অবৈধ সম্পদ

বাবা মারা যাওয়ার সময় আমাদের তিন ভাইয়ের জন্য বিশাল সম্পদের পাহাড় রেখে গিয়েছেন।এতো এতো জমিজমা মধ্যে এক কাচ্চাও তিনি পূর্বপুরুষের কাজ থেকে পাননি।সবই নিজ হাতে গড়েছেন।একটা একটা পাথর কুড়িয়ে এই সম্পদের পাহাড় তিনি গড়েছেন।কীভাবে গড়েছেন তা শুনলে আপনার মাথা ঘুরে যাবে।'

বাবার বিশেষ কোন চাকরিবাকরি ছিলো না।বড় মাপের ব্যবসায়ীও ছিলেন না।সারাদিন ঘুরে ফিরে পায়ের ওপর পা তুলে গড়গড়া টানতেন।বাবার ধারণা,বুদ্ধিমান মানুষেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে,রোদে পুড়ে,বৃষ্টিতে ভিজে ক্ষেতে খামারে কাজ করে না।বাবা ছিলেন সেই লেভেলের একজন বুদ্ধিমান মানুষ।'

তখনকার সময় গ্রামের মানুষজন ছিলো খুবই সরল সোজা প্রকৃতির।জমির দলিলপত্র দেখাশুনার বিষয়ে তাদের তেমন কোনো জ্ঞান ছিলো না।বাবা খুবই দক্ষ এবং অভিজ্ঞভাবে সেইসব দেখাশুনা করতেন।গ্রামের লোকেরা জমির দলিরপত্র নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে কিংবা বেঁচা কেনার প্রয়োজন পড়লে আব্বার কাছে ছুটে আসতো।আব্বা ভূমি অফিসে দৌড়াদৌড়ি করে লোকেদের সমস্যা চুকিয়ে দিতেন।তার সাথে নিজের পকেট পুঁজিও করতেন।আপনি হয়তো ভাবছেন,এভাবে কি কেউ এতো সম্পদের মালিক হতে পারে?আদ্রৌ কি কেউ হতে পেরেছে?আপনার ধারণা একদম সঠিক।'

লোকেদের টুকিটাকি সমস্যা মিটিয়ে তাদের কাছ থেকে বাবা যা পেতেন,তা দিয়ে কোনোরকমে সংসারটা চলতো।তাহলে এবার প্রশ্নে আসে,তিনি কাজটা কী করতেন?যা দিয়ে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন।'

সেসময় গ্রামে অনেক জমিজমা পাওয়া যেতো যার কোন নির্দিষ্ট মালিকানা ছিলো না।
লোকেরা এমনি এমনি দখলদার হিশেবে ভোগ করতেছে।বাবা গ্রামের মাঠ ফর্চা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সেইসব জমিগুলো বের করতেন।তারপর বুদ্ধি খাটিয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসে দৌড়াদৌড়ি করে সে গুলোকে নিজের কবজায় নিয়ে আসতেন।কোনোরকমে একটা জমি দখল করে নিতে পারলে তারপর আরেকটু বুদ্ধি এবং জোর খাটিয়ে তার পাশের জমিটাও নিজের দখলে নিয়ে আসতেন।এভাবেই তিনি এক এক করে এতো জমিজমা নিজের করে নিয়েছেন।'

এসব কাজ করা চট্টিখানি কথা নয়।তবে আমার বাবার জন্য তেমন কঠিন কিছু ছিলো না।তার জ্ঞান,বুদ্ধি,ক্ষমতা সবটাই ছিলো।'

একসময় গ্রামের মানুষের মুখে বাবার নামে বদনাম রটতে শুরু হলো।বাবা না-কি অন্যায়ভাবে জোরজবরদস্তি করে জমি দখল করে নিচ্ছে।তবে এসব কথা লোকেদের মুখেই শোনা যেতো।বাবার সামনে বলার সাহস কারো ছিলো না।আমার বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস গ্রামের খুব কম মানুষের-ই ছিলো।আর যারা বলেই ফেলতো,তাদের মুখ বন্ধ করে রাখার টেকনিকও আব্বা জানতেন।'

