অভিসন্ধি
“আচ্ছা যারা বলে –আমি মরে গেলে সব কিছু সমাধান হয়ে যেত বা সব কিছু শান্তি হতো- সত্যি কি তারা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যায়? অথবা যারা কল্পনা করে আজন্ম পুষিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাসগুলো মুক্ত করে দিতে। তারা কি পারে? আমরা মানুষগুলাই ভুলে ভরা তাই না?
.
এই কথাটা শোনার জন্য আমি অপ্রস্তুত ছিলাম। ফারিয়া কেন এই কথাটা বললো তার একটা কারণ আছে। আর এই কারণটার জন্যই এত দুর আসা। কিন্তু এই টাইপের প্রারব্ধ বা অবসানের কথা বার্তা শুনলে আমার বুকের মধ্যে লাগে। আমি বললাম” আমি জানি তুমি খুবই শক্ত একটা মেয়ে। এতোটা বিধ্বস্ত কথা তোমার মুখে মানায় না।”
.
আমার কথা শুনে ফারিয়া হাসে তারপর চুল কানে গুজে বলে “একটা কথা কি জানো কাছের মানুষগুলোকে মাঝে মাঝে ভয় লাগে। তাদের তাচ্ছল্য, অবহেলা, অবজ্ঞা, অসমাদারতা সহ্য করা যায় না। আমার ভিতর যে অস্তিত্বটা সেটা অতি ক্ষুদ্র। আমাকে দেখলে স্বাভাবিক মনে হলেও আমি খুব স্বাভাবিক না। পরিস্থিতিটা এমন হয়েছে যে আমি এখন কারো উপর কোন কিছুর জন্য প্রত্যাশা রাখি না। উহু একদমি না। দিন যত যাবে বা এই যাওয়ার মাঝে যখন একাকীত্বটা দরজার ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ হয়ে আমাকে আলিঙ্গন করে জ্বালাবে পুড়াবে তখন ভীষন খারাপ লাগবে। প্রত্যেকটা বিষয় বা জিনিসের একটা নির্দিষ্ট কাজ থাকে। আর একাকীত্বের কাজই জ্বালানো পুড়ানো। তারা মানুষের অন্তরে বাস করে। যতই ভুলতে চাইবো বা মুছতে চাইবো মন থেকে কিন্তু মুছতেও পারবো না ভুলতেও পারবো না। তাই সে যত জ্বালাতে পারে জ্বলবো। কিন্তু নিজেকে বার বার বলা যাবে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বাক্যটার মাঝেই আমরা ভরসা পাই। বেঁচে থাকি, আকাশ দেখি, দেখি আকাশ থেকে ঝড়ে পড়া বৃষ্টি। কিন্তু আমার হেমন্ত পছন্দ। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা স্তম্ভিত হয় তখন। ধবধবে কাশফুল গুলো এক নতুন রুপ নেয়, রাতের মেঘমুক্ত জোৎস্না আর সকালের শিশিরস্নাত। আচ্ছা এই যে তোমার সাথে এতো গুজুরফুসুর করি, সব কিছু শেয়ার করি জানো নিজের ভিতর একটা প্রতিবিধান কাজ করে। আমি জানি তুমি এতে একটুও বিরক্তবোধ হও না। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় তোমাকে এতো কিছু কেন বলি? তবুও নির্লজ্জের মত আমার হৃদয়ের জলপ্রপাতগুলো প্রকাশ করি।”
.
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম “সত্য বলতে কি আমি সব সময় নিজেকে অসহায় ভাবতাম। ভাবতাম আমার বিষণ্নতার ঢেউ কখন আছড়ে পড়ে আমাকে অবক্ষয় করে দেয়। আর তার জন্যই আমি নিজেকে সব সময় কাজে ব্যস্ত রাখি। যেন ভিতরকার আক্ষেপগুলো ভেঙ্গে প্রজ্বালিত না হয়। কিন্তু ইদানিং তোমার কাছ থেকে আমি বিমর্ষতাপূর্ণ কথা হজম করছি। তখন মনে হয় আমার থেকেও তুমি অনেক হতোদ্যম। যা বলছি একটু বুঝতে চেষ্টা করো- আমাদের ভিতরটার মধ্যে মাঝে মাঝে অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার ঘটে। এই ভিতরের আকাশটা বদলে যায়। আর যখন বদলে যায় সব কিছু আউলাঝাউলা লাগে। আমি খুব দুস্তোষ্য ভাবে বিশ্বাস করি আমরা যাকে নিয়ে ভাবি, কল্পনা করি, যে ভাবনা বা কল্পনায় গুলো মহাকাব্যে পরিনিত হয়, একটা জগৎ তৈরি হয় সে মহাকাব্য আর জগৎতের মানুষটা আমাদের অন্তরে বাস করে। এই অন্তরটার মাঝে যখন ভিন্ন বা তৃতীয় কোন সত্তা প্রবেশ করে তখন এই ধরিত্রির মায়া ত্যাগ করতে ইচ্ছে জাগে। কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকতে হয়, শ্বাস নিতে হয়। এই যে আমাদের এই দুইটা চোখ দেখছো না? এতে চোখ ভরা পানি লুকায় থাকে, আর আড়াল করা পানির মাঝে কত না পাওয়া গল্প থাকে। আমরা কতজন্ এই আড়াল করা না পাওয়া গল্পগুলো প্রকাশ করি? তোমার একটা কথা ঠিক আমরা মানুষরা ভুলে ভরা। আমরা প্রতিনিয়ত ভুল করি আবার ঠিক করি। হাজার হাজার মিথ্যের আলো আমাদের মাথার চারপাশে ঘুরে। আমরা মিলিয়ে যাই জীবনের ছুটে যাওয়া মায়া এবং স্বপ্নের মাঝে। এই স্বপ্নটাও একটা মিথ্যা। কারণ যতক্ষন বাস্তব রুপ না নেয় ততক্ষন স্বপ্ন, স্বপ্নই থাকে। আমি প্রায় দিনই এই ব্যস্ত শহরে আমার ছোট্ট অস্থিত্বটাকে আড়াল করে রাখি। তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে, যতটা খারাপ লাগার কথা ঠিক ততটা লাগে না। তবে এসব কাহিনী আপাতত বাদ। আমরা যে কাজের জন্য এখানে আসছি সেটাতে আপাতত ফোকাস দাও।সারাদিন জার্নির মাঝে বেশ ধকল গিয়েছে। সকাল হলেই রিপোর্ট তৈরির কাজটা শেষ কের এখান থেকে যেতে পারলেই হলো।.
