চিলেকোঠার রোদ্দুর
আরাদ্ধার পাশে যেয়ে দাঁড়িয়ে ওর সুলভ চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম "আপনি ঠিক আছেন তো?" সে আমাকে দেখে চমকে যাই। এতগুলো ভিঁড়ের মধ্যে তাকে খুজে বের করেছি। হয়ত সেটা ভেবেই ও চমকপ্রদ দৃষ্টিত চেয়ে থাকে আমার দিকে। আমার চোখে মুখে শঙ্কা। আমি আরাদ্ধার মিহি সুগঠিত ডান হাত নিজের হাতের মধ্যে আবদ্ধ করে নিলাম। ও আমার দিকে একটু সরে এসে দাঁড়ালো। আমি ভিড় থেকে আরাদ্ধাকে টেনে আনি কিছুটা ফাঁকা স্থানে। সাথে সাথেই বাম পাশের বিল্ডিং ধ্বসে পড়া শুরু করে। আরাদ্ধা নখায়ুধের মত করে আমার হাত আরো আটোশাটো করে ধরে। আমি নরম গলায় বললাম "ভয় পাচ্ছেন কেনো? আমি তো আছি। কোনো ভয় নেই।" আরাদ্ধা চোখের পাতা নিমিষে বহুবার নাড়িয়ে বাম হাত তুলে সামনে দেখিয়ে কি যেন বোঝালো। আমি আরাদ্ধাকে বললাম "চিন্তা নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনার কোনো ভয় নেই।"
কথাটা বলে আমি আরাদ্ধাকে নিয়ে পায়ে হেঁটে রাস্তায় আসি। আরাদ্ধা তখনো আমার হাত ধরে আছে। সে ধীর পায়ে হাঁটছে আমার সাথে। আমি মাঝে মাঝে ঘুরে ওর দিকে তাকাচ্ছি। এত ভোরে রিকশা পাওয়া যাবে না এটা সহজ হিসেব। মোড়ের রাস্তায় এসে একটু দাঁড়ালাম। ও নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওর দৃষ্টি অনুসরন করে তাকাই। দেখি আরাদ্ধা খালি পায়ে আছে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর গলায় বললাম "আপনার পায়ে জুতো নেই, আমাকে এতক্ষণে বলেন নি কেনো?" আরাদ্ধা চোখ পিট পিট করে চাইলো আমার দিকে। চোখে মুখে এখনো ভয় লেগে আছে ওর। তাই বেশি কিছু বললাম না। আরাদ্ধার থেকে আমি হাত ছাঁড়িয়ে নিলাম। নিচু হয়ে আমার পা থেকে জুতো খোলা শুরু করি। আমার টিশার্ট টেনে ধরে ও। আমি জুতো খুলতে খুলতে বললাম "আপনি তো খালি পায়ে আছেন। আমিও খালি পায়ে হাঁটবো। খুব ভোরে খালি পায়ে মাটির রাস্তায় হাঁটার মজাটা অন্যরকম। কিন্তু এখানে তো সব রাস্তায় পাঁকা, তাই তেমন মজা নেই। কিন্তু আপনার সাথে অনেকটা পথ হাঁটার ইচ্ছে ছিল।"
আরাদ্ধা চুপচাপ আমার পাশে দাঁড়ায়। আমি পা থেকে জুতো খুলে, নিচের দিক থেকে প্যান্ট দুই ভাঁজ করে গুটিয়ে নিলাম। আরাদ্ধার হাত ধরে হাঁটছি। বহুদিনের ইচ্ছে, ওর হাত ধরে হাঁটবো। কিন্তু কখনো সেটা বলা হয়ে ওঠেনি আমার। আর বললেই যে ও শুনবে এমনটা না। সেই সব কথা শোনে, যে আপনাকে ভালোবাসে। আরাদ্ধা আমাকে ভালোবাসে না। তাহলে সে তো কখনো আমার কথা শুনবে না। মাঝে মাঝে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলি। উড়ে চলা মেঘের দিকে তাকিয়ে ওদের সাথে কথা বলি। প্রশ্ন করি 'ও মেঘের দলেরা, তোমরা কোথায় যাচ্ছো?' মেঘেরা আমার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়। ওদেরকে বিরক্ত করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। বিরক্ত নিয়ে উড়ে চলা মেঘের দলেরা জবাব দেয় 'নিরুদ্দেশ, উদ্দেশ্যহীন, অচেনা, অজানা তেপান্তরে যাচ্ছি।' আমি মুচকি হাসি। জানি যে ওদের কোনো নির্দিষ্টভাবে যাওয়ার জায়গা নেই। অনিলের অনীকেরা তাড়া করে বেড়ায় ওদের।
