জুনদের বাড়িতে। সবাই সবার মতো চলছে। সারাদিন কেটে গেলো। পরেরদিন সকালেই কিছু মেহমান চলে গেলো।
আমাদের নাস্তা দিলো শ্রাবণী এসে। আমি মা-বাবা আর ছোট বোন নাস্তা করলাম। নাস্তা করে অর্জুনকে নিয়ে বের হলাম গ্রাম দেখতে। অর্জুন বলে, রানা শ্রাবণীই কি সেই মেয়ে?
আমি বলি তখন, হুম। অর্জুন আমার কথা শুনে খুশী মনে হলো, তাঁর চেহারা দেখে।
আমি বললাম ,"আগে বললি না, যে তোর বোন এত বড়?
অর্জুন বলে," তুই কখনো তেমন জানতে চাইলি না। তাই বলি নাই। জানতে চাইলে সব বলবো। "
আমি বললাম, "কি করে শ্রাবণী?
অর্জুন,"অনার্স শেষ করছে এ বছর। এখন গ্রামের পাঠশালায় পড়ায়। মা-বাবার কথা শুনে না। বলে এটা নাকি ভালো লাগে। কালকে তাঁর পাঠশালায় নিয়ে যাবো তোকে, দেখাবো কি করে ওখানে"
সেইদিন ঘুরে বাসায় চলে আসি। সারাদিন দেখে দেখে শ্রাবণী'কে, কেটে গেলো। পরেরদিন গেলাম শ্রাবণীর পাঠশালায়। বাচ্চাদের সাথে মন খুলে হাসি আাদর করে পড়াচ্ছে। তখন কেমন লেগে ছিলো কি বলবো আর!
শ্রাবণী দুপুরে চলে আসে বাড়িতে। বিকালে আমাকে ডেকে নিলো বাবা-মা রুমে। আমি গেলে তাদের কাছে আমার কাছে জানতে চায়, শ্রাবণীকে বিয়ে করতে আমার কোন সমস্যা আছে কিনা। আমি বললাম, তারা যা করে সব কিছুতেই রাজি আমি।বাবা অর্জুনের বাবার সাথে আমার আর শ্রাবণীর বিয়ের কথা পাকা করে ফেলে।
২মাস সময় চেয়ে নেয় অর্জুনের৷ বাবা। দিনও ঠিক করা হয়ে যায়। আসার আগে অর্জুনকে বলে, একটা ছবি নিয়ে আসি শ্রাবণীর। আমরা শহরে চলে আসি। ২মাস শ্রাবণীর ছবি দেখেই দিন কাটাতাম আর ভালোবাসতাম। মোবাইল ফোনের কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলো না গ্রামে। বিয়ের দিনের আগের দিনই শহর থেকে সব আত্মীয় নিয়ে চলে যাই গ্রামে। শ্রাবণীকে বিয়ে করে নিয়ে আসি ঢাকায়।
আমার আর শ্রাবণীর জীবন ভালোই চলছে। অর্জুর আর আমাদের পরিবার সবাই ভালোই আছে সম্পর্ক। শ্রাবণীও আমায় অনেক ভালবাসতো। সে নাকি আমার কথা অর্জুন থেকে জানতো। আমার পরিবারও শ্রাবণীর মতো মেয়ে পেয়ে অনেক খুশী। সবাই শ্রাবণীকে অনেক ভালোবাসে।
শ্রাবণী বিয়ের পর কেমন জানি একটা দায়িত্ব নিয়ে চিন্তায় থাকতো। সব সময় আমায় বলতো তাঁর দায়িত্বে কোন ভূল হয়ে যায় যদি। আমি তাকে এটায় বলতাম, যে পরিবার সবাই তাকে ভালোবাসে। কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। পরিবারে আমার ছোটো দু'বোন মা-বাবা। আর কেউ নাই।
একদিন অফিস থেকে বসায় ফিরে দেখি, শ্রাবণী অনেক খুশী। সবাই খুশী আজকে মনে হলো, কেউ কিছু বললো না। আমি আমার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে টিভি দেখছি তখন শ্রাবণী বলে আমাদের নতুন মেহমান আসবে।
কথাটা শুনে আমি অনেক খুশী। শ্রাবনীও খুশী তারপরও কেনো জানি তাঁর মুখে চিন্তার ছাপ দেখলাম।
"কোন কিছু নিয়ে চিন্তায় আছো? "
শ্রাবণী বলে,"বাচ্চা জন্ম নেওয়ার সময় যদি মারা যাই। তাহলে কি হবে বাচ্চাটার? আর তোমাকে কে দেখবে?"
"এত কিছু নিয়ে চিন্তা করতে নাই। সৃষ্টিকর্তা যা করে ভালোর জন্যই। "
যে বাচ্চাটা এখনো জন্ম নেয় নাই। যার অস্তিত্ব কতটুকু জানে না। তাকেই নিয়ে এত চিন্তা করছে । নারীরা যে কত কিছু নিয়ে চিন্তা করে, যদি শ্রাবণীকে না দেখতাম তাহলে বুঝতাম না। হয়তো আমার মাও আমার জন্য এমন করে চিন্তা করছে। সকল নারীই এমনই ভাবে সংসার নিয়ে।
গর্ভের পুরো সময়, শ্রাবণী চিন্তায় থাকতো। আর মাঝে মাঝে বলতো, ওর কিছু হলে বাচ্চার কি হবে। আমি সবসময়ই ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতাম।
একদিন হাসপাতালে বাচ্চা হওয়ার সময়, তাকে নিয়ে গেলাম। পরিবারের সবাই আছে। ডাক্তার শ্রাবণীকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলো। আমরা সবাই অপেক্ষা করছি বাহিরে। প্রায় ২ঘন্টা পর ডাক্তার বাচ্চা এনে আমার কোলে দিয়ে বলে, আপনার মেয়ে হয়েছে।
আমি বাচ্চাটা কোলে নিয়ে বললাম, "ডাক্তার শ্রাবণী কেমন আছে?"
ডাক্তার বলে,"সরি,তাকে বাচাঁতে পারলাম না। "
সবাই কান্না করছে। আমি মেয়েকে কোলে করে কেবিনের ভিতর গিয়ে দেখলাম, শ্রাবণীর নিথর দেহ পরে আছে।
মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে অনেক কান্না করলাম তখন। শ্রাবণীর দেহ এনে সৎকার করে দিলাম। অগ্নি আমার হৃদয়ে জ্বলছে তখন।
পরিবার আবার বিয়ে করাতে চাইলো। তা আর করলাম না। মেয়েটাকে নিয়ে থাকলাম। শ্রাবণীর ভালবাসার কথা গুলো আজও মনে পরে। শ্রাবণী এখন থাকলে মেয়েটাকে নিয়ে কত ভাবতো, কতোটা ভালবাসতো।
---সমাপ্ত---
গল্প-- ভালোবাসা।
লেখা-সোলাইমান রানা (দাদা)
Comments
Post a Comment