.
আমরা আসছি খুলনা জেলার, দিঘলিয়া উপজেলায়। এখানে আসার ইচ্ছাটা না থাকা স্বত্তেও ফারিয়ার অনুরোধে আসতে হয়েছে। এই দিঘলিয়া উপজেলায় লুবনা নামের একজন মেয়ে গতকাল সরাসরি লাইভে এসে কোন কিছু না বলে আত্মহত্যা করে।
.
আমি একজন ক্যামেরাম্যান। ফারিয়ার সাথেই কাজ করছি তিন বছর। প্রথম যেদিন ওর সাথে কাজে গিয়েছিলাম তখন আমাকে বলেছিল “আমি খুব প্যারা দেই। প্যারা খাওয়ার অভ্যাস না থাকলে অন্য রাস্তা দেখেন।” সেদিনের কথাটা সত্য। এমন একটা দিনও নাই এই মেয়ের সাথে একটা রিপোর্ট কভার করতে আমার মাথা নষ্ট হয় নাই। একটু চুল সামনে আসলে বা কথা বলার সময় একটু থেমে গেলে, শব্দ চয়ন সাজিয়ে বলার ধরণ যতক্ষন পর্যন্ত ওর কাছে পছন্দ না হবে ততক্ষন আমাকে অত্যাধিক পীড়া দিয়েছে। আমার বিরক্ত মুখ দেখেই বলতো “আপনারা ছেলেরা এতোটা অধৈর্য রাত শেষ না হতেই সকালের জন্য অস্থির হয়ে যান।এমন অধৈর্য ছেলেদের জীবনে বিয়ের পর অনেক শনি থাকে।” এই বিরক্তকর কাজটা হঠাৎ করে কেন এতো আপন করে গ্রহণ করলাম এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।
.
যাক সেসব কথা। ফারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে একটু ঝিম মেরে থেকে বললো “তোমার সাথে এটাই আমার লাস্ট কাজ। সাংসারিক খাতায় নাম লিখাবো। বিয়ের পর দেশের বাহিরে চলে যাবো। তোমার সাথে হয়তো আর তেমন একটা কথাই হবে না। আমরা মানুষরা পরিস্থিতির কারণে বদলে যেতে একটুও কার্পন্যবোধ করি না।একটা সত্য কথা বলবা? তুমি আমাকে পছন্দ করো এটা কি ঠিক?”
.
এই কথা গুলোর উত্তর দিতে কেন যেন ইচ্ছে করছে না। সব কথা বলতে নেই। মাঝে মাঝে অনেক কথা বুকের মাঝেই ধারণ করে রাখতে হয় যতনে স্বগোপনে। তাতে মনের আত্মাটা অপূর্ণতা থাকবে কিন্তু কাছের মানুষদের কাছে হিতৈষিতা হতে হবে না। আমি শুধু বললাম “আমাদের জীবনটা খুব ক্লান্তিহীন। এতে কবিতা, সারাংশ, সারমর্ম, ভাবসম্প্রসারণ, রচনা সবি থাকে। এই এতো কিছু থাকার পরও আমরা জীবন থেকে বেছে বেছে জ্বালানো পুড়ানো বিভ্রম বা অনুভূতি গুলো এপ্লিকেশন আকারে প্রকাশ করি। কিন্তু এর গাঢ়তা এতোই ছোট যে চোখ খোলার আগেই সব কিছু আঁধারে তলিয়ে যায়।
.
সকাল বেলা লুবনাদের বাড়িতে পৌছেই দেখলাম বাড়ির আশে পাশের অবস্থা থমথমে। বাড়ির কয়েকজনের সাথে কথা বলতে চাইলে কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি। যতটুকু জানলাম লুবনার বিয়ে ঠিক হয়েছিল বিশ দিন আগে। ফারিয়া আরেকজনকে জিজ্ঞেস করে বললো “আপনি তো লুবনার দাদা তাই না? আপনার সাথে একটু কথা বলা যাবে?” উনি হ্যাঁ সূচক ইশরা দেওয়াতে ফারিয়া বললো “আচ্ছা আমরা শুনেছি এবং যতটুকু জেনেছি লুবনা ভালো ছাত্রী ছিল। অনার্স শেষ করেছে এই বছরেই। পড়ালেখার পরই বিয়ে ঠিক করেছিলেন। আগামী শুক্রবারেই ওর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু না ছিল ওর রিলেশন আর না ছিল পারিবারিক ঝামেলা। এমনটা কেন করলো কিছু তো একটা ছিলো যার জন্য এইভাবে লাইভে এসে আত্মহত্যা করলো।” উনি একটু ঝিম মেরে থেকে কান্নার সুরে বললো “এইডা আত্মহত্যা না। আমার নাতনিডারে মাইরা ফেলাইসেনে। আমরা কেউ বুইঝেছিনাগো। এ ছেমড়ি এমন কইরবেনে বুইঝিনাই। সেইদিন রাইতে ভাত খাওয়ার পরে আমারে বইলছিলো “দাদা পান বানায় দিবোনে? আমি কইছিলাম নাতি বিবাহের পরে আমারে ভুইলে যাওয়া যাইবেনানে? তুর দাদি হইলো আমার প্রতথম লাভ আর তুই হইলি গিয়ে আমার দ্বিতীয় লাভ। বুইঝেছিস? আমি…”
.
