নীরদবরণ

আমার স্ত্রী মারা গেল একটা শাপলা ফুলের জন্য। চার বৎসর আগে। আমরা গিয়েছিলাম আমার গ্রামের বাড়ি। যেহেতু গ্রামে আসা হয় না, বিয়ের আগে গুনে গুনে তিন-চারবার আসা হয়েছে সম্ভবত। সেখানে বিয়ের পর স্ত্রী আর কন্যা সহ গ্রামে প্রথম বেড়াতে যাওয়া বিশাল একটা ব্যাপার। আব্বা তাই আমার শত চোখ রাঙানি পাত্তা না দিয়ে বিশাল আয়োজন করে ফেললেন। দুপুরে ছয়-সাত পদের তরকারী। দই। জিলেপি। নানান রকম মিষ্টান্ন। ভোজনপর্ব শেষে বিকাল বেলায় আমি প্রস্তাব দিলাম স্ত্রীকে, ‘চলো, নৌকো করে ঘুরবো।’
আমাদের গ্রামে একটা দীঘি বেশ বিখ্যাত। অশ্রদীঘি। কথিত আছে যখন এই গ্রাম ধূ ধূ প্রান্তর ছিল, কোথাও কোনো সবুজ ছিল না, জল ছিল না। এক রাজকুমার এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন ঘোড়ায় চড়ে। প্রচণ্ড পানির তৃষ্ণা পেয়েছিল তার। জলের কলস ছিল খালি। কোথাও কোনো জল নেই। রাজকুমারের ঘোড়া আর সামনে এগুলো না। ক্লান্ত ক্ষুধার্ত রাজকুমার বসে রইলেন এই জায়গায়। একটা পরী বিহঙ্গমের ডানায় চড়ে এই পথ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় রাজকুমারকে দেখে প্রেমে পড়লেন তার। মানবীর রুপ ধরে কাছে আসলেন। রাজকুমার সায় দিলেন। তারপর পরীর নিষ্পাপ অনুভূতির সঙ্গে প্রতারণা করে গভীর রাত্তিরে পরীর বাহন বিহঙ্গমকে হত্যা করলেন। বিহঙ্গম জলের পাখি। পেটে জল ধরে রাখতে পারে তারা। রাজকুমার ঐ জল খেয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করে ঘোড়া সহ পালিয়ে গেলেন। পরী ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে রাজকুমারকে পেলেন না আর। উপরন্তু দেখলেন প্রিয় বিহঙ্গম তার মরে পড়ে আছে পাশে। পরী তারপর আর কোথাও গেলেন না। এই জায়গায় বসে অপেক্ষা করলেন বাকিটা জীবন। একদিন রাজকুমার ভুল বুঝতে পারবেন, এই জায়গায় ফেরত আসবেন, ক্ষমা চাইবেন পরীর নিকট। পরী অপেক্ষায় রইলেন তার। রাজকুমার ফেরত এলেন না। পরী নিজেকে খুন করলেন শেষে। মৃত্যুর আগে পরীর চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল প্রান্তরের ধুলোয়। ঐ অশ্রুফোঁটা থেকে তৈরী হয়েছিল এই দীঘি। তাই এর নাম অশ্রুদীঘি।
আমার স্ত্রীর মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে আমি রুপকথা বলে ফেললাম কেন তার কারণ আছে। আমি আমার স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনাটা কাউকে সহজে বলতে পারি না। রুপকথা বলে আগে নিজেকে সহজ করে নিতে হয়। কারণ, ওর মৃত্যুটা স্বাভাবিক কোনো মৃত্যু ছিল না। অশ্রদীঘিতে একটা নৌকো ছিল। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে ঐ নৌকোয় উঠেছিলাম সেদিন। দীঘির প্রতিটা কোনা শাপলা ফুলে ভর্তি। আমি নিজেই বৈঠা চালিয়ে গেলাম। আমার স্ত্রীর পছন্দ হলো একটা শাপলা ফুল। সে ওটা নেবে। আমি শাপলা ফুলটার কাছাকাছি গেলাম। আমার স্ত্রী হাত বাড়িয়ে ওটা নিতে গিয়ে টুপ করে পড়ে গেল পানিতে উপুড় হয়ে। সাঁতার সে জানতো। অথচ মরে গেল। যখন ওর লাশ তোলা হলো, দেখা গেল একটা সূচালো বাঁশের টুকরো মাথার ঠিক উপর দিয়ে আড়াই অথবা তিন ইঞ্চি অবধি ঢুকে আছে। আমার স্ত্রীর চোখ খোলা। তখনও হুঁশ আছে অল্প। নাক আর কান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ল গলগল করে। আমি দুই হাতে টেনে বাঁশের টুকরোটা বের করলাম। দেখলাম, মাথার তালু বরাবর গভীর লাল টকটকে একটা গর্ত। বাঁশের টুকরো টানার সাথে সাথে মাথার ভেতরের সাদা থকথকে কিছু মগজ আমার হাতে উঠে এলো। বাকিগুলো ভেজা চুলের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। আমার স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণস্বরে বলল, ‘স্রোতস্বিনীকে দেখো।’
আমার কন্যার নাম স্রোতস্বিনী। আমার স্ত্রী রেখেছিল এই নাম। উচ্চারণ করতে গিয়ে আমার জিহ্বা আর দাঁতের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয় প্রায়শই। যখন আমার স্ত্রী মারা গেল, স্রোতস্বিনীর বয়স চার বছর। আমি মৃত স্ত্রীকে দাফন করে এসে প্রথম জানালাম স্রোতস্বিনীকে, ‘তোমার আম্মু মারা গিয়েছেন। মরে যাওয়া মানে, তুমি আর কখনই তোমার আম্মুকে দেখতে পাবে না। তোমার আম্মুর আদর পাবে না। শুধু কল্পনা করতে পারবে। তুমি কি বুঝতে পারছো?’
আমার ছোট্ট স্রোতস্বিনী, কতটুকুনই বা বয়স তার, মাত্র চার। কী বুঝে সে? অথচ আমার শুষ্ক চোখের দিকে তাকিয়ে আদুরে মুখ আর নাকটা লাল করে মাথা উপর নিচ করল কন্যা আমার। নিচের ঠোঁট ধনুকের মতোন বাঁকিয়ে উপরের ঠোঁটের ভেতর গুঁজে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। চোখ দিয়ে গলগল করে বের হলো জল। আমার স্ত্রীর নাক আর কান দিয়ে যেমন করে রক্ত বের হয়েছিল মৃত্যুর আগে, অবিকল অমন। আমি স্রোতস্বিনীকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কন্যা আমার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল।
.
স্রোতস্বিনীর বয়স এখন আট। আমাদের সংসার এই এতটুকুন। আর বড়ো হয়নি। বড়ো আমি করিনি। আমার কন্যা আমায় এত ভালো বুঝতে পারে। আট বছর বয়সী একটা বাচ্চা নিজের খাওয়া নিজে খাচ্ছে, নিজের জামা নিজে পরছে, নিজের স্কুলের পড়া নিজে প্রস্তুত করছে, নিজে স্কুলে যাচ্ছে, ফেরত আসছে, ঘর গুছিয়ে রাখছে, এইসব কোনো রুপকথা নয়। আমার কন্যা স্রোতস্বিনী অমন। এটা আমার রুপকথার সংসার। আমার স্ত্রীর মৃত্যুর চার বৎসর পার হলো। এই চার বৎসরে আমার কাছে আসতে চেয়েছেন সর্বমোট আটজন নারী। প্রথম নারীর সাথে আমি সাক্ষাৎ করলাম নেহাত আমার আব্বার জোরাজুরির কবলে পড়ে।
‘নিজের মেয়েকে আমাদের পালতে দিবি না, নিজেও বিয়েশাদি করবি না, মেয়েটাকে মানুষ করবে কে?’
