এক্সিডেন্টাল মিট

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রাখার পর ছুটতে ছুটতে এসে নিধির সামনে দাঁড়ালাম।
- কিরে তোর এত্ত লেট কেন? 
- আর বলিস না, আমি ভুলে অ্যালার্ম অফ করে 
  রাখছি, উঠতে লেট হয়ে গেছে। 
- আচ্ছা চল তাড়াতাড়ি, সেকেন্ড পিরিয়ডে
  আমার এক্সাম আছে। 
নিধি আমার সমস্ত বাহানা টলারেট করার একমাত্র সঙ্গী, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমরা আলাদা ডিপার্টমেন্টে পড়লেও একসাথেই যাই রোজ। একটা অটোতে উঠে আমরা রওনা দিলাম ক্লাসের উদ্দেশ্য।
 অটো থেকে নামতেই ছোটখাটো একটা জটলা দেখলাম। সামনে এগিয়ে গিয়ে আন্দাজ করলাম একটা লোক সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেছে। লোকজন উনার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। আমি একটু এগিয়ে যেতেই, নিধি বললো, দোস্ত অনেক লেট এমনিতেই, ঐখানে আর না যাই। ওর কথা শুনে পাশ কাটিয়েই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ খানিকটা পরিচিত কিছু আমার ব্রেন ক্যাচ করে ফেলছে। আমি দুই-পা পিছিয়ে যা দেখলাম, তা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি ওইখানকার লোকগুলোকে বললাম, 'উনাকে আমি চিনি, প্লিজ  উনাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে আমাকে একটু হেল্প করেন'। 
করোনার সময়। মানুষও ভয় পাচ্ছে। তারপরেও একজন লোক বেশ সাহস করে হেল্প করলো। নিধি আর ঐ লোকটাকে নিয়ে আমরা হসপিটালের দিকে ছুটলাম। বেশি দূরে না মাত্র পাঁচ মিনিটের রাস্তা। পৌচ্ছে উনাকে হসপিটালে ভর্তি করে লোকটি চলে গেল, যাওয়ার সময় বলে গেল রোগীর রিলেটিভ কে ফোন দিতে। 

নিধি কে বললাম 'দোস্ত আর তো বেশি সময় নাই, তোর পরীক্ষার লেট হয়ে যাবে।  তুই চলে যা। ' এতক্ষণ সে আমার টেনশন দেখে পুরোপুরি ভয় পেয়ে চুপ করে ছিল। 
--'তুই তো বললি না তুই এই হ্যান্ডসাম সুপুরুষ
   কে কিভাবে চিনিস?? " 
-- তুই যা আপাতত। আমি পরে তোকে সব
  বলবো। 
-- দোস্ত তুর্য নাকি? তুই তো সারাদিন তুর্য-তুর্য
   করিস?
-- যাবি কি তুই?
-- আচ্ছা, যাচ্ছি যাচ্ছি। সাবধানে থাকিস। কি হয়
   না হয় আমাকে আপডেট দিবি। আমি আসছি 
   বিকালে। 
বলেই নিধি চলে গেল। নিধি আর যাই হোক ভুল গেজ করে নি। ডাক্তার এসে তুর্য কে চেক করে, একটা স্যালাইন দিয়ে চলে গেল। বললো ভয় এর কিছুই নাই। 
আমি বেশ নার্ভাস।  আমি যাকে নিয়ে এসেছি সে নিজেই আমাকে চেনে না। আমাকে দেখে কি যে রিএক্ট করে, বেশ দুর্বল সে তখন। তাকাতে পারছে না। ওয়ার্ডে বারান্দায় পাইচারি করতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পরে বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। উনি কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। 
-- আপনি ঠিক আছেন?
-- হ্যা। বাট আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না?
-- আমিই আপনাকে হসপিটালে নিয়ে এসেছি।
-- ওহ। কিন্তু আপনিই কেনো? মানে আর কেউ
   আসে নাই?
-- জ্বী, একজন এসেছিল। উনার কাজ থাকাই
   চলে গেছে। আমি আসলে আপনাকে চিনি
   তাই আমি থেকে গেছি। 
-- মানে, আপনি আমাকে কিভাবে চিনলেন?
-- আপনাকে আমি ফেইসবুকে ফলো করতাম, 
  আপনার লিখাগুলা পড়তাম। সেইখান থেকেই
  চিনি। 
-- শুধুমাত্র ফেইসবুকে দেখেই আপনি আমাকে
   হসপিটালে নিয়ে চলে এলেন? (মৃদু হাসলো)
-- আশা করি আমি কোনো ভুল করিনি। 
-- না না, তা কেন। আমি এইরকম কিছু মিন
   করিনি।
-- আচ্ছা, আপনি আপনার কোনো রিলেটিভ কে
   ফোন দেন। আমার মনে হয়, আপনার মা কে
   ডিরেক্ট না জানিয়ে কোনো কাজিন বা ফ্রেন্ড 
   কে জানান। আন্টি শুনলে অনেক টেনশন
   করবে।
-- জ্বী, ঠিকই বলেছেন। 
বলেই তুর্য ওর কাজিন কে ফোন দিল। কিন্তু তার আসতে প্রায় দেড় ঘন্টা মতো লেট হবে। সে আমাকে বললো,
-- আপনার নাম টাই তো জানা হলো না?
-- আমার নাম অঙ্কুর
-- মৌমিতা নিহার অঙ্কুর? 
-- জ্বী। 
-- আপনি চাইলে এখন যেতে পারেন। সমস্যা
   নাই। আমি একাই ম্যানেজ করে নিতে
   পারবো। একটু পরে মাহি চলে আসবে। মাহি
   আমার কাজিন।
-- আর কিছুক্ষণ ওয়েট করি, প্রবলেম হবে না।
   আপনি রেস্ট করেন। উনি আসলেই আমি
   চলে যাব।
-- আচ্ছা ঠিক আছে। 