আমি মাঝে মাঝে বৃষ্টিকে প্রশ্ন করি 'তুমি এমন অঝোরে কেনো ঝরো?' বৃষ্টি আমার দিকে বিষন্ন দৃষ্টিতে চেয়ে করুন সুরে বলে 'আমি তো অনুশোচনা। আমি তো মেঘকে ভালোবাসি। কিন্তু মেঘ ভালোবাসে শরতের কাঁশফুলকে। এ জন্য যখন অনিল আসে, তখন কাশফুলের থেকে মেঘকে দুরে সরিয়ে দেয়। মেঘ বিষন্ন মনে উড়তে থাকে বহুদুর, বহুপথের উদ্দেশ্যে। বারবার মেঘ পিছনে তাকায়, কখন যে পাঁহাড়ের সাথে ধাক্কা লাগে মেঘের, মেঘ তা জানেই না। আর এই সব ব্যাথা যখন মেঘ সহ্য করতে পারে না। তখন আমিই মেঘের এই যন্ত্রনা সহ্য না করতে পেরে নিজেকে উৎস্বর্গ করে দিই মেঘের জন্য।' আমি বৃষ্টি দিনে ফাঁকা, নয়তো উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখি। সবাই বৃষ্টি উপভোগ করে, আর আমি বৃষ্টির কান্না শুনি।
.
আরাদ্ধা আমার হাত টেনে ধরলো। আমি থেমে দাঁড়ায়। সকালের আলো বেশ খানিকটা বিস্তৃতি হয়েছে। ওর চোখে মুখে ক্লান্তি লেগে আছে। আরাদ্ধা জানেনা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। সে শুধু হেঁটেই চলেছে। আমি ওর কাল্তি লোচনদ্বয়ের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললাম "আর মাত্র কয়েক মিনিট আছে। আম্মাকে বলেছি আপনি আসবেন। চলুন হাঁটি।" আরাদ্ধা কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকালো। আমি মাথা নিচু করে নিই। সে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমি কোনো কথা না বলে হাঁটা শুরু করি।
আরাদ্ধা হয়ত ভাবছে এত সকালে আমি ওর বাড়ির সামনে কিভাবে বা কেনো গেলাম। আসলে ভোর রাতেই রাজ ভাইয়ের ফোন কলে আমার ঘুম ভেঙে যাই। উনি জানায় "আবির.. তুমি কোথায়? শুনলাম আরাদ্ধা যেখানে থাকে ঐ সারির বিল্ডিং এ ভোরে আগুন লেগেছে। আগুন বেশ ছড়িয়ে গিয়েছে। জানো কিছু?" আমি রাজ ভাইয়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিইনি। কেবলমাত্র ওনার কথা শুনে অনুধাবন করি, আমার হার্টবির্ট এর চলাচল খুব দ্রুত বেড়ে গিয়েছে। পাঁচটা বাজে তখন। আমি রুমের দরজা খুলে বের হই। আম্মা অযু করে আসছিল। আমাকে দেখে বলে "কোথায় যাচ্ছিস এত সকালে?" বেশি কিছু বলতে পারেনি তাকে। শুধু জানাই "আরাদ্ধা আসবে।"
এরপর ১.২০ কিলোমিটার রাস্তা দৌড়ানো শুরু করি। নিজের বাইক ছিল বাড়িতে। কিন্তু কোনো কিছুই মাথায় আসেনি। বাড়ি থেকে বের হয়েই দৌড় শুরু করি। হাপাতে হাপাতে, দৌড়ে যখন আরাদ্ধাদের বিল্ডিং এর সামনে আসি। দেখি এই কলোনির সব লোক একজায়গাতে এসে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। আরাদ্ধাদের বিল্ডিং এর একপাশে আগুন চলে এসেছে। আমার বুকের বাম পাশটা যেন তখন আরো মোঁচড় দেওয়া শুরু করে। আমি দিশেহারার মত চারপাশে তাকিয়ে খুজতে থাকি তাকে। কিছুটা ফাঁকা জায়গাতে, আরাদ্ধা একা দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে বিল্ডিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে বিশাল ভয়ের ছাপ, তা দুর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আমি দৌড়ে আরাদ্ধার পাশে যাই। আর যখনি ও পাশে যাই, তখনি ওর বিল্ডিং এর পাশের বিল্ডিং হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে থাকে। সাথে সাথেই আমি ওকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে আসি।
.