বাবার মাথাব্যথা ছিল স্রোতস্বিনী। আর আমার দুর্বলতাও। আমি নারীর সাথে দেখা করলাম। স্রোতস্বিনী সহ। নারীর নাম মৌমিতা। চমৎকার একজন তিনি। বড়ো বড়ো চোখ। লম্বা চুল। মুখচ্ছবি এত টলটলে, এতবেশী ছায়া ছায়া তার চারপাশ, আমার মনে হলো এই বৃক্ষের তলায় একটু যদি মাথা পাতা যেত। একটা ভয়ানক স্মৃতি যদি মুছে ফেলা যেত। একটা টকটকে লাল গর্ত যদি এই বৃক্ষের সবুজ ক’টা পাতা দিয়ে বুজে দেওয়া যেত। মৌমিতা আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন। আমি আমার ডান হাতের অনামিকায় তাকালাম। ওখানে একটা সোনারঙা রিং। ফুলশয্যায় এই রিং পরিয়েছিল আমার স্ত্রী আমায়। স্রোতস্বিনীর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আসলো। ওর হাত ধরে চট করে মৌমিতার সামনে থেকে উঠলাম। প্রথম নারীর গল্প এখানে শেষ।
তারপর আরও অনেকে আসলেন। যেখানে চাকুরি করি, সহকর্মী একজন। নাম, নবনীতা। আমাদের একই বেলার শিফট। সকাল থেকে সন্ধ্যা। আমি নবনীতার মধ্যে আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম হঠাৎ। স্রোতস্বিনীর খোঁজ নিচ্ছেন তিনি। সকাল বিকাল। ফোন করে। পাশে হাঁটার ভঙ্গিও ঘনিষ্ঠ। কথাবার্তায় আকস্মিক আন্তরিকতার ছাপ। একদিন লিফটে এতবেশী কাছাকাছি গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন, আমি দমবন্ধ অনুভব করলাম। লিফটে আর কেউ নেই। নবনীতা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে আমার হাত ধরে কাতর স্বরে বললেন, ‘আমি স্রোতস্বিনীকে ভালোবাসি মাহিন, আপনাকে ভালোবাসি বলার সাহস পাচ্ছি না। আমি আপনার কন্যাকে এতবেশী ভালোবাসবো, আপনি আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য হবেন ঠিক। আমায় একটা সুযোগ দেবেন প্লিজ?’
নবনীতার চোখজোড়ায় এত বেশী কাতরতা ছিল, আমি আমার দীর্ঘ জীবনে এমন কাতর চোখ দেখিনি তা হলফ করে বলতে পারবো। আমার চোখ ভিজে আসলো। ভীষণ ইচ্ছে করল কাতর এই নারীর নরম চুলে হাত বুলিয়ে দিই একটু। চোখজোড়ায় গুঁজে দিই কুসুম সবুজ। হাত বাড়িয়েছিলামও। ততদূর, যতদূর বাড়ানোর পর লিফটের মসৃণ আলোয় ডান হাতের অনামিকার গোড়ায় ঝিকমিক করে উঠল আচমকা। তারপর টেনে নিলাম হাত। আমার স্ত্রীর জায়গাটা কে নেবে? কাটার ভয়ে মাছ খাইনি কোনোদিন। অথচ রাজ্যির কাজ ফেলে কোমরে আঁচল বেঁধে বকুনি দিতে দিতে আমায় মাছ বেছে ভাত খাওয়াতো ঐ নারী। সারাজীবন মা বাবা থেকে শারীরিক আর মানসিক দূরত্ব ছিল বলেই হয়তো ঈশ্বর আমায় সঙ্গী দিয়েছিলেন অমন একজন নারী, যিনি নিজের ভেতরই একটা আস্ত পরিবার। এত আদর করে কেউ মুছেনি আমার কপালের ঘাম কোনোদিন, কেউ কান্না করেনি, কেউ হাসেনি, কেউ ভালোবাসেনি আমায় জগত সংসার চূর্ণ করে অমন। কে হবে অমন? তার মতো। কারোর বিকল্প যে কেউ হয় না কোনোদিন।
.