তিনি কথা বলা শেষ না করতেই কাঁদতে থাকে। আমি ক্যামেরা ফোকাস করে রাখি। ফারিয়াও স্তব্দ হয়ে যায়। ক্যামেরা কাট করতে বলে ইশারা দিয়ে। কিন্তু আমার ইচ্ছা হচ্ছিলো না। আমি হাতের আঙ্গুলে ইশারা দিয়ে বুঝালাম চালিয়ে যাও। ফারিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরিবৃত হয়ে এবার আরেকজনের সাথে কথা বলতেই জানতে পারি এটা লুবনার বান্ধবী। সে জানায় “আমি কিভাবে বলবো বুঝতেছিনা। তবে বলাটা দরকার। লুবনার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। যেই ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার অনুরোধে সপ্তাহখানেক আগে লুবনার পরিবারের সম্মতিতে চুকনগরে ঘুরতে যায়। ওখান থেকে আসার তিন চারদিন পরই অন্য রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়। ছেলের পক্ষ থেকে নানা রকম খুত বের করতে থাকে লুবনার ব্যাপারে। যেটা অযোক্তিক। ছেলে বিয়ে করতে নারাজ হয়। লুবনা এই ব্যাপারে আমার সাথে কথা বললে জানতে পারি তারা শারিরিক সম্পর্কে গড়ায়। আমার বান্ধবীটা একটু বোকা ছিল। ও মনে করেছিল দুই দিন পরই বিয়ে কোন সমস্যা তৈরি হবে না। পরে আমি বিষয়টা ওর মাকে জানাই। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং বিচার চাই এই ছেলের। ওর কারণেই আমার বান্ধবী আত্মহত্যা করে। এই ছেলে পলাতক আছে। সরকারের কাছে অনুরোধ এই ছেলে এবং ছেলের পরিবারের সবাইকে আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার করা। যেন অন্যরা শিক্ষা নিতে পারে।”
.
ফারিয়া চুপ করে তাকিয়ে থাকে ক্যামেরার দিকে। আমি ফের তাকে ইশারা করি কিছু বলতে। সে ইতস্তততা এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো “কেন একটি হাস্যেজ্জ্বল এর সমাপ্তি এইভাবে হয়? কেন একজন মানুষ আত্মীয়-স্বজন এবং জীবনের মায়া ছেড়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়? বিশ্ব সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রতি বছরে বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। হেনস্থা, মানসিক চাপ, হতাশা, অবসাদ হচ্ছে এর পিছনের কারণ। আর এসব কারণের পিছনে কি বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে? কি গল্প লুকিয়ে থাকে? আমাদের কতজনের কাছে এই পিছনের গল্পগুলো সামনে আসে? এই কথা গুলো বলতে আমার নিজেরই এখন খুব অস্বস্থি লাগছে। আমরা আবেগপূর্ণ ভরা মানুষ, আমাদের মনে যখন হতাশাগ্রস্থ অনুভূতি ধারণ করে, তখন তারা ভাবে এবং দ্বিধায় পড়ে যায় বেঁচে থাকা এবং মৃত্যু নিয়ে। মৃত্যুই কোন সমাধান না এই বিষয়টা আমরা সবাই বুঝি এমনকি যে আত্মহত্যা করে সেও বুঝে। কিন্তু এই বাস্তবতার এই মরণ চিন্তাটা তার মাথায় গেথে যায়। আমার এখানে এসে এমন খারাপ লাগবে বুঝিনি। সতর্কহোন। জীবনে যা কিছু করবেন ভেবে চিন্তে করুন। ভাবুন খুব ঠান্ডা মাথায়।
.
ফারিয়া তাসনিম
ডি টিভি, খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা থেকে।
.
সাত দিন পর এক আশ্চর্য রকমের অনুভূতি আমাকে আকড়ে ধরে। আমি ওর ছবির আকাঁ বাকা চুল আর বড় বড় চোখ গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি।বার বার দেখতে থাকি তার একেকটা ভিডিওর কথা গুলো। ও যখন কথা বলে আর কথা বলার সময় একটু পর পর চুল কানে গুজে এই সামন্য ব্যাপারটা যে এতো অসাধারন লাগে তখন আমার মনে হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে জটিল সমস্যা আমার মত নির্বাক প্রেমিকদের। যারা বলতে পারে না, চাইতে পারে না, শুধু পাথর হয়ে জোৎস্না আঁকে নিজস্ব ছায়ার অন্তরালে। আচ্ছা আমার কি তাকে বলাটা জরুরী তোমাকে আমি পছ্ন্দ করি? কিন্তু আমি ভাবি চোখ ভরা শুন্যতার কথা। যেখানে ভালোবাসা বলাটা জরুরী না। ভালোবাসাটা নিজের মাঝে যতনে পুষিয়ে রাখতে হয়। তাতে ভালোবাসার মানুষটা না পাবে দেখতে আর না পাবে বুঝতে, যে তাকে গোপনে একজন স্বযতনে ছোট্ট চারা গাছটার মত ভালোবেসে যায়। বিশ্বাস করুন এই চারা গাছটাকে যেমন খুব কাছ থেকে দেখা যায়, যত্ন করা যায়, চোখে চোখে তার মাধুর্যতা গভীর শ্বাস নিয়ে অন্তরে ঠাই দেওয়া যায় তাতে মনটা তৃপ্তি পায় ঠিক তেমন ভালোবাসাটা বেঁচে থাকে। আমি জানি ফারিয়া একজনকে পছন্দ করে। পছ্ন্দ না, ভালোবাসা। আর ভালোবাসাটাকে একটা পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই তারা একটা নতুন স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছে আগামী সোমবারে। বিয়ের পরেই পারি দিবে কানাডায়।
.