আরাদ্ধা স্থির হয়ে দাঁড়ালো। সে আর হাঁটবে না বুঝতেই পারছি। মেয়েটা কিছুই বলছে না। আমি কি তাকে কোলে নেবো? নাহ থাক, রাজ ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড। তাকে কোলে না নেওয়াই ভালো। আমি যে তার হাত ধরেছি, এটাই তো অনেক দুঃসাহসের কাজ। আরাদ্ধার চোখে মুখে রাগের প্রতিভিম্ব। আমি ওর পাশে যেয়ে বলি "আর সামান্য পথ। হাঁটতে থাকুন। রাজ ভাইয়া জানতে পারলে আমাকে বকা দেবে। বলবে তোর ভাবীকে সেভলি কেনো নিয়ে যাস নি। চলুন তাড়াতাড়ি।" আমার কথা শুনে আরাদ্ধা কেমন গোল গোল চোখে তাকালো। শুনেছি সুন্দরী মেয়েরা রেগে গেলে নাকি চোখ গোল করে। এটাতে আরো বেশি সুন্দর লাগে তাদের। মেয়েদের সৌন্দর্যের কোনো শেষ নেই। তারা ফুসকা খাওয়ার সময় মুখ ভঙ্গি এমন করে যেন ফুসকা ওরা খাচ্ছে না, ফুসকা তাঁদেরকেই খাচ্ছে। আমি লুকিয়ে মেয়েদের ফুসকা খাওয়া দেখি। আসলে সৌন্দর্য দেখতেই ভালো লাগে। যদিও আমার এসব ভালো গুন কোনো মেয়েই জানেনা। আরাদ্ধা কেনো রাগ করলো? কি জানি? মেয়েদের রাগের কারন বোঝা বড়ই মুশকিল। এ জন্য মেয়েরা রহস্যময় হয়ে থাকে বেশি।
সে আমার পাশে হাঁটা শুরু করে। আমি ওকে প্রশ্ন করতে থাকি। "আপনার কি ভালো লাগে?"
'চকলেট নাকি আইসক্রীম? ফুসকা নাকি চটপটি?' বিরিয়ানি নাকি খিঁচুড়ি?' ফুল নাকি প্রজাপতি?' শালিক নাকি টিয়া?' আরাদ্ধা চুপ থাকে। বাড়ির কাছে এসে গিয়েছি। বাড়িতে প্রবেশ করলাম। আম্মা আরাদ্ধাকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। আমি রুমে এসে দেখি রাজ ভাইয়ের থেকে অনেকগুলো কল এসেছে। আমি ব্যাক করলাম। তিনি বলেন.
- কোথায় থাকো হুম? ফোন রিসিভ করো না কেনো?
- ওনাকে বাড়িতে আনলাম।
- আচ্ছা তাকে অফিসে পাঠিয়ে দাও। (রাজ ভাই)
- আচ্ছা।
- তুমিও আসো।
কড়া গলায় কথাগুলো বললেন তিনি। আমি আর আরাদ্ধা রাজ ভাইয়ের অফিসে জব করি। আরাদ্ধাকে রোজ অফিসেই দেখি আমি। রাজ ভাইকে দেখতাম আরাদ্ধার সাথে সবসময় কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে সবসময় কথা বলতো। আরাদ্ধাকে নিয়ে কখনো কখন্র লান্চেও যেতেন তিনি। বুঝে নিয়েছিলাম, রাজ ভাইয়ের সাথে আরাদ্ধার একটা রিলেশনশীপ আছে। আরাদ্ধাকে দেখতে দেখতে ওর প্রতি বিশাল আকর্ষণ অনুধাবন করেছি। এই অনুধাবনে আরাদ্ধাকে নিয়ে কত শত বর্ণনাহীন কল্পনা করেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
আসল কথা হল, আরাদ্ধাকে দেখে তার প্রতি যতটা আকর্ষণ তৈরী হয়েছে, তার থেকে বেশি ভালোবাসা তৈরী হয়েছে, সে বোবা জেনে। আরাদ্ধা দেখতে সাদা বরফের মত। মেয়েটার চাহনি যেন আমাকে বারবার অবশ করে দেই। তার বাকহীন কথার আলোকপ্রবন আমাকে বাধ্য করে ভালোবাসতে। আরাদ্ধা কখা বলতে পারেনা। মেয়েটা বোবা। তাতে কি? তার সরল, সুদীর্ঘপল্লব বিশিষ্ট দুটি চোখ ছিল মায়া জড়ানোর মত বিশাল।
.