মৌমিতা, নবনীতা সহ আরও কমসে কম ছয়জন ভালো মানুষের কাঁধে মাথা রাখতে গিয়ে আমি রাখিনি। ওতে আমার কোনো গর্ব নেই। কষ্টও নেই। রাত্তিরে খাওয়ার টেবিলে চুপচাপ বসে থাকি আমি। স্রোতস্বিনী আমার দিকে তাকায়। বলে, ‘আব্বু। আমি বেছে দিই?’
আমি হাসিমুখে না করি। স্রোতস্বিনী আমার নিষেধ পাত্তা দেয় না। মাছ বেছে দেয়। দলা দলা করে মুখে তুলে দেয়। নিজেও খায়। আমি আমার কন্যার দিকে তাকিয়ে থাকি। এত সুন্দর করে কথা বলে মেয়েটা। এত্ত মায়া কণ্ঠস্বরে লুকোনো তার। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার কন্যাকে দেখি। এইটুকুন বয়স। অথচ খাওয়ার পর চটপট প্লেট ধুয়ে ফেলে নিজের। আলাদা রুম আছে ওর। হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় কোলবালিশ বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ে সুন্দর।
রাত্তিরের সাথে কবরের সম্পর্ক গাঢ়। রাত্তির নামলে আমার মনে হয় বাসাটা আস্ত কবর। ভয়ানক নির্জনতা খেলা করে চারপাশজুড়ে। আমি চোখ বুজে টুকে টুকে চুর্ণ হওয়া আমার বুকের টুকরোগুলো জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করি তখন। কার কখন কোথায় বুক ভেঙে যায়, কে জানে। আহা। একদিন আমার অতিকষ্টে জোড়া দেওয়া বুকটা ফের গুড়ো হয়ে গেল। রাত্তিরের নির্জনতা চূর্ন করে শুনলাম একটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। হকচকিয়ে উঠে পা টিপে টিপে রুম থেকে বের হলাম। শব্দের পেছন ছুটলাম। থামলাম স্রোতস্বিনীর রুমের সামনে। উঁকি দিয়ে দেখলাম, আমার কন্যার মাথার দিককার জানালাটা খোলা। বাইরে রাস্তার অদূরে জ্বলা সোডিয়াম লাইটের হলদেটে আলোয় আমার কন্যার ছোট্ট শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠতে দেখলাম আমি। কোলবালিশ বুকে নিয়ে আমার কন্যা হেঁচকি দিয়ে দিয়ে কাঁদল। বোধহয় মায়ের কথা মনে পড়ল। আমি দরজা লাগিয়ে দিলাম।
.
পরদিন বাসার লিফটে আমি দেখা পেলাম লাবণীর। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল। গায়ের রং শ্যামলা। চঞ্চল চোখের মণি। একমুহূর্ত ওটা স্থির নেই। আশ্চর্য রকম অস্থির মেয়ে। আমি উপরে উঠছিলাম। লাবণীও। আমি এগার নাম্বার বাটন প্রেস করলাম। লাবণী এক থেকে এগার অবধি সবগুলো বাটন প্রেস করে হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
‘আপনার সমস্যা কী?’
‘কী সমস্যা?’
‘সবগুলো বাটন প্রেস করেছেন কেন? এখন প্রতি ফ্লোরে এই লিফট একবার করে থামবে। দরজা খুলবে। বন্ধ হবে। তারপর উঠবে। এগারতলায় উঠতে কতক্ষন লাগবে কোনো ধারণা আছে আপনার?’
লাবণী ফিক করে হেসে বলল, ‘আমি কি আপনাকে চিনি?’
‘না। আমিও আপনাকে চিনি না।’
‘তাহলে আমি কোন দুঃখে আপনাকে বিশ্বাস করবো? আপনি যদি লিফটের ভেতর আমার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেন?’