আজকে বিকেলে যখন দেখা হলো। তখন আমাকে বললো “আমি কিন্তু সেদিনের উত্তরটা পাইনি। তুমি কি আমাকে পছন্দ করো? আমি যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই আমার তখন খুব অস্বস্থি হয়। আগে এমন হতো না। আমার মনে হয় আমাকে কেউ একজন গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখে। আমি তখন ঠিক ভাবে কাজ করতে পারি না, ভালো ভাবে বলতে পারি না ক্যামেরার সামনে। তুমি আমার ছবি আর ভিডিও গুলো খুব যত্ন সহকারে দেখো তাই না?” আমি একটু অবাক হলাম। পরিস্থিতিটা এমন হলো আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। তবু একটু হেসে বললাম “আসলে তেমন কিছু না। যত্ন সহকারে তো দেখতেই হয় সব কিছু ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা। তুমিই তো প্রায় বলো সব কাজই যত্ন আর মনোযোগ দিয়ে করতে। যে কাজ মনোযোগ আর ভালোবাসা দিয়ে করা হয় সে কাজটা পারফেক্ট হয়।”
.
ফারিয়া দীর্ঘশ্বাস নেয়। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে বলে “আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো। পৃথিবীতে অনেক আবেগ আছে, অনুভূতি আছে। অনেক কিছুই আমরা দেখি আবার দেখিনা, বুঝি আবার বুঝতে চেষ্টা করি না। এটা বুঝতে পারছি তুমি কষ্ট পাবে কোন এক না বলা গল্পের জন্য। কিন্তু তুমি একটা ভালো কাজ করেছো এই না বলা গল্পটা নিজের মাঝেই ধারন করে বা প্রকাশ না করে। তবে ব্যাপারটা আমি বুঝতে পেরিছি অনেক আগে একটু অদ্ভুত হলেও সত্য। তবে জানো এই না বলা গল্পটা তোমার না। অন্যজনের।
.
এটা বলেই এবার মাথা তুলে আমার দিকে তাকায়। আমার উঠে আসতে মন চাইছিলো। আমার খুব একা থাকা দরকার ছিলো। আমার ইচ্ছা হয় ওর সাথে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে গল্প করতে। মাঝে মাঝে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকতে। কিন্তু এটা খুব জঘন্য একটা ব্যাপার। যে মানুষটা আমার না তাকে এইভাবে নিজের মাঝে আঁকতে চাঁচল্যকর লাগে। এই অধিকার তো আমি রাখি না। আসলে রাখি না। কিন্তু আমার উদ্বিগ্ন মনটাকে বুঝাতে পারতাম না। আমাকে বললো “কষ্ট তোমাকে ছুয়ে দিবে আমি জানি। এসব ভাবতেই তোমার জন্য মন খারাপ লাগে। একটা কাজ করো আমার সাথে সব যোগাযোগ থেকে ব্লক/বিচ্ছিন্ন করে দাও। আমার বিয়েতে আসবা না। এতে কষ্ট ওতো বেশি ঝেকে ধরবে না। জানোই তো আমাদের মনটা শান্ত নদীর মতো। একটু পর পর শ্রোতগুলো নদীর পাড় ছুয়ে যায়। কষ্টটাও এমন যত মায়া ধরে বসবে তত কষ্ট গুলো তোমাকে ছুয়ে যাবে। যাই, ভালো থাকো। নিজের যত্ন নিও। পারলে এগুলো মন থেকে মুছে ফেলো।”
.
পরবর্তী দুইটা বছর আমার কেটে গেছে। ফেলে আসা এই দুইটা বছর আমি ফারিয়ার কথা ভেবেই পার করেছি। তাতে আমি হারিয়েছি। তার সাথে আমার যে চমৎকার স্মৃতিগুলো ছিলো, সময় গুলো ছিলো সেগুলো মনে করেছি। প্রত্যেকটা মানুষের অন্তরে এমন কেউ একজন থাকে যাকে নিয়ে সারাটা জীবন ভাবা যায়। ভুলে ভরা গল্পগুলোও আকাশের অনেক কাছে এসে দীর্ঘরাতে তাকে মনে করিয়ে দিয়ে যায়। ওর কথাটা সত্য আমরা মানুষেরা আসলেই ভুলে ভরা।
.
রাত এখন এগোরোটা বেজে পনেরো মিনিট। রাস্তার টঙ্গে বসে রিয়াদ আমার পাশে সিগারেট ফুকে ছেড়ে দিয়ে বললো “মাঝে মাঝে মেজাজ খুব খারাপ হয়। শালার এই চাকরি বাকরি আর ভালো লাগে না। যে কাজ করে শান্তি পাই না, সেই কাজ করে মজা আছে? শোভন এই চাকরি জীবনে আমরা হলাম একটা গোলাম। আজকে মিটিং এ কি এমন বেইজ্জতটা করছে দেখছোস? আরে শালা একটা রিপোর্ট তৈরি করতে ভুল হইছে, তুই যা বলার তোর রুমে ডাইকা নিয়া কিছু বলার থাকলে বল। কিন্তু সবার সামনে “আমার মনোযোগ কাজে নাই, একটা কাজ দিলে ঠিক করে করতে পারি না। এরকম হলে চাকরি ছেড়ে দেন। দুষ্টু গরু থেকে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো।” এইটা বলতে পারলো? এই গুলো বললে মান সম্মান কিছু থাকে? সব শালারা এক একটা বান্দিরপুত। কে কেমন কাজ করে আর সময় পার করে আমি দেখিনা।?” এই ব্যাপারে আমি কিছু বলি না। শুধু বললাম “যাইরে বাসা থেকে ফোন দিতেছে।” রিয়াদ বললো “ও বউ এর ডাক পরছে। যা যা। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও। ঘরের মানুষটা মনে হয় অপেক্ষায় আছে।”
.
