করিডোর
হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল নোমানের। বালিশের পাশ থেকে চশমাটা নিয়ে পরে নিলো। ফোন অন করে দেখলো, ঘড়িতে সময় ১টা বেজে ২৩ মিনিট।
নোমানদের পৈতৃক নিবাস বগুড়ায় তবে নোমানের আব্বুর চাকরির সুবাদে গত দুবছর ধরে তারা যশোরেই আছে। নোমানের মা গত হয়েছেন বছর সাতেক আগে। তারপর থেকে দাদি আর আব্বুকে নিয়েই নোমানের পরিবার। নোমানরা এই বাসায় এসেছে ওর আব্বু বান্দরবান যাবার পর। অফিসের কাজে গত পাঁচ মাস থেকে নোমানের আব্বু বান্দরবানে আছেন। আগের বাসাটা বেশি ভালো ছিল তবে ওখানে রুম renovate হচ্ছে বলে বাসা পাল্টাতে হয়েছে। এই জায়গাটা বেশি ভালে লাগে না নোমানের। শহর ছেড়ে বেশ ভেতরে নোমানদের বাসাটা। এলাকাটা খুব জংলা টাইপের।
চারিদিকে কেমন জানি গুমোট পরিবেশ। প্রথম প্রথম তো একদমই এখানে ভালো লাগতো না নোমানের।তবে কৌশিকদার সাথে পরিচয় হওয়ার পর বেশ ভালো লাগে। কৌশিকদা নোমানের খুব পছন্দের মানুষ। তবে কৌশিকদার সাথে বেশি আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়না নোমানের। সারাদিন কোথায় যে থাকে কৌশিকদা আল্লাহ মালুম।দিনে ওর টিকিটিও দেখা যায় না।দরজায়ও তালা দেওয়া থাকে। রাত ১০টার পর যখন আড্ডা জমে তখন নোমান বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেসও করেছে কৌশিকদাকে যে, সারাদিন ও কোথায় থাকে? কৌশিকদা এর উত্তর দেয়নি ঠিকভাবে। সে যাই হোক,কোনো ব্যক্তিগত কাজ থাকতেই পারে কৌশিকদার। নোমান আর মাথা ঘামায়নি। কৌশিকদার কাছ থেকে রোজ কত কি যে শেখে নোমান,তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কৌশিকদার সাথে রোজ আড্ডা হয় করিডোরের রেলিং-এ ঠেস দিয়ে। চমৎকার লাগে নোমানের কৌশিকদার সাথে আড্ডা দিতে কিন্তু বেশিক্ষণ আড্ডা দেওয়ার জো নেই, গুনে গুনে ২৫মিনিট পরই,
কৌশিকদা বলবেঃ এই নোমান ভেতরে যা, শুয়ে পর। রাত বাড়তে শুরু করেছে, বাকি আড্ডাটা কাল হবে। নোমানও লক্ষ্মী ছেলের মতো ঘরে চলে আসে।কৌশিকদার কথা কি ফেলা যায়?
এই বাসাটা চারতলা। নিচতলায় বাড়িওয়ালা থাকে, দোতলায় নোমানরা আর কৌশিকদা, তিনতলায় আরেকটা পরিবার থাকে।
নোমানের কানে আবার ভেসে আসলো রক্তহিম করা অদ্ভুত শব্দ গুলো। করিডোরে কারা যেন অনবরত ফিসফিসিয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে রোজই নোমান শুনতে পাচ্ছে খাপছাড়া শব্দগুলো। বের হয়ে দেখার সাহস নোমানের হয় না সচারাচর। একদিনই সাহস সঞ্চার করে দেখতে গেছিলো। সেদিনও অদ্ভত আওয়াজে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় নোমান সাহস করে সদর দরজা খুলে করিডোরে গিয়ে দেখে কৌশিকদা রেলিং-এ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে জোছনা দেখছে।
নোমানকে দেখেই বলে উঠলোঃ কি রে নোমান, তুই এতো রাতে এখানে কি করছিস?
