ঝুঁকি
সোফায় বসে ল্যাপটপে অফিসের কাজগুলো কমপ্লিট করছে তুহিন। বৃষ্টি এসেছে। জানালা খোলা। ঝড়ো বৃষ্টিতে রুমের ভেতরে পানি চলে আসছে। উঠে কাঁচগুলো বন্ধ করে পর্দা টা টেনে দিল সে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে আসার পর থেকেই তুহিন লক্ষ্য করছে সিরাত চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। আসার পর থেকে একটাও কথা বলে নি। কিছু একটা নিয়ে মনে হচ্ছে খুব চিন্তাই গুটিয়ে আছে তা না হলে সে এমন করে না। ওর পাশে বসে তুহিন বললো,
-- কিছু হয়েছে?
কিছুটা অস্থিরভাবে সিরাত বললো,
-- তুহিন, আমি প্রেগন্যান্ট।
-- আর ইউ সিওর?
-- আমার এটা মনে হচ্ছে।
-- ওহ, কাল তাহলে ডাক্তারের কাছে চলো টেস্ট
করিয়ে দেখা যাক।
-- হুম।
-- আচ্ছা বাবা, এত্ত চিন্তার কিছু নাই। এটা হলে
তো কোটি কোটি বার আলহামদুলিল্লাহ।
(সিরাতকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিল তুহিন)
রাতে শুয়ে শুয়ে তুহিন ভাবছে, এর আগেও সিরাতের এমনটা মনে হয়েছে যে সে প্রেগন্যান্ট কিন্তু সে ছিল না। সাত বছর হলো তুহিনের সাথে সিরাতের বিয়ে হয়েছে। কখনো কনসিভ করেনি সে। এ নিয়ে তুহিন কখনো কিছু বলে নি ওকে। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে, টেস্ট করিয়েছে কিন্তু মারাত্মক কোন সমস্যা ধরা পড়েনি। বাচ্চা না হওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে সিরাত খুব ডিপ্রেশনে থাকে। সবসময়ই মনমরা হয়ে থাকে। তুহিন ওকে চিয়ার আপ করার চেষ্টা করলেও বারবার সিরাতের মাথায় বাচ্চা না হওয়ার চিন্তা টা কাজ করে। অস্বাভাবিক নয়।
তুহিনের বাড়ির মানুষের সাথে ওর সম্পর্ক ভালো নয়। আগে যখন ও পরিবারের সাথে থাকতো তখন বাচ্চা না হওয়ায় পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনের অনেকেই কটাক্ষ করতো সিরাতকে। ও চুপচাপ কাঁদতো কিন্তু কখনো মুখ ফুটে কিছু বলতে পারতো না। তুহিনের মা ওকে দ্বিতীয় বিয়ের পরামর্শ দেয়।
তুহিন জানায়, " মা, আমি সিরাতকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি, বাচ্চা যদি আল্লাহ্ ভাগ্যে রাখেন নিশ্চয়ই হবে, কিন্তু আমি ওকে ছাড়তে পারবো না। "
এ নিয়ে বাড়ির লোকদের সাথে মনমালিন্যের জেরে সিরাতকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে ওঠে তুহিন।
সিরাত যখন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ে তখনই তুহিন ওকে বিয়ে করেছিল। এখন আটাশ বছর চলছে ওর। এমন না যে বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে এমনটা হচ্ছে। ডাক্তার বলেছে তেমন কোন সমস্যা নেই। যে কোন সময় সে কনসিভ করতে পারে। কিন্তু কখনও এমনটা হয় নি।
সকালে হসপিটালে এসে টেস্ট করিয়েছে সিরাত। রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে। তুহিন ওর হাতটা ধরে বলল,
-- চিন্তা করো না। আমাদেরও একদিন ফুটফুটে
একটা বাচ্চা হবে।
সিরাত কিছু বলছে না। রিপোর্ট টা হাতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ খুলতে যাচ্ছে সিরাত কিন্তু তুহিনের মনে শঙ্কা কাজ করছে। যদি সে প্রেগন্যান্ট না হয় তাহলে আবার ভেঙে পড়বে। রিপোর্ট টা ওর হাত থেকে নিয়ে তুহিন বলল,