আমার মাথা ভনভন করল রাগে। গলা উঁচু করলাম।
‘আমি আপনার ক্ষতি করতে যাবো কেন? আমি আপনার কোনো ক্ষতি করবো না।’
‘এই যে প্রতি তলায় লিফট একবার করে থামবে, এইজন্য কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না।’
‘প্রতি তলায় লিফট না থামলেও আমি আপনার কোনো ক্ষতি করবো না।’
‘আচ্ছা?’
লাবণী আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মিটিমিটি হাসলো। আমি তাকালাম না আর। তবে স্বীকার করতে বাধ্য হলাম, লাবণীর বুদ্ধি বেশ। বুদ্ধিমতী মানুষ। জানোয়ারে ভরে গেছে দেশটা। ছোট্ট একটা বুদ্ধিও কত মানুষকে বাঁচাতে পারে আকস্মিক ক্ষতির হাত থেকে। লিফট দশ তলায় থামতেই আমি লাবণীর দিকে তাকালাম। বুদ্ধিমতী নারীর সাথে রাগ করে থাকা উচিত নয়।
‘আমি মাহিন।’
‘লাবণী। আমি নতুন এসেছি। আপনার পাশের বাসায় থাকছি। আপনার মেয়ের নাম স্রোতস্বিনী।’
‘আমার মেয়েকে চেনেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘তখন যে বললেন, আপনি আমাকে চেনেন না?’
‘আপনাকে তো চিনি না। আমি স্রোতস্বিনীকে চিনি। ভারী মিষ্টি মেয়ে আপনার। সকালে গিয়েছিলাম বাসায়। ওর তো স্কুল ছুটি আজ। অনেকক্ষণ গল্প করলাম। গল্প শুনে তো আমি হাসতে হাসতে শেষ। ওর বলা একটা গল্প আপনাকে শোনাই দাঁড়ান...’
লাবণী বকবক করে গেল। আমি শুনে গেলাম। এগার তলায় লিফটের দরজা খুলল। কেউ নামলো না। একজন গল্প বলায় ব্যস্ত, আরেকজন শোনায়। লিফট নিচে নামলো। ফের উপরে উঠল। লাবণীর সাথে আমার দারুণ বন্ধুত্ব হলো। পড়াশোনা করছে এখনও সে। মাস্টার্সটা শেষ হলেই চাকুরি বাকুরিতে ঢুকবে। মা নেই ওর। পরিবারে শুধু বাবা আর সে। বাবার ব্যবসা আছে। হয়তোবা ওখানে পা রাখবে পড়াশোনা শেষে। কথা সেটা নয়, কথা হলো পুরো চার বৎসর পর আমি অমন কোনো বন্ধু পেলাম, যার সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যায়। যার কাছে না গোপন থাকা যায়, না রাখা যায়। যে হৃদয় নিংড়ে বের করে নিতে পারে শ'দেড়েক অন্ধকার রাত্তির, গা কামড়ানো জোনাক পোকা, স্যাঁতসেঁতে সন্ধ্যা সব। যাকে কথায় কথায় নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়, আমার স্ত্রী মারা গিয়েছে একটা শাপলা ফুলের জন্য। এক দুপুরবেলা। অশ্রুদীঘির ভেতর। এই রিং আর আমার কন্যাটা ছাড়া আমার আর কিচ্ছু নাই তার। লাবণী আমার অনামিকায় চোখ রেখে বলল, ‘আমি একদিন আপনাদের গ্রামের ঐ অশ্রুদীঘি দেখতে যাবো। পাড়ে হাঁটবো। জলে পা ভেজাবো। আমাকে নিয়ে যাবেন?'