সকালের খাবার শেষ। আরাদ্ধা প্রস্তুত অফিসে যাওয়ার জন্য। আমার মন ভালো নেই। আজকাল একটু বেশিই অকারনে, অকস্মাৎ মন খারাপের ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারছি। আমার মন খারাপ হলে আমি হাঁটতে বের হই। হাঁটার মধ্যে এক প্রকার ভালো লাগা কাজ করে। পানিতে ঢিল ছুঁড়ি। এ যেন আরো এক ধাপ ভালো লাগার বিশালতা। আরাদ্ধা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। একটা কাগজ এগিয়ে দেয় ও। সেখানে লেখা.. "কি দরকার ছিল, এতটা রাস্তা দৌড়ে যাওয়ার? আমি তো ঠিক ছিলাম। শুধু একটু ভয় পেয়েছিলাম। আপনাকে টেনশন দেখতে একদমই ভালো লাগে না।"
আমি আরাদ্ধার মুখের দিকে তাকালাম। এর আগে কখনো অফিসের কথা ছাড়া আমাদের মধ্যে কথা হয়নি। যতবারই তাকে মনের কথাটা জানাবো বলে প্রস্তুত হয়েছি। ততবারই রাজ ভাই নামক এক বাধা এসে সামনে উদজীবিত হয়েছে। এ বাধা ভস্ব করার শক্তি আমার নেই। তবে বোঝানোর চেষ্টা করাতাম অনেক কিছু। আরাদ্ধা হয়ত বোঝেনি। সে জন্য ওর রাজ ভাইয়ের সাথে এত ঘনিষ্টতা। আমি বললাম..
- তেমন কিছু নিয়ে টেনশন নেই আমার। আচ্ছা অফিসে যান। দেরি হয়ে যাবে।। রাজ ভাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
- আপনার সাথে যাবো।
কাগজে লিখে আমাকে দিল। আমি রেডি হতে শুরু করি। রাজ ভাইয়ের অফিসে প্রথম যেদিন জয়েন করি সেদিন বেশ ভালোই কেঁটেছিল সময়টা। তিনদিন পর আরাদ্ধা জয়েন করে। অফিসে থাকা অবিবাহিত অনেক ছেলেই দেখতাম আরাদ্ধার সাথে ভাব জমানোর জন্য নানা রকম কান্ড করতে। আমার আবার এসব দেখতে বেশ ভালোই লাগে। আমি নিজেই জানিনা আমি কেমন। আমার উপর বিরক্ত অনেকেই। যেমন ধরুন, কোনো পিকনিক স্থানে বেড়াতে গেলে, ছেলেরা মেয়েদের পিছনে পিছনে ঘোরে, মেয়েদের দেখতে থাকে। যে মেয়ে সুন্দর বেশি তাকে উদ্দেশ্য করে এমন কিছু কথা বলে, যেটা শুনে মেয়েরা তাকাতে বাধ্য। আর যখনি তাকাবে, ছেলেগুলো পিছনে পিছনে ঘুরতে থাকে।
আবার কোনো অনুষ্ঠানে গেলে মেয়েদের সাথে লাইন মারার জন্য ছেলেরা লেগে থাকে। আমি এসব দেখি। আমার দেখতে ভালো লাগে। আমি মেলাতে যেয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে এসব কিছু দেখি। বেশ মজা লাগে আমার। কেউ কেউ আছে পাবলিক প্লেসে জড়াজড়ি করতে ভালোবাসে। আমি লুকিয়ে এগুলোই দেখি। মেয়েদের ইম্প্রেস করার কোনো গুন আমার মধ্যে নেই। এ জন্য হয়ত আরাদ্ধা আমার ভালোবাসাটা বোঝেনি। সবাই যদি সবকিছু বুৃঝতো, তাহলে তো বেঁচে থাকাটাই সহজ হয়ে যেত। আর বেঁচে থাকাটা সহজ না বলেই মানুৃষের মধ্যে প্রতিনিয়ত রঙ বদলাতে থাকে।
.