বাসাই মা কে জানিয়ে দিলাম আসতে বিকাল হয়ে যাবে, প্র্যাক্টিকাল ক্লাস আছে। সকালে তাড়াহুড়া করে নাস্তা করা হয়নি। খুব ক্ষুধাও লেগেছে। দুপুর হয়ে গেছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি দেয়ালে হেলান দিয়ে। উনি ঘুমাচ্ছেন। হসপিটালে সময় কাটানো আসলেই কষ্টের। পাশে একটা মহিলা এসে জিজ্ঞেস করলেন,
-- তোমার হাসবেন্ডের কি হয়েছে?
-- আসলে.... ( আমি নিজেও জানি না)
   পানিশূন্যতার জন্য স্যালাইন চলছে।
   আর উনি আমার হাস....বেন্ড না, 
কথাটা বলার আগেই মহিলাটা তার বাচ্চাটা কান্না জুড়ে দিলো। উনি আর থামতে পারলেন না। পুরো কথাটা অপুর্ণই থেকে গেল।
  এই ফাঁকে আমি বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিধিকে ফোন দিয়ে চলে যেতে বললাম। বাইরে বেশ শীত। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। ফোনেও চার্জ কম। ফেইসবুকে যাবো সেই চার্জ টাও নাই। মিনিট দশেক পরে ওয়ার্ডে ব্যাক করলাম। এসে দেখলাম উনার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। আমাকে আসতে দেখেই প্রশ্ন করল,
-- আচ্ছা আমার চশমা টা কি কই?
-- ওইটা পড়ে গিয়ে একটা গ্লাস ভেঙ্গে গেছে।
-- ওহ। আপনি দুপুরে খাবেন না? আপনার তো
   মনে হয় অনেক ক্ষুধা লাগছে।
-- না না, একদমই না। (আমি আসলে
    হসপিটালে কিছুই খাব না সেজন্য বলতে
   পারছি না যে খুবই হাংরি )

আমরা দুজনেই চুপচাপ থাকলাম কিছুক্ষণ । উনি কাঁপতেছে ঠান্ডায় । দেখে বেশ খারাপ লাগলো। আমি যে চাদর টা পরে ছিলাম ওটাই দিয়ে বললাম, "আমি তো সোয়েটার পরে আছি, আপনি ইউজ করেন। আমার ওতটা ঠাণ্ডা লাগছে না" প্রথমে দ্বিধাবোধ করলেও নিতে বাধ্য হলো। এরই মধ্যে মাহি চলে আসলো। মাহির সাথে পরিচিত হলাম। 
-- আচ্ছা আমি তাহলে যাই। অনেকটা রাস্তা
  যেতে হবে। (আমি)
-- যদি কিছু মনে না করেন আপনার ফোন
   নাম্বার টা পেতে পারি?(তুর্য)
-- জ্বী।
মাহি আমাকে হসপিটালের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। বাসাই পৌছে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে আছি। কেন জানি আমার ক্ষুধা টা আর নাই। কিছুই ভালো লাগছে না। বারবার ওর কথা মনে পড়ছে। সে হয়তো ভুলেই গেছে আমি বলে কেউ ছিলাম।