কোন প্রত্যুত্তর না দিয়ে আমি বাসায় যাই। আমার ক্ষুদ্র জীবনের অভিসন্ধির মাঝে জীবন থেকে কাউকে হারিয়ে ফেলার চিত্রকল্পটা অসমাপ্ত হয়ে সেখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু আমার জীবনের অভিসন্ধির গল্পটা অন্যভাবে রুপ নেয়। বাবা মায়ের পছন্দ করা জেরিন নামের মায়া মায়া চোখের মেয়েটার সাথে গত চারমাস আগে আমার বিয়ে হয়। যখন খুব জ্বালাপোড়া হয়, পুরানো ভাবনাগুলো ভাবি তখন একরাশ হাহাকার এসে বুঝিয়ে দিয়ে যায় এই অগোছালো জীবনের কথা। ঠিক তখন জেরিন আমার মন ভালো করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমার এসব ভালো লাগে না। মনে হয় একটু বেশি আদিখ্যেতা।
.
দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই আমার কাছ থেকে কাধের ব্যাগটা নেওয়ার পর দরজাটা লাগিয়ে বললো “আজকে কি বেশি কাজ ছিলো” আমি চেয়ারে বসে গ্লাসে পানি ঢেলে এক গ্লাস পানি খাই। আমার কোন প্রতিভাষ না পেয়ে বললো “কয়েকবার ফোন দিয়েছিলাম। রিসিভ করেননি। একটু চিন্তা হচ্ছিলো।” আমি বললাম “আশে পাশে অনেক লোকজন ছিলো। তাছাড়া চিন্তার কি আছে? চারপাশ এতো অশান্ত যে আমার নিজেকে এখন শান্ত রাখতে ভালো লাগে।” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে “অহ” এইটুকু বলেই বললো “পোশাক চেঞ্জ করে আসেন খাবার খেয়ে নিবেন।” আমি বললাম “আজকে আমি বাহির থেকে খেয়ে আসছি। স্যরি তোমাকে বলা হয়নি।”
.
রাতের আকাশটার নিচে মাঝ রাতে বারান্দায় চুপ করে একা একা বসে ছিলাম। তখন রাত দুইটা। এমন সময় জেরিন কাছে এসে বললো “ঘুম ভেঙ্গে গেছে? এখানে বসে আছেন কেন খারাপ লাগছে?” আমি তার দিকে তাকাই। তারপর আকাশটার দিকে তাকিয়ে বলি “আমার হৃদয়ের আক্ষেপ গুলো এতো অবিস্তীর্ণ যে আকাশটার মাঝে মেলে ধরতে লজ্জা লাগে। তখন ভাবি ভালোবাসা ব্যাপারটা জীবত। এটা কখনো শেষ হয় না। চোখ বুঝলেই অশান্তি লাগে। তখন কি ঘুম আসে?” জেরিন বসা থেকে উঠে যায়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। ভাবি মেয়েটার সাথে এইরকম বলা মানায়নি। কিন্তু এর একটু পরই সে একটা বই নিয়ে এসে পাশে বসে বললো “একাকীত্ব আর আমাদের জীবনের দুর্বিপাক গুলো একটু সুযোগ পেলেই স্পর্শ করতে চায়। মানুষের মনে ভালোবাসাটা যখন স্পর্শ করে তখন ভেতরটা বদলে যায়। এতোটাই বদলে যায় যে, চারপাশের সব কিছুর থেকেও এই ভালোবাসার মায়া তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তখন চারপাশ রঙ্গিন হয়, অপূর্ণতা গুলো মহাকাব্যে রুপ নেয়। কিন্তু আমরা কেউ কেউ ভুলে যাই সমাজ বা পরিবারের কারণে কিংবা সেই ভালোবাসার মাঝে অতৃতীয় কেউ অবস্থান করলে বা দুইটা মন একে অপরের প্রতি সমভাবাপন্ন না হলে সেটা হতাশার মাঝে রুপ নেয়। তখন শুরু হয় হাহাকার। এক বুক ভরা অবসাদ। কিন্তু আপনি তো একা নন। এই যে আমি আছি, বাবা আছে মা আছে। আমি জানি আপনার এই হাহাকার গুলো কি। দেখবেন একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। এই আস্থাটুকু আমার উপর রাখুন। আমি আপনাকে ঠিক করে নিব। এবার আমার মায়া মায়া চোখ গুলোর দিকে তাকিয়ে মন দিয়ে শোনেন হ্যাঁ, দেখুন কেমন লাগে। জীবনানন্দ দাশের কবিতা…
.
একদিন খুঁজেছিনু যারে
বকের পাখার ভিড়ে বাদলের গোধূলি-আঁধারে,
মালতীলতার বনে,- কদমের তলে,
নিঝুম ঘুমের ঘাটে,-কেয়াফুল,- শেফালীর দলে!
-যাহারে খুঁজিয়াছিনু মাঠে মাঠে শরতের ভোরে…
.
জেরিনের সাথে আমার সংসারটা এমনই চলছে। প্রায় সময় আমি ঘুমিয়ে গেলে ও ওর মায়া মায়া চোখ গুলো দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেদিন বাসায় থাকি সারাদিন আমার চারপাশ ঘুর ঘুর করে। চোখে কাজল আঁকে। এটা ওটা রান্না করে। নিজেকে মেলে ধরে এক রুপকথার রুপকুমারী হয়ে তার বিশুদ্ধতা প্রকাশ করতে। কিন্তু আমার কোন মায়া জন্ম হয় না। কোন ভালোবাসা তৈরি হয় না। কারণ আমার ছন্নছড়া অস্থিত্বটার মাঝে একজনকে এতোটাই নির্বাক হয়ে চেয়েছি এই ভালোবাসার মাঝে অন্য ভালোবাসা ছেদ করে আমাকে আঁকতে পারে না।
.
আমি বললাম “আমার ভিতর যে আত্মাটা আছে, ওটা খুব ছোট, তাতে কোন রঙবিশিষ্ট প্রজাপ্রতি এসে বসলে খারাপ লাগে। মনে হয় আমার ভিতরে পুষিয়ে রাখা যন্ত্রনাগুলোর গন্ধটাও তার মাঝে মিশ্রিত হবে। তুমি আমার প্রতি ভাবপ্রবণতা না দেখালে খুশি হবো।”
.
