দায়িত্ব
প্রথম চাকরির প্রথম মাইনে পেয়ে মাকে একটা শাড়ি কিনে দেওয়ার কথা ভাবছে তানভীর। যেই ভাবা সেই কাজ। মাকে নিয়ে গেল সে শপিংমলে। এ দোকান ওই দোকান ঘুরতে ঘুরতে একটা দোকানে গিয়ে বসলো মা ছেলে। দোকানদার তাদের শাড়ী দেখাতে ব্যস্ত। কিন্তু রওশন আরা শাড়ী দেখা বাদ দিয়ে তাকিয়ে আছে দোকানের বাইরে আধবুড়ো এক লোকের দিকে। যে কিনা মেঝে পরিষ্কারে ব্যস্ত। রওশন আরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খুটিয়ে খুটিয়ে লোকটাকে দেখেই চলেছে। এক সময় লোকটারও চোখ যায় রওশন আরার দিকে। রওশন আরা দ্রুত চোখ নামিয়ে ছেলেকে নিয়ে উঠে যান। তানভীর বারবার জিজ্ঞেস করে; শাড়ী না কিনে কেন চলে যাচ্ছে, কি হয়েছে তার, শরীর খারাপ কিনা ইত্যাদি। কিন্তু রওশন আরা কোনো জবাব না দিয়ে শুধু বললো, আমি বাসায় যাবো। চলো আমার সঙ্গে।
বাসায় এসে নিজের রুমে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে রওশন আরা। আর ফিরে যায় অতীতে।
বাবা মারা যাওয়ার পরে সংসারের হাল ধরার জন্য রওশন আরার মা বাবুর্চিদের সঙ্গে কাজ নেন। সেখানে তার মা'র কাজ ছিল শুধু বিভিন্ন মসলা বাটা। সে ছোট বলে তাকেও তার মা সাথে করে নিয়ে যেত। এভাবে থাকতে থাকতে কিশোরী বয়সে উপনীত হয়। ততদিনে সে বাবুর্চিদের সঙ্গে থেকে রান্নাটা ভালো আয়ত্তে আনে। তার বয়স যখন পনের, তখন বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পরে জানতে পারে তার স্বামী একজন জুয়াড়ি এবং মাদাকাসক্ত। বিয়ের বছরখানেক পরে তার ছেলে তানভীর জন্ম নেই। ছেলে জন্মের মাস ছয়েক পরে স্বামী তাদের ফেলে চলে যায়।
এরপর রওশন আরা মানুষের বাসায় রান্না-বান্নার কাজ নেন। আগে থেকে যেহেতু রান্না নিয়ে তার ভালো অভিজ্ঞতা আছে, সে সুবাদে সবাই তার রান্নার প্রশংসা শুরু করে। আস্তে আস্তে তার রান্নার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। সে এবার বাসায় গিয়ে রান্না করা বাদ দিয়ে ঘরে বসে হোম ডেলিভারি শুরু করে। এতে অতি দ্রুত বেশ সাফল্য লাভ করে সে। আয় রোজগার ভালো হয়। ছেলেকে ভালো স্কুলে ভর্তি করায়, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে। মানুষের মতো মানুষ হিসেবে তৈরি করে।
পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ছেলে চাকরিতে ঢুকে। আর আজ তার ছেলে প্রথম মাইনে পেয়ে তাকে শাড়ী কিনে দেওয়ার জন্য নিয়ে যায়।
আর দোকানের বাইরে যে লোকটাকে দেখেছে সেটা তার স্বামী। যে কিনা অনেক বছর আগে তাদের ফেলে চলে গিয়েছিল। এত বছর পর দেখেও তার চিনতে একটুও ভুল হয় নি। যদিও তাকে চিনতে পেরেছে কিনা সেটা বুঝতে পারছে না। স্বামীকে দেখে রওশন আরা কেন যেন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, আর সেজন্য ছেলেকে নিয়ে দ্রুত বাসায় চলে আসে।
'মা মা' বলে তানভীর ডাক দেয়। ছেলের ডাক শুনে রওশন আরা ভাবনার অতীত থেকে ফিরে আসে। চোখ খুলে উঠে বসে। ততক্ষণে তানভীর রুমে এসে পাশে বসে।
- কি হয়েছে বলো তো মা? শরীর ঠিক আছে তোমার?
- হা ঠিক আছে বাবা।
- তাহলে শাড়ী না কিনে চলে আসলে কেন?
- এমনি, ভালো লাগছিল না তাই।
- মা তুমি কি আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছো?
- না তো বাবা, কি লুকাবো?
- সত্যি করে বলতো মা কি হয়েছে? আমার মনে হচ্ছে তুমি কিছু লুকাচ্ছো আমার থেকে।
- একটা কথা বলি বাবা তোকে?
- হুম বলো।
- দোকানের বাইরে যে লোকটা মেঝে পরিষ্কার করছিল, সে তোর বাবা।
- কি বলছো মা তুমি এসব!
- হা বাবা আমি সত্যি বলছি।
আর কিছু না বলে তানভীর চুপ করে উঠে যায়। পরেরদিন সে মাকে নিয়ে আবারও সেই শপিংমলে যায় এবং লোকটাকে খুঁজে বের করে। মলের পাঁচ তলায় একটা ফুডকোর্টে দুজনকে বসিয়ে রেখে সে নিচে নেমে আসে।
একটু পরে হাতে দুটো প্যাকেট নিয়ে তানভীর ফিরে আসে। একটা মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলে; এটা তোমার জন্য, তোমার পছন্দের জামদানী শাড়ী। আর অন্য প্যাকেটটা লোকটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, "এটা আপনার জন্য। আপনি হয়তো আমাদের এখনো চিনতে পারেন নি। না চেনাটা অবশ্য স্বাভাবিক। আমি আপনার ছেলে তানভীর আর ইনি আপনার স্ত্রী রওশন আরা। যাদের ফেলে আপনি চলে গিয়েছিলেন"।
লোকটা এই কথা শুনে ছলছল চোখে তানভীরের দিকে তাকায়। তানভীর আবার বলে, "আপনি হয়তো আমাদের ভুলে গেছেন। কিন্তু আমি বা আমার মা আপনাকে ভুলি নি কখনো। আমি চাকরির প্রথম বেতন পেয়েছি। তা দিয়ে মায়ের জন্য যেমন শাড়ী কিনেছি, তেমনি আপনার জন্য শার্ট আর প্যান্ট কিনেছি। আশা করবো আপনি অবশ্যই পড়বেন। পড়লে নিজের কাছে খুব ভাল লাগবে। আর একটা কথা, আপনি এই জীবনে না বাবার দায়িত্ব পালন করেছেন, না স্বামীর দায়িত্ব পালন করেছেন? কোনোটাই করেন নি। কিন্তু আমি তো ছেলে হয়ে সেই দায়িত্ব অবহেলা করতে পারি না। তাই ছেলে হিসেবে তার বেতনের প্রথম উপহার। আশা করি আমার উপহার বা দায়িত্বটুকু আপনি গ্রহণ করবেন"।
এই বলে প্যাকেটটা লোকটার হাতে দিয়ে তানভীর তার মাকে নিয়ে চলে আসে। আর লোকটা মাথা নিচু করে দু'ফোটা চোখের পানি ফেলে। হয়তো অনুতপ্তের অথবা দায়িত্ব অবহেলার।।
সমাপ্ত
দায়িত্ব
তানভীর আহমেদ
Comments
Post a Comment