আরাদ্ধার সাথে রিকশাতে করে যাচ্ছি। ওর ইচ্ছে হয়েছে সে রিকশাতে যাবে। হঠাৎ এমন ইচ্ছা পোষনের কোনো কারন দেখছিনা আমি। ভয় হচ্ছে রাজ ভাই যদি দেখে আমি আরাদ্ধার সাথে এভাবে রিকশাতে বসে যাচ্ছি। আমার চাকরিটাই চলে যাবে। আমার দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দেয় ও।
- আমার পাহাড় পছন্দ। পাহাড়ে উঠে চারপাশ দেখবো। ঝরনা পাহাড় আরো বেশি পছন্দের। উঁচু জায়গা থেকে জলরাশি দেখতে অনেক ভালো লাগে আমার। কল্পনাতে চলে যাই সেখানে।
- সেখানে রাজ ভাইও থাকে, আপনাকে সেভ করার করার জন্য তাই তো? (আমি)
- আমি কি বলেছি? বেশি বোঝেন আপনি। (আরাদ্ধা)
আমি চুপ থাকলাম। হয়ত কথাটা বলা ঠিক হয়নি। কিন্তু আটকিয়েও রাখতে পারিনি। হঠাৎ রিকশা ব্রেক করলো। আমি সামনে পড়ে যাচ্ছিলাম। আরাদ্ধা হাত টেনে ধরে। আমি ঘুরে ওর দিকে তাকাই। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বোঝাতে থাকে.. "কি ছেলেরে.. রিকশার ব্রেক সামলাতে পারেনা, সে আবার আমাকে সেভ করতে গিয়েছিল। হিহিহি।" আমি একটু লজ্জা পেলাম। হয়ত আরাদ্ধা না ধরলে, আমি পড়েই যেতাম। কিন্তু মামা এত জোরে কেনো ব্রেক করলো? সামনে তাকিয়ে দেখি একটা গাড়ি এসে থেমেছে। গাড়িটাকে আমি চিনি। রাজ ভাই এসেছে। আমি ভয়ে একটা ঢোক গিললাম। উনি গাড়ি থেকে নেমে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। আমার দিকে তাকিয়ে বললো..
- আবির.. তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তাকে সেভলি এতদুর নিয়ে আসার জন্য। আরাদ্ধা চলো আমার সাথে।
রাজ ভাই আরাদ্ধার হাত ধরে, রিকশা থেকে নামিয়ে নেয়। তারপর সোজা গাড়িতে তুলে নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় তিনি। আমি বোকার মত রিকশার উপরে বসে থাকি। রিকশা মামার ডাকে সম্ভিত ফিরে আসে। "মামা যাবো নাকি নামবেন?" আমি অফিসের উদ্দেশ্যে যেতে বলি। রাজ ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে কতই না ভাবনা সাজিয়েছি আমি। সব শেষ। এটা যে অন্যায় ছিল, তা এখন বুঝতে পারছি। আসলে তাকেই ভালোবাসা উচিৎ, যে অন্যের নয়, সে শুধুই তোমার হবে।
অফিসে এসে বসলাম। বিষন্ন মনে আরাদ্ধার ডেস্কের দিকে তাকাচ্ছি। আজ জায়গাটা খালি পড়ে আছে। হঠাৎ ফোন বেঁজে ওঠে। রাজ ভাইয়ের নাম্বার থেকে কল এসেছে। ফোন কলটা রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে তিনি বলে..
- আবির, অফিস থেকে বেরিয়ে কাজী অফিসে আসো। সাক্ষী দিতে হবে তোমার। আমি বিয়ে করছি। তুমি কাছের মানুষ। তোমাকে যদি না ডাকি, তাহলে হয় বলো? জলদি আসো।
বুকটা ধক করে উঠল আমার। অনুভব করলাম আমি আরাদ্ধাকে আসলেই ভালোবাসি। রাজ ভাইয়ের সাথে বিয়ের কথা শুনে আমার সবকিছু দিশেহারা দিকবেদিক ছুটোছুটি করতে ব্যস্ত, আমি আমার অনুভুতির কাছে পরাজিত সৈনিক হয়ে গিয়েছি। সবকিছু অবশ হয়ে গেছে আমার। আমি যাবো না ভেবে নিয়েছি। কিন্তু আরাদ্ধাকে শেষ বার দেখার নেশাটা সামলাতে পারলাম না আমি। তাই বেরিয়ে পড়লাম কাজি অফিসের উদ্দেশ্যে। ঠিকানা অনুসারে ত্রিশ মিনিটের ভিতর পৌছে গেলাম আমি।
কাজী অফিসের রুমে যখন প্রবেশ করি দেখি রাজ ভাই চেয়ারে বসে আছে। পাশেই আরাদ্ধা বসা। বুকটা আবারো মোঁচড় দিয়ে উঠল। মনে মনে বললাম হয়ত এখানে না আসাটাই ভালো ছিল। আমাকে দেখেই রাজ ভাই বললো..