মন খারাপ করে অফিসে আমার জর্জর রুমে বসে ক্যামেরাটার দিকে তাকিয়ে থাকি। কত ভিডিও রেকর্ড আর ছবি তুলেছি এইটা দিয়ে এইগুলো ভাবতেই কেমন একটু অদ্ভুত লাগে। এখন আর এসব কাজ করি না। অফিসেই বসে প্রশাসন বিভাগের কাজ গুলো দেখি। ক্যামেরার কাজটা ছেড়েছি ফারিয়া যাবার এক বছর পরই। রিয়াদ জানে আমি ফারিয়াকে কতটা চাইতাম। অফিসের সব কিছুই আমি রিয়াদের কাছে শেয়ার করি। এই ছেলেটা এতোটা ভালো আর কাজের প্রতি আন্তরিক ওর থেকেই আমি অনেক কিছু শিখেছি বুঝেছি। কিন্তু মাঝে মাঝে একটু আউলাঝাউলা হয়ে যায়। এই আউলাঝাউলা হওয়ার কারণ অবশ্য নাদিয়া। আমি বুঝিনা এই হৈচৈপূর্ণটাইপ ওর চেয়ে দশ বছরের ছোট মেয়ের সাথে ও কিভাবে প্রেমে জড়ালো। ও ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংরেজীতে অনার্স করছে। একদিন দেখলাম ওর সাথে নাদিয়া অমার্জিত হয়ে বলছে “তুমি আমায় বুঝো? কি পরিমাণ প্যারায় আছি। পড়ার এতোটা চাপ যাচ্ছে আমার উপর। আর কি বললে রাতে? নেটে থেকেও তোমার রিপ্লে দেই না। নেটে কি শুধু চ্যাট করতে আসি? আমার অন্য কোন কাজ নেই? আমি এমোনি। তোমার এতো প্রবলেম হলে আমাকে আনফ্রেন্ড করো। ব্লক করো। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করো।”
রিয়াদ ইতস্ততাবোধ করে বললো “আমার চাওয়াটা খুব সিমীত। তাতেই আমি মিলিয়ে যাই।তোমার সাথে আমার তেমন একটা কথাই হয় না। কারণ তোমার বাসায় প্রবলেম। বাসায় কথা বলতে পারো না। বাহিরে বা ইউনিভার্সিটিতে যখন ফ্রেন্ডদের সাথে থাকো তখনও কথা বলতে পারো না। যতক্ষন তুমি আমাকে ফোন না করো বা অনলাইনে নক না দেও ততক্ষন আমি তোমার সাথে কথা বলতে পারি না। ফোন করতে পারি না। তাই যখনি ফোন দাও বা নক দাও তখন কলিজাটা নাড়া দিয়ে উঠে। আবার যেখানে যাও বা কোন প্রোগ্রাম থাকলে আমাকে যদি বলা হয় তখন আমার কাছে মনে হয় আমি তার মাথার উপর একটা ছায়া, ভালোবাসা, সে আমাকে অবগত করে। কিন্তু কোথায় যাও, বা কি করো আমি এর কিছুই অবগত হতে পারি না। প্রতিটা পুরুষ চায় তার ভালোবাসার মানুষ তাকে বলুক সব কিছু বলুক। এতে গুরুত্বটা বাড়ে, আস্থাটুকু বাড়ে, ভালোবাসা বাড়ে। কিন্তু এই অধিকারটুকু আমি চাইতে পারি না। আমি আকুল হয়ে থাকি তোমার সাথে কথা বলার জন্য, তোমার হাসিটা শোনার জন্য। এই আকুল হয়ে অপেক্ষা করাটা আমার বিভ্রম আমার অসমান্য প্রণয়লীলা আমার ভালোবাসা। এই ভালোবাসাটা আমার কাছে অনেক দামী।
.
নাদিয়া চলে গিয়েছিল। একটা সময় জানতে পারি। নাদিয়া আর রিয়াদের দুরত্ব তৈরি হয়েছিল। এই দুরত্বটা নাদিয়াই তৈরি করেছিল। দশ দিন, বিশ দিন, বা কখনো কখনো একমাস, দুই মাস পর পর একটু ফোন দিত। আর এভাবে দুরত্বটা আরো বাড়তে থাকতে। এই দুরত্বটা এতোটাই বেড়ে যায় সেখানে ভালোবাসাটা তলিয়ে যায় কোন পুরানো খাতায়। শুধু মনে পড়লেই বুকটা ছ্যাত করে উঠে।
.
রিয়াদ আমাকে বলে “ক্যামেরার দিকে তাকাইয়া তাকাইয়া কি ভাবোস এতো” আমি না কিছুনা এই টাইপের ইশারা দিয়ে বুঝিয়ে দেই। তারপর কাছে এসে বললো “গতপরশু আমাকে ফারিয়া ফোন দিছিলো। তোর কথা জানতে চাইছে। তোর সাথে কথা বলতে চাইছিলো। বিয়ে করছিস এটা জানে না। কিন্তু আমি বিষয়টা বলাতে অহ আচ্ছা বলে কথার প্রসঙ্গ বদলে ফোনটা রেখে দিছে।” আমি ভাবি বিষয় গুলো কি অদ্ভুত। কি ভয়ানক অথচ এইগুলা শুনলে মনের ভিতর কেমন একটা প্রগাঢ় অনুভূতি তৈরি হয়। যে অনুভূতির কোন নাম নেই, কোন অনুরাগ নেই, নেই কোন প্রবলতা।
.
