পথের বাঁধন

পথের বাঁধন 

অনেক বছর আগে রাউজানের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম  কলমপতি থেকে রিকশায় করে ফিরছিলাম থানা সদরে। তখন ছিল সন্ধ্যা পূর্ব বিকেল। শুকনো কাঁচা রাস্তা ছিল। পথের দুপাশে উঁচুনিচু টিলা। টিলার গায়ে লতাগুল্ম, কোথাও আবার বাঁশঝাড়। শাল, মেহগনি, জারুল ও বনফুলসহ মহুয়া গাছের বিস্তীর্ণ সারি। 
ঐসব বৃক্ষ আর লতাপাতার উপর বিকেলের সোনা রোদ ঝলমল করছিল।

ঠিক পিছনেই অস্তমিত সূর্য। রোদের রঙ দেখে মনে হচ্ছিল এখন সময় শুধু লাল আভা বিচ্ছূরণের! এই রকম স্বর্ণালি রোদ্দুর গায়ে মেখে  রিকশার হুডি ফেলে আসছিলাম আমি আর সীমা ভাবি। সামনে পথের উপরে আমাদের দুজনের ছায়া পড়েছিল। রিকশাটি চলছিল সদর থানার দিকে। 

সীমা ভাবি আমার ক্ষণকালীন সহকর্মী ছিল। বিয়ে হয়েছে মাত্র বছর দুয়েক আগে। শরীর ও মননে তখনও তারুণ্যের ছোঁয়া বিরাজমান ছিল। কখনও সে চঞ্চলা উচ্ছ্বলা হরিণীর মতো একটি মেয়ে । আবার মুহূর্তেই সে গম্ভীর, দায়িত্ববান রমণী। কখনও সে বন্ধুর মতো একজন। আবার কখনও সে কারোর প্রেমময়ী স্ত্রী। আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড় ছিল সে। বন্ধু হলেও  তাকে সীমা ভাবি বলে ডাকতাম।

আমরা কয়েকজন ছেলেমেয়ে সেইবার রাউজানে গিয়েছিলাম একটি অফিসিয়াল ডাটা উপাত্ত সংগ্রহের কাজে। আর এই কাজ করতে যেয়েই আমাকে আর সীমা ভাবিকে ঐদিন যেতে হয়েছিল সেখানকার একটি পাহাড়ি গ্রাম কলমপতিতে।

আমরা দুজন পথ দিয়ে আসতে আসতে দেখছিলাম পথের ধারে  সাদা ও লাল রঙের মর্নিং গ্লোরীর মতো ছোট ছোট ফুল। সারি সারি টিলার ফাঁক দিয়ে হুহু করে বয়ে আসছিল বাতাস। আর সেই বাতাসে ভেসে আসছিল যত নাম না জানা বনফুলের গন্ধ! আমি সীমা ভাবিকে বলছিলাম -- 'এখন তো গানের সময়, একটা গান গাও তুমি ।'

সীমা ভাবী বলছিল -- 
'এখন কোনও গান নয়, কোনও কথাও নয়। এখন শুধু চুপচাপ করে সব দেখবার সময়। তুমি আমলকী পিয়ালি আর মহুয়া বন দেখতে থাকো।'

আমি বললাম --
'কী উজ্জ্বল বিকেল আজ! কমলা রঙের রোদ্দুর এসে পড়েছে বৃক্ষরাজির সবুজ পাতার উপর! অপূর্ব  লাল আভায় ভরে উঠেছে চারদিকে। এই রোদ্দুর, এই বিকেল ভালো লাগছে না তোমার ? কেন গাইবে না তুমি গান , 
বলো? '

-- তোমার নাম রঞ্জন না হয়ে যদি অমিত হতো, তাহলে বলতাম -- গান নয় আজ, একটি কবিতা আবৃত্তি করো তুমি অমিত রায়ের মতো। '

-- তুমি গান গাইবে না বলে আমি কবিতা আবৃত্তি করতে পারব না! এত সুন্দর মহুয়ার গন্ধের বিকাল আজ! আর তোমাকে একটি কবিতা শোনাব না, তাই কী হয় কখনও? ভানু চক্রবর্তী শুধু অমিতের জন্যই কবিতা লেখেননি, সে আমাদের জন্যও লিখেছিল --

পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।
রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
দিগঙ্গনার নৃত্য,
হঠাৎ-আলোর ঝল্‌কানি লেগে
ঝলমল করে চিত্ত।

আমার মুখ থেকে কবিতা কেড়ে নিয়ে সীমা ভাবি নিজেই বাকি অংশ আবৃত্তি করতে থাকে  --

নাই আমাদের কনকচাঁপার কুঞ্জ,
বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
হঠাৎ কখন্‌ সন্ধ্যাবেলায়
নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
অরুণকিরণে তুচ্ছ
উদ্ধত যত শাখার শিখরে
রডোডেন্‌ড্রন্‌ গুচ্ছ।

কখনও চুপচাপ, কখনও কথা বলতে বলতে আমরা  অনেকটা পথ চলে আসি। জনশূন্য বনভূমির সেই পথ। সীমা ভাবি বলছিল -- 'রঞ্জন, রিকশাটা ছেড়ে দাও। বাকি পথটুুকু আমরা হেঁটে হেঁটে চলে যাই!' 