নোমান সেদিন সত্যটা বলেনি কৌশিকদাকে।
নোমান হেসে বলেছিলঃ ঘুম আসছিল না গো। তাই ভাবলাম একটু হাঁটি। যাক ভালোই হলো তোমার দেখা পেয়ে গেলাম।
কৌশিকদা হঠাৎ ভ্রু- কুঁচকে বললঃ রাত বিরেতে এভাবে বের হবি না। জায়গাটা বেশি ভালো না। নোমাম কিছু বলার আগেই কৌশিকদা আবার প্রসঙ্গ পাল্টে বললঃ কি ব্যাপার রে নোমান? তোকে সেদিন রাস্তায় একটা মেয়ের সাথে ফুচকা খেতে দেখলাম। মেয়েটা কি তোর গার্লফ্রেন্ড নাকি??
নোমান লজ্জায় লাল হয়ে বলেছিলঃ যাহ! তুমি যে কি বলো না কৌশিকদা। তুমি বোধহয় প্রীতিকে দেখেছো। ও আমার খুব ভালো বন্ধু তবে তুমি যা ভাবছো তেমন কিছু না।
কৌশিকদা হেসে বলেছিলঃ ওহ আচ্ছা আচ্ছা! just friends তাই না?..তা প্রীতি কি জানে যে, তুই এখনো সারাদিন হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াস।
কথাটা বলেই কোশিকদা জোরে জোরে হাসতে শুরু করেছিল। হাসি আবার ছোঁয়াচে রোগ। কাউকে হাসতে দেখলে আপনা-আপনিই হাসি পেয়ে যায়। কৌশিকদাকে ওমন প্রাণ খুলে হাসতে দেখে নোমানও হাসিতে যোগ দিয়েছিল। কৌশিকদা হঠাৎ হাসি থামিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে ফেলেছিল। নোমানের মাথায় হাত বুলিয়ে গম্ভীর গলায় বলেছিলঃ শুতে যা। অনেক রাত হয়েছে। সকালে তো তোর আবার কলেজ আছে।
নোমান বলেছিলঃ তুমি শোবে না কৌশিকদা?
- না রে। এখন আর ঘুম আসবে। তুই যা। অত রাত জাগতে নেই।
নোমান ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিল।
করিডোর থেকে আসা শব্দগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। নোমান খুব অবাক হলো। এতো তাড়াতাড়ি তো বন্ধ হয়না অদ্ভুত শব্দগুলো। নোমান খাট থেকে নেমে স্যান্ডেল জোড়া পায়ে দিয়ে বের হয়ে এলো করিডোরে। আজও দেখলো সেই একই দৃশ্য। কৌশিকদা রেলিং এ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজ নোমানকে দেখে একটুও অবাক হয়নি কৌশিকদা।
.
কৌশিকদাকে দেখে নোমান বলে উঠলোঃ কি গো, কৌশিকদা ঘুমাওনি?
- আমার কথা ছাড়। তুই এখানে কেন?তাই বল।
- আসলে কৌশিকদা কয়েকদিন থেকেই মাঝরাতে করিডোর থেকে অদ্ভুত শব্দ আসছে। ওই শব্দেই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। কী করি বলো তো?
কৌশিকদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললঃ আমি ব্যাপারটা আগেই আন্দাজ করেছিলাম। তুই ভয় পাস না। ওসব খারাপ হাওয়া-বাতাসের কান্ডকারখানা। আমি ব্যবস্থা করেছি। ওসব আর শুনতে পাবি না। নোমান জায়গাটা বেশি ভালো না বুঝলি। যত তাড়াতাড়ি পারিস অন্য কোথাও চলে যা।
নোমান কৌশিকদার চোখে এই প্রথম ভয় দেখলো। নোমান কিছুটা ঘাবড়ে গেছে দেখে কৌশিকদা প্রসঙ্গ পাল্টে বললঃ uncle কবে আসবে রে?? ওনার সাথে তো দেখায় হয়নি।
- ওহ! আমি তো ভুলেই গেছিলাম তোমাকে বলতে। আব্বু দু-একদিনের মধ্যেই আসবে। আব্বুর নাকি বদলি হয়ে গেছে। আমাদেরকে নিয়ে ঢাকায় চলে যাবে। তোমাকে ছেড়ে যে, আমার যেতে মন চাইছে না গো কৌশিকদা।
কথাটা বলেই নোমান বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করলো। কৌশিকদা ওর চোখের জল মুছে দিয়ে বললঃ ধুর পাগল ছেলে,এভাবে কাঁদতে আছে? এটা তো ভালো খবর। এ জায়গাটা ছেড়ে চলে যাওয়াই ভালো। আর বাকি রইলো আমার কথা, হঠাৎ দেখবি! কোনো একদিন করিডোরে হাজির হয়ে যাবো আড্ডা দেওয়ার জন্য।
কৌশিকদা প্রসঙ্গ পাল্টে বললঃ নোমান, আমার সাথে একটা জায়গায় যাবি? বেশ কিছুদিন বলতে চাচ্ছিলাম তবে হয়ে উঠছিলো না। যাবি আজ??
নোমান মুচকি হেসে বললঃ চল যায়। এমনিও আজ আর ঘুম আসবে না।
নোমার আর কৌশিকদা বাসার পেছনের রাস্তাটা ধরে হাঁটতে শুরু করলো। রাস্তাটার চারিদিকে খুব জঙ্গল, বাড়িঘরও খুব কম। এদিকটাই নোমান আগে কখনো আসে নি। নোমান কৌশিকদাকে জিজ্ঞেস করলোঃ আমরা কোথায় যাচ্ছি কৌশিকদা??
- এই তো আরেকটু সামনে। চল গেলেই দেখতে পাবি।
তা তোর প্রীতি কেমন আছে?
নোমান মুচকি হেসে বললঃ আছে ভালোই।
- আমিও একজনকে খুব ভালোবাসতাম। ওকে একটু দেখার জন্য কত যে ক্লাস ফাঁকি দিয়েছি তার কোনো গন্তি নেই। ওর নাম ছিল সৌমিত্রা। দেখতে ঠিক যেন বনলতা সেন। মায়ায় ভরা দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েক যুগ অনায়াসেই পার করা যায় কিন্তু আমি ওকে কখনো মনের কথা জানাতেই পারিনি।
- সে এখন কোথায় কৌশিকদা??
কৌশিকদা অন্যমনস্ক হয়ে বললঃ জানি না রে।
কৌশিকদা ওর হাতের টর্চটা নোমানের হাতে দিয়ে বললঃ সোজা হাঁটতে থাক।জঙ্গলের রাস্তা তো,খুব সরু। দুজনে একসাথে হাঁটা অসুবিধা হবে। তুই টর্চটা নিয়ে আগে আগে হাঁট, আমি পিছনে হাঁটি।
নোমান বাধ্য ছেলের মতো হাঁটতে শুরু করলো। কৌশিকদাকে জ্বালানোর জন্য নোমান বললঃ আচ্ছা কৌশিকদা, তোমার সৌমিত্রার কোনো ছবি থাকলে দেখিয়ো তো। নাটোরের বনলতা সেনের কথা শুধু কবিতায় পড়েছি। কখনো দেখার সুযোগ হয়নি, তোমার কৃপা হলে ইচ্ছেটা পূরণ হয়ে যাবে। কি বলো কৌশিকদা? আছে নাকি ছবি??
নোমান কোনো উত্তর পেল না। নোমান ভাবলোঃ এই রে কৌশিকদা বোধহয় ক্ষেপেছে। নোমান আবার বললঃ কি গো বল, আছে নাকি ছবি??