গ্রামের মানুষেরা মনে মনে বাবার সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করে আমি তা জানি না।তবে মানুষটাকে আমার ততটা খারাপ মনে হয় না।বাবা ছিলেন খুবই স্বজনপ্রীতি মানুষ।আমরা তিনটে ভাই,জন্মের পর থেকে যখন যা চেয়েছি তাই পেয়েছি।বাবা আমাদের সব সখ আহ্লাদ পূরণ করার চেষ্টা করেছে।আর মা'কেও কোনোদিন বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শুনিনি।বাবার সাথে সংসার জীবন তিনি বেশ সুখেই কাটিয়েছেন বলে মনে হয়।পুরুষ মানুষ কতটুকু ভালো সেটা তার স্ত্রী'র থেকে আর কেউ বেশি বলতে পারবে না।'

বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ আমাদের জীবনে এভাবে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা গুনাক্ষরেও ভাবতে পারিনি।এইযে বলে না,অন্যায়ভাবে গড়া সম্পদ আর ক্ষমতার দাপট চিরদিন থাকে না।আমাদের কেত্রেও সেটাই ঘটতে চলেছে।বাবা যে জমিজমা আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে অধিকাংশ জমির সঠিক কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে।এইসব জমিগুলো নিয়ে এলাকার অনেক মানুষের সাথে আমাদের বিরোধ চলছে।'

জমির দলিলপত্র বিষয়ে আমি তেমন কিছু বুঝি না,বড় ভাইয়া ভালো বুঝে।বাবা মারা যাওয়ার আগে তার সবটুকু বিদ্যা বড় ভাইয়ার মগজে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে।বাবার অবর্তমানে বড় ভাইয়া সব জমিজমার তদারকি করছে।জমিজমা নিয়ে বিরোধ,মামলা মোকদ্দমা, শালিস,বিচার এইসব এখন ভাইয়া একাই সামলাচ্ছেন।তবে কতোদিন পারবে?অবৈধ পথে কতোদিন চলা যায়?একসময় সব রাস্তা আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে আসবে।'

আমাদের প্রতিবেশী কামরুল চাচার সাথে একটা জমির অংশ নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে ঝামেলা চলছে।অনেক মামলা মোকদ্দমা, শালিস,বিচার হয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ফয়সালা হয়নি।আর হবে বলেও মনে হচ্ছে না।দুই পক্ষ একসাথে হলেই সংঘর্ষ লেগে যায়।কেউ কাউকে এক সুঁতোও ছাড় দিতে রাজি নয়।'

আজ সন্ধ্যা বেলায় হঠাৎ করে বাড়ি থেকে খবর আসে,কামরুল চাচা তাঁর ছেলেপেলে নিয়ে বড় ভাইয়ার ওপর হামলা করেছে।খবর পেয়ে বাড়িতে ছুটে গিয়ে দেখি ভাইয়ার অবস্থা ভয়াবহ।মাথাটাথা ফেটে একাকার।বাড়িতে রক্তের হলি খেলা চলছে।ভাইয়াকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে আসলাম।ডাক্তার দেখেশুনে বললেন,ভাইয়ার অবস্থা আশংকাজনক।নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না।আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আর ভাবছি,পিতার পাপের শাস্তি বুঝি এবার সন্তানকে ভোগ করতে হবে।স্রষ্টার কী অদ্ভুত বিচার!পাপের শাস্তি একসময় ভোগ করতেই হবে।'সমাপ্ত 

গল্পঃ অবৈধ সম্পদ
লেখাঃ আলম সরকার ধ্রুব
০৪/০৭/২০২১

Comments

Popular posts from this blog

ছাগল পালনের সুবিধা ও ছাগল পালনের অসুবিধা

বদনজরের ( রুকইয়াহর) গোসলের নিয়ম:

বিভিন্ন প্রকারের রাসায়নিক সারের কাজ।