প্রায় দিনের মত আমি আজকেও রাতে দেরি করে ফিরেছি। দরজা খুলতেই জেরিন প্রতিদিনের মত ব্যাগ কাধ থেকে নিয়ে রেখে দেয়। কিন্তু আমি একটু অবাক হলাম “দেখলাম ও আমার টি শার্ট পরে আছে। বললাম “এই টি শার্ট কেন পরেছো?” ও নিচের দিকে তাকিয়ে বললো “পরাটা নিশ্চয় উচিৎ হয়নি। কিন্তু আপনার খুব কাছে থাকতে ইচ্ছে করছিলো। তাই এটা পরেছি। এটা যখন পরেছি তখন থেকেই মনে হচ্ছে আপনি আমার খুব কাছে। আবার মনে হচ্ছে একজন বাষ্পপ্রদাহ আমাকে এমন ভাবে আকড়ে ধরেছে যেন সে চাইলেও আমি দুরে যেতে পারবো না। হারিয়ে যেতে পারবো না। কিন্তু আবার এটাও মনে হচ্ছে যে এই যে টি শার্টটা নিজের মাঝে ঝড়িয়েছি সেখানের মাঝে হতাশা, অবসাদ, ভগ্নহৃদয় সব একত্রি হয়ে আছে। একটা মানুষের মাঝে এতো কিছু থাকা কি মানায়?” এই কথাগুলোর কি উত্তর দেওয়া যায় আমি ভাবছিলাম। ও যখন মাথা তুলে আমার দিকে তাকালো আমি শুধু দেখলাম ওর শান্ত শান্ত চোখ গুলো। কিন্তু আমি একটা বিরক্তি নিয়ে বললাম “এই মায়া জিনিস গুলো না দেখালে হয় না? আমার কাছে বিরক্ত লাগে। দুঃখ লাগে। আমি জাস্ট বাবা মায়ের অনুরোধে তোমায় বিয়ে করেছি। আর কিছুই না। অফিস থেকে এক সপ্তাহ ছুটি নিয়েছি। নিজের মত একটু থাকবো। আমাকে শান্তি দাও। একা থাকতে দাও।
.
সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গলে আম্মা এসে বলে গেলো “সকাল সকাল বউ হুট করে তার বাবার বাড়ি গেছে। বলছে এক সপ্তাহ পরে আসবে। তার মাকে নাকি স্বপ্নে দেখছে। শরীর ভালো না। তোরে বলে যেতে চাইছিলো কিন্তু তোর ঘুম নষ্ট হবে বলে আর ডাক দেয়নি।” আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মনে মনে ভাবলাম অন্তত এই এক সপ্তাহ আমাকে এতো কিছু ভাবতে হবে না। নিজের মত একটু থাকতে পারবো।
.
প্রথম দিন আমি আমার মতই সময় কাটালাম। রাতে অনেক বৃষ্টি হলো। আমি যেই আম্মাকে বলতে গেলাম ডিম ভাজি আর খিচুড়ি করতে কিন্তু গিয়ে দেখলাম আম্মা নামাজ পড়ছে। তাই নিজে নিজেই ইউটিউব দেখে রান্না করে খেলাম এবং নিজেরে নিজেকে একটা এক্সিলেন্ট দিয়ে বললাম “জীবনে মাঝে মাঝে এই ভাবে থাকা প্রয়োজন। তাতে নিজেকে চেনা যায়, নিজের ভিতরের প্রতিভাটা বুঝা যায়।
.
তবে দ্বিতীয় দিন থেকে আমি একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করলাম। ঘুম থেকে উঠে ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি বেলা এগোরোটা বাজে। আমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে ডাক দিয়ে বললাম “জেরিন ঐ যে গত পরশু জলপাই কালারের একটা শার্ট আলমেরিতে রাখছো না ওটা দাও তো। একটু বাহিরে বের হবো।” কিন্তু কোন সাড়া পেলাম না। আবার যখন ডাকতে যাবো ঠিক তখন মনে হলো ওর যাওয়ার ব্যাপারটা। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজের কাজ নিজেই করে নিলাম।
.
সন্ধ্যার নাগাত বাসায় ফিরে রুমে ঢুকেই ফ্রেশ না হয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে শুতেই ডাক দিয়ে বললাম “জেরিন এক গ্লাস লেবুর শরবত করে দিবা, যেটা অফিস থেকে আসলেই দাও। আমার একটু ক্লান্ত লাগতেছে। অনেক হাটছি আজকে।” কোন সাড়া নেই। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বিছানায় শুয়ে থাকি।
.
এই ভাবে আমার চারটা দিন পার হয়। আমি বুঝতে পারছিলাম আরেকটা নিঃসঙ্গতার কথা।মাথায় খুব যন্ত্রনা হয়। কিছু খেতে ইচ্ছে হয় না। চারপাশে কেমন হলুদ হলুদ দেখছিলাম। আমি একটু শান্ত হতে চাচ্ছিলাম নিজেকে সময় দিয়ে কিন্তু এই চারটা দিন আমার মনের ভিতর সব উলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে। আমি উপলব্দি করলাম আমার ভিতর খুব অশান্ত মানুষ বাস করছে। আমার কিছুই ভালো লাগছে না। অস্থির অস্থির লাগছে। এতোটা উৎকট আমাকে আর মনে হয়নি। আমি বারান্দা থেকে ডাক দিয়ে বললাম “জেরিন একটু আসবা, একটু কবিতা শোনাবা? আমার খারাপ লাগলে তুমি যখন কবিতা শোনাও নিজেকে একটু শান্ত মনে হয়। একটু কবিতা শোনাবা?” কিন্তু আমি এবারো কোন সাড়া শব্দ পেলাম না। আমি আবার ডাক দিতে যাবো মনে পড়লো তার না থাকার কথা। আমার মাথাটা আরো ভাড়ি হয়ে যায়।
.