-- ডাক্তারের সাথে কথা বলি আগে।
-- ওকে।
প্রায় তিন বছর যাবত এই ডাক্তারের ফলো আপে ছিল সিরাত। ডাক্তার রিপোর্ট চেক করে বললেন,
-- কনগ্রাচুলেশনস। আপনি প্রেগন্যান্ট।
ফাইনালি। আমার নিজেরও অনেক ভালো
লাগছে।
সিরাত থ হয়ে গেছে। কি বলবে বুঝছে না। তুহিন বলল,
-- থ্যাংক ইউ ম্যাম।
-- যেহেতু এতগুলো বছর পরে উনার ফার্স্ট
প্রেগন্যান্সি, আমি সাজেস্ট করবো ফুল বেড
রেস্ট।
-- কতমাস পরে আবার চেক আপে আসতে
হবে? (সিরাত)
-- পাঁচ মাস হলে একবার আসবেন। কোন
সমস্যা হলে ফোনে কনসাল্ট করবেন।
-- ধন্যবাদ। আসছি আমরা তাহলে।
বাসায় ফিরে সিরাতকে জড়িয়ে ধরলো তুহিন। সিরাত বলল,
-- তুমি খুশি হয়েছো?
-- অনেক অনেক। আমাদের একটা ছোট্ট বাবু
আসতে চলেছে এর থেকে খুশির খবর আর
কিছুই হতে পারে না।
দুজনে খুব এক্সাইটেড ছিল প্রথম থেকেই। তুহিন বেবিশপ থেকে দুইটা ছোট্ট ছোট্ট ড্রেস কিনে এনেছে তাদের বাবুর জন্য। অনেকগুলা খেলনা কিনে আলাদা একটা রুম সাজিয়ে রেখেছে। সিরাত জামাগুলো নাড়াচাড়া করে বলছে, " ইস কবে যে আমাদের বাবুটা আমার কোলে আসবে। "
হঠাৎ একদিন রাতে সিরাতের পেটে খুব ব্যাথা শুরু হলো। ডাক্তারের সাথে কথা বলতেই তিনি সিরাতকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বললেন। টেস্ট করিয়ে জানা গেল, সিরাতের মিসক্যারেজ হয়েছে। বাচ্চাটার সাড়ে পাঁচমাস হয়েছিল। মুহুর্তেই সব স্বপ্ন ভেঙে গেল।
প্রচ্ন্ড রকমের ভেঙে পড়েছে সিরাত। তুহিনেরও বেশ খারাপ লাগে। একটা বার সুযোগ পেয়েও কেন যে এমন হলো। সিরাত ভালোভাবে তুহিনের সাথেও কথা বলতে চাইনা। তুহিন জোর করে টুকিটাকি গল্প করতে চাই। কোন সাড়া পাই না তেমন।
বছর গড়িয়ে গেল। তুহিন সিরাতকে বলল,
-- চলো কিছুদিনের জন্য আমরা বাইরে ঘুরে
আসি। তোমার ভালো লাগবে।
-- একটা কথা বলবো?
-- বলো।
-- তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করে নাও। আমি
তোমাকে হয়তো কখনও বাবা ডাক শোনাতে
পারবো না। (কান্নাজড়িত কন্ঠে)
-- আজ বলেছো কিন্তু দ্বিতীয়বার যেন না শুনি।
তুহিন প্রচ্ন্ড রাগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর নিজেরও অনেক কান্না পাচ্ছে।
পরদিন সকাল সকাল বমি করছে সিরাত। তুহিন বলল,
-- খুব বেশি সমস্যা হলে ডাক্তারের কাছে চলো।
-- না মনে হয় এসিডিটির কারণে।
শরীর বেশি খারাপ হওয়ায় সন্ধ্যায় ডাক্তারের চেম্বারে গেল। ডাক্তার আবার প্রেগন্যান্সি টেস্ট দিলেন, দেখে সিরাত তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
-- হায়রে ! ডাক্তারও আশা ছাড়ে না। কতগুলো
মানুষের মন ভাঙতেছি আমি।
-- প্লিজ চুপ করো। ডাক্তার যা বলছে তা করো।
রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তারের সামনের চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছে সিরাত। পাশেই তুহিন। ডাক্তার কিছু বলছে না দেখে সিরাত বেশ হতাশভাবে বিড়বিড় করে বলল,
-- জানতাম এসিডিটির কারণেই এমনটা হয়েছে।
-- আপনি আবারো কনসিভ করেছেন।
-- (সিরাত চমকে উঠলো) কি?