আমি মাথা উপর নিচ করলাম। স্রোতস্বিনী লাফালো। সেকি আনন্দ তার। লাবণী স্রোতস্বিনীকে বুকে চেপে বলল, 'তবে যাবো ঠিক, আমি কিন্তু নৌকোয় উঠছি না। আপনি জোর করলেও না।’
আমি হাসলাম। লাবণী অমন। চোখে জল নিয়েও হাসাতে পারে বেশ। আমার মনে হলো বাসার নির্জনতা ভাঙ্গলো ধীরে। তীব্র বিষাদভরা কাপের তলায় একটা আলো ঝলমল সন্ধ্যা চুপিচুপি বুঁদবুঁদ করে গেল, আমার ভালো লাগলো খুব। পুরো চার-চারটে বৎসর আমার কোনো সন্ধ্যা ভালো লাগেনি। লাবণী মাঝেমাঝে আমাদের সঙ্গে রাত্তিরের খাবার খায়। স্রোতস্বিনী তাকে ডাকে লাবু। আমি অবশ্য কোনোদিন নাম ধরে ডাকি না। আশ্চর্য হয়ে আমার কন্যার চঞ্চলতা দেখি শুধু। খাওয়ার টেবিলে কোনোদিন এত কথা বলে না সে। যেদিন লাবণী খেতে আসে, সেদিন বলে। বকবক। বকবক। দুইজন মিলে ভাতের পাতে তরকারি কম, কথা ঢালে বেশী। আমি আনন্দ পাই। স্রোতস্বিনীর হাস্যোজ্বল মুখচ্ছবি আমাকে তৃপ্ত করে দারুণ। কিন্তু আমার আনন্দ টিকলো না বেশীদিন। একদিন আমি দেখলাম, আমার ডান হাতের অনামিকা আঙুল শূন্য। রিংটা নেই।
.
আমি সারা ঘর উলট-পালট করলাম। রিংটা খুলে ড্রয়িং টেবিলের উপর রেখে গোসলে ঢুকি আমি রোজ। বাইরে বের হয়ে পরে নিই। আজ বাইরে বের হয়ে দেখি নেই। আশপাশ দেখলাম। নিচে দেখলাম। মাথার ভেতর ভনভন শব্দ হলো। কানের লতি লাল হয়ে এলো মুহূর্তেই। টেবিলটা টেনে সরিয়ে ফেললাম। উপরে রাখা কাঁচের জিনিসপত্র নিচে পড়ল। কাঁচ ভাঙ্গার আওয়াজে স্রোতস্বিনী ছুটে এলো। স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে।
‘আব্বু, কী হয়েছে?’
‘রিংটা খুঁজে পাচ্ছি না রে। কোথায় রাখলাম। উফফ।’
স্রোতস্বিনী স্কুলব্যাগ পাশে রেখে আমার সাথে খুঁজল। রুমের আসবাবপত্র সব সরানো হলো। কোথাও নেই। আমি মনে করার চেষ্টা করলাম, রাত্তিরে কোথায় কোথায় গিয়েছি। হন্তদন্ত হয়ে বের হলাম। লিফটে খুঁজলাম। লিফটে খুলে পড়ার কথা না। গতকাল রাত্তিরে লিফট বন্ধ ছিল। সিড়ি বেয়ে উঠেছি আমি। গেইটের আশপাশ খুঁজলাম। বাসার সামনে সবুজ ঘাসে একজন লোক হামাগুড়ি দিয়ে মাথা নিচু করে কিছু একটা খুঁজছে, এমন একটা দৃশ্য উপভোগ করার মানুষ থাকবে না, ভীড় হবে না, অমন হয় না। আমার দেশের মানুষ রাস্তায় ওয়াসার গর্ত খোঁড়ার দৃশ্যও বিমল আনন্দ নিয়ে উপভোগ করে। আমায় নিয়ে মোটামুটি একটা ভীড় হলো। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীও জুটল। তারাও হাত লাগালো। আমার কপাল ছুঁইয়ে ঘাম পড়ল টপাটপ। রিংটা না পেলে মহা সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিভাবে হারালাম? হায়!