এরপরের দিনই আমি অফিসে চলে যাই। যদিও এক সপ্তাহ ছুটি নিয়েছিলাম কিন্তু বাসায় এই রকম থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম।কিন্তু সন্ধ্যায় ঘটলো আরেক ঘটনা। বাসায় পৌছালে দরজা খুলতেই বললাম “ব্যাগটা ধরো।” কিন্তু দিতে গিয়ে দেখলাম আব্বা দরজাটা খুলছে। আমি থতমত খেয়ে বুঝলাম জেরিন তো নেই। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। হয়ে যাচ্ছিলাম বিকৃতমস্তিস্ক।
.
এক সপ্তাহ কেমন করে যেন কেটে গেলো। অফিস থেকে বাসায় ফিরে গিয়ে দরজা খুলেই দেখি জেরিন। আমি হা করে তাকিয়ে থাকলাম। সে কিছু না বলেই ব্যাগটা নিয়ে দরজাটা লাগিয়ে খুব গম্ভীর হয়ে বললো “আপনার দিন গুলো নিশ্চয় ভালো কেটেছে। নিজের মত একা থেকেছেন। আমি কিন্তু আপনাকে ডিস্টার্ব করিনি। যদিও আম্মার থেকে সব সময় খবর নিয়েছি। ভালো করেছি না?” আমার অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছিলো। বলতে ইচ্ছে করছিল এই সাতটা দিন আমি কত ক্ষত বিক্ষত হয়েছি ভিতরে ভিতরে আমি জানি আর আমার এক আল্লাহ জানে। কোন একজনের অনুপস্থিতিটা এতোটা অসরাতা লাগবে সেটা এর আগে বুঝতে পারিনি। কিন্তু আমি কিছুন না বলে শুধু ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার তাকানো দেখে সে বললো “আমাকে দেখে ঘাবড়ে গেছেন তাই না? মনে মনে হয়তো বলছেন এই ঝামেলা আবার কেন আসলো। ভালোই তো ছিলাম।” টেনশন নিয়েন না। আপনাকে ওমন করে বিরক্তও করবো না। আপনার আশে পাশে ঘুর ঘুরও করবো না। তেমন কোন চাওয়া পাওয়া থাকবে না। যান ফ্রেশ হয়ে নেন।” ও ভিতরে চলে যাচ্ছিলো। আমি খুব ইতস্তত হয়ে বললাম “আমি খুব সাধারণ একটা ছেলে। আমি শুধু নিজেকে নিয়ে ভেবেছি, নিজেকে নিয়ে ব্যাস্ত রেখেছি।কিন্তু আশেপাশের আবেগপ্রবণ বা স্নেহপূর্ণ কাউকে নিয়ে ভাবিনি। ভাবতে চাইনি। দেখেও বুঝেও দুরে দুরে থেকেছি। কিন্তু এই সাতটা দিন আমি এতোটাই আত্মহারা হয়েছি নিজের প্রতি খুব অনাদেয় লেগেছে। আমি বার বার একটা শূন্যতা অনুভব করেছি। আমার মনেই হয়নি তুমি চলে গেছো। কিন্তু আমার চোখ দুটো যখন তোমার উপস্থিতিটা টের পেতো না, আমি ছন্নছাড়া হয়ে যেতাম।”
.
জেরিন আমার দিকে ফিরে তাকায়। আমি আবার বললাম “আমি জানি না আমি কিভাবে বলবো তবু বলতে চাচ্ছি আমার ভীষন একা লেগেছে তোমার অনুপস্থিতিটা।” আমার কথা শুনে জেরিন ছলোছলো চোখে আমার চোখের দিকে তাকায়। তারপর বলে “আপনার মুখে এই কথা মানায় না। একটা বারো আমার খোঁজ নিয়েছেন? আমি মরে গেছি নাকি বেঁচে আছি? কি মনে করেছেন আপনার এমন করে চলা আমি জানি না? বুঝি না? দিনের পর দিন আপনার এতো লাঞ্ছনা সহ্য করে আপনার আশে পাশেই থেকেছি। প্রায় রাতে লেইট করে বাসায় ফিরেছেন। আমি না খেয়ে আপনার সাথে খাব বলে অপেক্ষা করতাম। কিন্তু আপনি?একবারো আমাকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন? বলেন করেছেন? বলেন?” এইটুকু বলে একটা শ্বাস নিয়ে আবার বললো “আমি কি বোকা দেখুন না। আপনার ব্যাপারে সব কিছু জেনেও বিয়ে করেছি। আমি সব সময় ভেবেছি আমি আপনাকে ঠিক করে নিব। আপনাকে এই জরাজীর্ন থেকে বের করে নিয়ে আসবো। কিন্তু আমি আপনার থেকে কোন মূল্যায়ন পাইনি।একটা কথা জানেনই তো কাছের মানুষগুলোর তাচ্ছল্য, অবহেলা, অবজ্ঞা, অসমাদারতা সহ্য করা যায় না।” আমি এই কথা গুলোর উত্তর দিতে পারি না। এই কথাটা ফারিয়াও বলছিলো। আমি শুধু বললাম “আমার মাথা ও মন দুটোই এলোমেলো হয়ে আছে। অশান্ত লাগছে। দয়ে করে একটা কবিতা শোনাবা? একটু শান্তি লাগে তোমার কাছ থেকে কবিতা নিজের মাঝে নিলে।” জেরিন একপলক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কাদঁতে থাকে। কান্না করে আমার কাছে আসে। কান্না মাখা মুখেই বললো “জড়িয়ে ধরেন।” আমার আর ওতো কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না। আমি তাকে জড়িয়ে নিলাম। যখন নিলাম। তখন মনে হলো বুকের মধ্যে শান্ত একটা বহমান নদী বয়ে গেছে। যে নদীর বুকে আমি একটা পালতোলা নৌকা হয়ে মিশে আছি। আমি বললাম কোথাও হারিয়ে যেও না। যতদিন নিশ্বাস নিব ততদিন পাশে থাকো। আর কিছুই লাগবে না…
অভিসন্ধি
লেখা> মোঃ জাহিদুল হক শোভন
Comments
Post a Comment