রাত হয়ে গেল। নাম্বার টা নিলো, কই ফোন তো দিলো না। অনেক রকম ভাবনা ঘিরে নিলো। রাতে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। মশারি টানাতে হবে। এই কাজ টা নিতান্তই বিরক্তিকর। হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে উঠলো, আননোন নাম্বার। রিসিভ করে সালাম দিতেই ঐপাশ থেকে জিজ্ঞেস করলো,
-- ঘুমিয়ে গেছিলেন নাকি? (তুর্য)
-- না। কি অবস্থা এখন আপনার? (আমি)
-- আমি ঠিক আছি। আপনাকে আমার জন্য
   কষ্ট করতে হলো সারাদিন। টায়ার্ড অনেক?
-- না, তেমন একটা কষ্ট হয়নি।
-- ফ্রি থাকলে একটু কথা বলতে পারি?
-- জ্বী, ফ্রি আছি।
-- ডিনার শেষ? 
-- জ্বী।
-- বাসায় বকা খান নি তো, দেরি হয়েছে তাই?
-- না তেমন কিছু বলে নি মা।
-- আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি? আপনি কোন
   পারফিউম ইউজ করেন?
-- সানতুর। কেন?
-- চাদরের স্মেল, তাই আস্ক করলাম। 
আমি হাসলাম। 
কিছুক্ষণ গল্প করার পরে সে বলল
-- আমি যদি বাসাই গিয়ে ফোন দিই, রিসিভ 
   করবা?
-- ওকে। 
-- তুমি এত্ত চুপচাপ কেন? মনে হচ্ছে আমি
   একাই কথা বলছি। 
-- কই, আমি তো অনেক বকবক করি, আমি 
    আসলে কি বলবো বুঝছে পারছি না। 

তুর্য পরের দিন সুস্থ হয়ে বাসায় চলে গেল। রাতে ফোন দিল। অনেক গল্প করলাম যেন খুব চেনা মানুষের সাথে কথা বলছি। এভাবে কয়েকদিন কথা চলার পর একদিন আমরা মিট করলাম।  আমার স্বপ্নের মানুষটা আমাকে ডিরেক্ট বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলো। বলা হয়নি তুর্য আমার ক্রাশ ছিল। আমি ওর লিখার মারাত্মক লেভেলের ফ্যান ছিল। প্রত্যেকটা লিখা পড়তাম। একা একাই হাসতাম। ওকে দেখে অনেক সিরিয়াস টাইপ মনে হতো। ভয়ে কখনো মেসেজ করা হতো না। ব্যাপারটা নিজের কাছে অনেকটাই স্বপ্নের মতো লাগছিল। পারিবারিক ভাবে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের কিছুদিন পরে, একদিন সে হঠাৎ মজা করে বলছে, 
-- তোমার হাসবেন্ডের কি হয়ছে? ( হাসতে
   হাসতে) 
-- মানে কি? 
-- হসপিটালে একটা মহিলা তোমাকে প্রশ্ন
   করেছিল না?
-- ওহ আপনি তারমানে ঘুমের নাটক
   করছিলেন?
-- পাশে এত্ত কিউট একটা মেয়ে থাকলে ঘুমানো
   যাই নাকি?? 
-- ওরে। আমাকে বোকা বানানো।
-- আমি তোমার উত্তর টা জানার জন্য অপেক্ষা
   করছিলাম। সেদিনই তোমাকে দেখে বউ বউ
   ফিল হচ্ছিল।
-- আমার মোটেও বর বর ফিল হয় নাই। আমি
   তো আসলে ভাইয়া বলতে চাচ্ছিলাম।
-- উফ ! তোমার মতো ডাইনি বউ ঘরে ঘরে
  হোক। 
-- আমিন।
(সমাপ্তি)

গল্প: এক্সিডেন্টাল মিট
লেখনীতে-- নূর-এ সাবা জান্নাত

Comments