সারা দুপুর খুঁজলাম। স্বেচ্ছাসেবীরা ক্ষান্ত দিলো। একজন পরামর্শ দিলো, বিল্ডিং-এর এগারতলা অবধি প্রতিটা বাসার সামনে দিয়ে গিয়েছিলাম গতকাল। প্রতিটা বাসার সামনে একবার চেক করা দরকার। সাথে ময়লা ফেলার ডাস্টবিনও। আমি সিড়ি বেয়ে উঠলাম। প্রতিটা বাসার দরজায়, প্রতিটা সিঁড়ি, প্রতিটা কোনা তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। সবগুলো বাসার ময়লা ফেলার ঝুড়ি ঘাঁটলাম। দশম তলার দরজায় এসে আমার চোখ ভিজে আসলো। সিড়ির একপাশ দু’হাতে মুঠো করে ধরে আমি হু হু করে কাঁদলাম। আমার স্ত্রীর চিহ্ন ওটা। অপদার্থ মানুষ হারিয়ে যায়, পদার্থ কীভাবে হারায়, হায়! লাবণী আসলো বিকালবেলায়। আমার অবস্থা দেখে হতবাক। স্রোতস্বিনীকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’
‘আব্বুর রিংটা হারিয়ে গেছে।’
‘কোন রিং? অনামিকা আঙুলের রিংটা?’
‘হ্যাঁ।’
‘তো কী হয়েছে? আরেকটা নিয়ে নেবে ওরকম দোকান থেকে। ওমা, তুমিও কাঁদছো? বাপ মেয়ে মিলে কী শুরু করেছো তোমরা?’
স্রোতস্বিনী হেঁচকি দিয়ে দিয়ে বলল, ‘আব্বু কোনোদিন কান্না করে না তো। আব্বু কান্না করলে আমার খুব কান্না পায়।’
লাবণী স্রোতস্বিনীকে কোলে নিয়ে আমার কাছে এলো। আমার দুই হাঁটু জুড়ে ময়লা দাগ, দুই হাত কালচে, মাটির গন্ধ ওতে, চোখজোড়া ভেজা, গায়ের শার্ট কুঁচকানো, একটা বোতাম ভুল ফুঁটোয় আটকানো। লাবণী আমাকে টেনে নিয়ে আসলো বাসায়। সঙ্গে স্রোতস্বিনী। আমরা মুখোমুখি বসলাম তিনজন। লাবণী আমায় শাসালো, ‘রিং-ই তো। ওরকম দেখতে কিনে নিয়েন দোকান থেকে একটা। মানুষকে মনে রাখার জন্য এইসবের আশ্রয় নিতে হয় না। যে মানুষ বুকে আটকে থাকে, তাকে অনামিকার গোড়ায় এনে বাঁধছেন কেন? আশ্চর্য!’
আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম। পুরো বাসা এলোমেলো। রুমে পা দেওয়া গেল না। কাঁচের টুকরো পড়ে আছে দরজায়। এদিক ওদিক। ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা পানির জগ উল্টে আছে, পায়া গড়িয়ে পানি পড়ছে এখনও, টুপ টুপ। লাবণী চোখ রাঙালো।
‘কী অবস্থা করে রেখেছে বাসার? উফফ। সকালে কি সুন্দর দেখে গেলাম সব, এখন এইসব গুছাবে কে?’
এবং আমি চমকালাম। সকালে লাবণী বাসায় এসেছিল। আগে কেন মাথায় আসেনি। কি জঘন্য! তড়াক করে উঠলাম। লাবণীর হাত চেপে ধরলাম শক্ত করে। আঁতকে উঠল সে। খসখসে স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সকালে আপনি বাসায় এসেছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘রুমে ঢুকেছিলেন আমার?’
‘মানে কী? কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?’
‘রিংটা কোথায়?’
আমি হাত পাতলাম। লাবণীর গালের দুইপাশ আর নাক লাল হয়ে এলো। তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি আপনার রিং নেবো কেন?’