এবারও কোনো উত্তর এলো না। নোমান হঠাৎ খেয়াল করলো, পেছনে কৌশিকদার হাঁটার শব্দটা আর পাওয়া যাচ্ছে না। নোমান ভয় পেয়ে হাঁটা থামিয়ে দিল। পেছন ঘুরে দেখল, পেছনে কৌশিকদা নেই। শুধু পেছনে নয়, আশেপাশে কোথাও কৌশিকদা নেই। এই নিরিবিলি জঙ্গলের ধারে নোমান একা দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে নোমানের বুক কেঁপে উঠলো। ভয়ের চোটে ওর গলা দিয়ে স্বরও বেরোচ্ছে না। পা দুটো জমে গেছে মাটিতে। কি করবে এখন সে?দৌড়ে পালাবে? নাকি কৌশিকদাকে খুঁজবে? ইতোমধ্যে অন্ধকার অনেকটা কাটতে শুধু করেছে। নোমান ফেরার পথে দৌড় দেবে এমন সময় টর্চের আলোয় কি একটা দেখে চোখ আটকে গেল নোমানের। টর্চের আলো অনুসরণ করে এগিয়ে গিয়ে নোমান যা দেখলো, তা দেখার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। গাছের গুড়ির আড়ালে পড়ে
আছে একটা আধপচা মৃতদেহ। নোমান চিৎকার দিয়েই জ্ঞান হারালো।
এদিকে সকালবেলা থেকে নোমানকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়েছে। নোমানের বাবাও সকালেই এসে পৌছেছেন। পুলিশেও খবর দেওয়া হয়েছে। সবাই মিলে খুঁজছে নোমানকে। প্রায় দুই-তিন ঘন্টা পর নোমানকে পাওয়া গেল অজ্ঞান অবস্থায় এলাকার শেষপ্রান্তের পরিত্যক্ত জঙ্গলে। তার পাশ থেকেই পুলিশ উদ্ধার করলো একটা অর্ধগলে যাওয়া মৃতদেহ।
তদন্তের পর জানা গেল, লাশটি কৌশিক মজুমদার নামের এক ছাত্রের।ছেলেটির বাড়ি নেত্রকোনায়।এখানে পড়াশোনা করতো। নোমানদের পাশের রুমটাতেই ভাড়া থাকতো কৌশিক। প্রায় ছয়মাস থেকে কৌশিক নিখোঁজ ছিল। ওর বাবা-মা থানায় জি.ডিও করেছিল কৌশিককে খুঁজে বের করার জন্য তবে পুলিশও ব্যাপারটাকে গুরুতর ভাবেনি। সবাই ভেবেছে, প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে নিজেই ফিরে আসবে। আজ প্রায় ছমাস পর পাওয়া গেল কৌশিক মজুমদারের লাশ। নেত্রকোনা থেকে তার বাবা-মাকেও খবর পাঠিয়ে আনা হয়েছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তাদের অবস্থা করুণ। মামলা তদন্তের পর জানা গেলঃ ভার্সিটিতে স্থানীয় ছেলেদের দূর্নীতি-অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল কৌশিক। তার ফলস্বরূপই সেই সন্ত্রাসী স্থানীয় ছেলেদের হাতে খুন হয় কৌশিক মজুমদার। কৌশিকের ইচ্ছা ছিল আইনজীবী হওয়ার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েই প্রাণ হারাতে হয়েছে কৌশিককে।.........
এদিকে নোমান মানতেই চাইছে না যে, তার কৌশিকদা ছমাস আগেই মারা গেছে। নোমান সবাইকে বোঝাতে চেয়েছে যে, সেদিন কৌশিকদায় তো তাকে নিয়ে গিয়েছিল ওই জঙ্গলের ধারে। কিন্তু নোমানের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। সবাই ভেবেছে নোমান ভয় পেয়ে উল্টাপাল্টা বলছে।
নোমানরা এখন ঢাকায় থাকে। দেখতে দেখতে দুটো বছর পার হয়ে গেছে। সবাই ভুলে গেছে কৌশিক মজুমদারকে। তবে, নোমান এখনও প্রতিরাতে করিডোরে অপেক্ষা করে কৌশিকদার জন্য। নোমানের দৃঢ় বিশ্বাস কৌশিকদা একদিন রাতে নিশ্চিত আসবে তার সাথে আড্ডা দিতে।.......
.
................সমাপ্ত..............
গল্পঃ করিডোর
গল্পের লেখিকাঃ নাবিহা নুপুর
Comments
Post a Comment