- কাজী সাহেব আরেকজন সাক্ষী চলে এসেছে। এবার তো সমস্যা হবেনা। আমি চাইনা তাকে হারাতে। এখনি বিয়ের সব ব্যবস্থা করুন।
- না সমস্যা নেই। এবার ঠিক আছে। কাজ শুরু করি। (কাজি)
- ভাই শুনুন.. (আমি)
- তোমার আবার কি হল? (রাজ ভাই)
- না মানে সত্যিই কি আপনি বিয়ে করছেন? (আমি)
- বিয়ে কি মানুষ মিথ্যে মিথ্যে করে? (রাজ ভাই)
- না মানে ঠিক আছে। (আমি)
আরাদ্ধার দিকে তাকালাম। ও আমার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। পকেট থেকে টিস্যু বের করে চোখ মোছার চেষ্টা করলাম, সবার আড়ালে। কাজি সাহেব বিয়ের জন্য বলা শুরু করলো.. তখনি রাজ ভাই বলেন..
- আরে কাজি সাহেব থামেন। কণে তো আসুক। ঐ শিলা তোর ভাবীকে নিয়ে আয় জলদি।
রাজ ভাইয়ের কথা শুনে কয়েকজন, কাজীর পাশের রুম থেকে একটা মেয়েকে আমাদের সামনে আনা হয়। আমি বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। মেয়েটা আস্তেই আরাদ্ধা রাজ ভাইয়ের পাশ থেকে উঠে যায়। আমার পাশে এসে দাঁড়ালো ও। সাজিয়ে আনা মেয়েটা রাজ ভাইয়ের পাশে যেয়ে বসে। মেয়েটা বসতেই রাজ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললো..
- বুঝলে ভাই, মেয়েটাকে ভালোবাসতাম অনেক আগে। তাকে পেতে হেল্প করেছে আরাদ্ধা। এ জন্য সবসময় অফিসে তার মাধ্যমে তোমাদের ভাবির খবর নিতাম। আরাদ্ধা তো তাকে আমার কাছে এনে দিয়েছে। এখন সবাই বিয়ের সাক্ষী হও। কাজি সাব বিয়ের কাজ শেষ করেন।
.
রাজ ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বাইরে বেরিয়ে আসে। ভাবিটা মাশাল্লাহ। শুধু শুধু আমি ভয় পাচ্ছিলাম এতক্ষণ। তিনি আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে.. "তাহলে তোমরা দুজন একসাথে রিকশাতে করে আমাদের বাড়িতে আসো। বিয়ে খেতে হবে তো নাকি।"
ওনার হাসির কারন খোজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বড় বড় চুলের মাথায় আপাতত কারন টা আসছে না। কিন্তু তিনি কেনো বলবে, আমার আর আরাদ্ধাকে রিকশাতে করে যেতে? হুর সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি করে চলে যায় ওনারা। আরাদ্ধা আমার পাশে এসে কাগজ বাড়িয়ে দেয়।
- রিকশা ডাকুন।
- আচ্ছা
দুজনে রিকশা করে যাচ্ছি। আরাদ্ধা আমার দিকে সরে বসেছে। একটা চিরকুট দিয়ে জানায়..
- সরে এসে বসেছি। যদি আবার পড়ে যান।
- পড়বো না। আপনি আছেন তো, টেনে ধরবেন। (আমি)
- হুমম, ঠিক, যেমনটা আপনি আমার কল্পনায় পাহাড়ে এসে, আমাকে চোখে চোখে রাখেন, আমাকে গার্ড দিয়ে রাখেন যেন আমি না পড়ে যাই। (আরাদ্ধা)
- মানে? (আমি)
- মানে বুৃঝবেন না আপনি তো হাঁদারাম।
আরাদ্ধা কথাটা বলে আমার হাতে চিমটি কাঁটে। আমি আউচ বলে হাসতে থাকি। আমি কিন্তু অতটাও হাদারাম নই। সব না বুঝলেও, তাকে সেভ করে রাখার মানেটা আমি জানি। হিহিহি পেয়ে গিয়েছি আমি তাকে।
------(সমাপ্ত)------
.
চিলেকোঠার রোদ্দুর
Abir Hasan Niloy
Comments
Post a Comment