রিকশা থেকে নেমে আমরা সামনের দিকে হাঁটতে থাকি। চারদিকে সারি সারি টিলা। সন্ধ্যা হয়নি তখনও। কেমন যেন চাপা বাতাস বইছিল। এক জায়গায় দেখলাম - ছোট বড় নুড়ি বিছানো পথ। পা ফসকে পড়ে যাবার আশঙ্কা আছে। সীমা ভাবি বলছিল -- 'রঞ্জন তুমি আমার হাত ধরো।' 

আমি সীমা ভাবির হাত ধরি।
বাকি পথটুকু আমার হাত সে আর ছাড়ল না। পথ চলতে যেয়ে কিসের যেন এক ভয় পাচ্ছিল ভাবি! নির্জন বন লোকালয়ে কণ্ঠরোধ হয়ে আসার মতো সন্ধ্যা নামছিল তখন। এক লাবণ্যময় আঁধার হয়ে আসছিল ঐ পথের উপরে। 

আরও কিছু পথ আসার পর দেখি, পাশে একটি ছোট্ট পাহাড়। একটি মৃত ঝর্ণাও দেখতে পেলাম। বৃষ্টির স্বরূপে ঝিরঝির করে জল ঝরে পড়ছে। সঙ্গীতের মতো পানিরও এমন কলকল শব্দ হয়! জলের এমন সিম্ফনি কানে আসতেই ক্ষণিক বিমোহিত হয়ে পড়ি আমরা। টপটপ জলপতন শুনে বিষণ্ণ হলো মন। আবার প্রশান্তি জাগানিয়াও মনে হলো। অনেকটা পথ ঝর্ণার ঐ কলকল শব্দ শুনতে শুনতে চলে আসি। 

আমরা চলতে থাকি সামনের দিকে। তখন সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকার হয়েছে! বন মোরগ আর টুনটুনির ডাক শোনা যাচ্ছিল। নাম না জানা আরো পাখির ডাকও শুনতে পাচ্ছিলাম। মাঝে এক ফাঁকে পিছনে ফিরে দেখেছিলাম সূর্যাস্ত। সে এক অপূর্ব দৃশ্য । নির্জন বন ক্রোড়ে কিছু  অপার্থিব সৌন্দর্য আস্বাদন করে নিতে হয়। আমরা নিয়েছিলাম তাই। নিজেদের বঞ্চিত হতে দিইনি।

পথ যখন ফুরিয়ে আসছিল, তখন সীমা ভাবি আরও নিবিড় করে আমাকে জড়িয়ে নিচ্ছিল। নিঝুম স্তব্ধতার মাঝে আমি বলেছিলাম -- 'আজিকার মতো এমন সন্ধ্যা, এমন মায়াময় আঁধার আর কোনদিন পাবো না। পৃথিবীতে কিছু স্বর্গীয় ক্ষণ মানুষের জীবনে আসে, যা থেকে মণিরত্ন কুড়িয়ে নিতে হয়।' 

এই পথ চলতে তেমনই কিছু উজ্জ্বল মুহূর্ত পেলাম। এবং তা একান্ত করে নিলাম। হয়তো এটা কোনও পরম পাওয়া নয়। কিন্তু যা পেলাম তা সারা জীবনকালের জন্য পরম হয়ে থাকল। 

সব পরম পাওয়া কাউকেই দেবার হয়৷ না , সেই সত্য কথা বুঝতে পেরে মানুষ নাকি কাঁদে। সীমা ভাবি সেই সত্য কথাটি বুঝতে পেরেছিল। তাই  সেদিন সেই সন্ধ্যায় পথের উপর দাঁড়িয়ে  ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেছিল সে। 'চলিতে পথে পথে বাজুক ব্যথা পায়ে/ পরানে বাজে বাঁশি, নয়নে বহে ধারা--দুখের মাধুরীতে করিল দিশাহারা....।'

আমাদের সেই কর্মকাল একদম ক্ষণকালের ছিল। 
সীমা ভাবি চলে গিয়েছিল অন্য কর্মে, আর আমি থেকে গিয়েছিলাম  আমার কর্মলোকে। 

তারপর কত বছর চলে গেছে! আমার সমগ্র জীবন কালের উপর কত রাত্রির ছায়া এল, কত সন্ধ্যা! 
কত কর্মে , কত ভাবনায়, কত বিভ্রমে ভেসে উঠত সীমা ভাবির মুখ! কত পথ পেরিয়ে এলাম এই জীবনে! কোথাও কোনও অপার্থিবে সীমা ভাবির সেদিনের সেই কান্নার শব্দটি নিঃশব্দ হলো না !

~   কোয়েল তালুকদার

Comments

Popular posts from this blog

চুয়াডাঙ্গা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?

গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে জেনে নিন!