‘কারণ আমি আপনাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারবো না। আপনি সেটা জানেন। এই রিংটার দিকে যতবার তাকাবো, তত কদম পিছিয়ে আসবো আমি। আপনি বুদ্ধিমতী। কিন্তু আমি বোকা নই। আপনি রিংটা ফেরত দেবেন এখনই। এবং এরপর আমার বাসার দরজায় পা রাখবেন না কোনোদিন। আমি আপনাকে ঘৃণা করি। আপনাকে আমি পছন্দ করতে পারবো না কোনোদিন আর। রিংটা দিন।’
আমি হাত পেতে দাঁড়িয়ে রইলাম। টু শব্দও করল না লাবণী। নীরবে চোখ দু’টো ভিজে আসলো শুধু তার। চঞ্চল চোখের মণিগুলো দৌড়ালো না আর। স্থির দাঁড়িয়ে রইল। আমার চোখ বরাবর। টলটল।
‘আমার কাছে আপনার রিংটা নেই।’
‘এখনই বের হয়ে যান।’
আমি চিৎকার করলাম। চার দেয়ালে বাড়ি খেল ঐ আওয়াজ। লাবণীর শরীরটা কেঁপে উঠল কান্নার ধমকে একবার। ঢোক গিলল অনবরত সে। আমার চোখ থেকে চোখ সরালো না একদম। সম্ভবত আশা করছিল, শেষ মুহূর্তে তার চোখে আমি হঠাৎ আবিষ্কার করে বসবো একজোড়া শাপলা ফুল। একটা অপ্রকাশ্য আজন্ম সুপ্ত দীঘির কোনায় ফুটে আছে যারা। যে দীঘি জলে পা ভেজায়নি কেউ কোনোদিন। আদর করে খাইয়ে দেয়নি, চুল বেঁধে দেয়নি, কান্না করলে মাথায় বুলায়নি হাত। চোখ নামিয়ে লাবণী দরজায় পা বাড়ালো। আমার হাত চেপে ধরল স্রোতস্বিনী তখন। ছোট্ট ছোট্ট আঙুলগুলো ঠেলে মুঠোয় যেন কী গুঁজে দিলো আচমকা। আমি মুঠো খুললাম। রিংটা। সেকি! কন্যার দিকে তাকালাম। চোখে একটা আস্ত সমুদ্র তৈয়ার করে কন্যা আমার হেঁচকি দিয়ে দিয়ে বলল, ‘লাবু চুরি করে নাই। আমি চুরি করছি।’
আমার গলার স্বর বসে গেল।
‘কেন?’
‘আমার তোমাকে লাগবে। আমার লাবুকেও লাগবে। তুমি একবার এই রিংটার দিকে তাকালে আমরা আবার একলা হয়ে যাবো আব্বু।’
স্রোতস্বিনী তাকিয়ে রইল আমার দিকে। নিচের ঠোঁট’টা ধনুকের মতো বেঁকে উপরের ঠোঁটের ভেতর গুঁজে গেল টুপ করে ওর। চার বৎসর বয়সে মায়ের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর এমন করে কান্না চাপতে দেখেছিলাম শেষবার ওকে। লাবণী দরজায় তখন। আমি থমথমে স্বরে ডাকলাম, ‘লাবণী।’
যদিও কারণ ছিল না। অমন অপমানের পরও। ভালোবাসলে মানুষ বুঝি তুচ্ছ করে সব। জগত, সংসার। লজ্জা। যেতে তো চায়নি একফোঁটা কোনোদিন। আমায় হতবাক করে লাবণী থমকে দাঁড়ালো।
'রেণুর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী সামনে। আমরা গ্রামে যাবো। আপনি অশ্রুদীঘি দেখতে যাবেন আমাদের সাথে? ওখানে একটা স্নান বাকি আমার।’
লাবণী ফিরে তাকালো আমার দিকে। আমি স্পষ্ট দেখলাম, মেঘবর্ণ ওর প্রস্ফুটিত ছলছল চোখ দু'টোর মণিগুলোয় ফেরত এসেছে প্রাণ। ওরা দুলছে। অবিকল যেন একজোড়া শাপলা ফুল।
.
'নীরদবরণ'
(০৪.০৩.২০২২)

শাখাওয়াত হোসেন।

Comments