-- জ্বী। বাট একটা প্রবলেম আছে।
-- কি সমস্যা?
-- আপনার জরায়ুতে খুব ছোট্ট একটা টিউমার
ধরা পড়েছে। অন্য সময় হলে ওষুধ খেয়ে
কমানো যেত। বাট বাচ্চা থাকাকালীন
এইধরনের ড্রাগ নিলে মিসক্যারেজ হওয়ার
চান্স অনেক। আবার বাচ্চা যত বাড়তে
থাকবে টিউমারটাও বড় হতে পারে। এই মুহুর্তে
বেবি নেওয়া রিস্কি।
-- মানে?
-- যেহেতু শুধু দেড় মাস। আমি সাজেস্ট
করবো বেবি না নেওয়াই ভালো। কারণ
টিউমারটা থেকে আপনার অনেক পেইন হবে।
কিন্তু বেবি নিলে আপনি কোন মেডিসিন নিতে
পারবেন না। বাকিটা আপনাদের ডিসিশন।
-- জ্বী, আপনি ওষুধটা প্রেসক্রাইব করুন (তুহিন)
-- আমি অ্যাবোরশন করবো না। যা হয় হবে
আমি বেবি রাখতে চাই। (সিরাত)
-- এটাতে লাইফ রিস্ক আছে। (ডাক্তার)
-- প্লিজ বুঝার চেষ্টা করো আমি তোমার জীবন
বাজি রেখে বাচ্চা নিতে চাই না।(তুহিন)
-- আমি বাচ্চাটা চাই। (সিরাত)
কোন কথা না শুনে সিরাত বের হয়ে গেল। তুহিন অনেকবার বোঝানোর ট্রাই করেছে কিন্তু তার একই জেদ। পাঁচমাস পরে চেকআপে এসেছে ওরা। ডাক্তার বলল,
-- আপনার পেটে টুইন বেবি।
-- আলহামদুলিল্লাহ।
-- টিউমারটা সামান্য বড় হয়েছে। আমরা চেষ্টা
করবো ডেলিভারির পরে অপারেশন টা করে
ফেলতে। আবারো বলছি কয়েক মাসের
ব্যাপার। এটাতে আপনার জীবনের রিস্ক
আছে।
-- আল্লাহ্ ভরসা। দোয়া করবেন আমার জন্য।
প্রথম কয়েকমাস সিরাতের অনেক যত্ন নিয়েছে তুহিন। কোন কাজ করতে দেয়নি ওকে। প্রতিদিন ভোরে উঠে সারাদিনের রান্না করে অফিসে যেত তুহিন। কাপড়চোপড় কাচা ধোয়া সবটা তুহিন ছুটির দিনে করে নিত। পরে সিরাতের মা এসে শেষ কয়েকমাস সবকিছু সামলেছে।
ভোরে সিরাতের পেটে ব্যাথা উঠেছে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে তুহিনকে বলল,
-- আমার যদি কিছু হয় বাচ্চা দুইটাকে পরিপুর্ন
আদর দিও। জানি তুমি পারবে।
-- আজেবাজে বকবা না একদম।
-- এমনিতেই বলছি। টেনশন করিও না।
সিরাতকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে। বাড়ির লোকদের খবর দিয়েছে তুহিন। প্রচ্ন্ড চিন্তাই পাইচারি করছে হাসপাতালের বারান্দায়। অপারেশন শেষ করে রুম থেকে বেরিয়ে ডাক্তার বলল,
-- কনগ্রাচুলেশনস। আপনার দুইটা ছেলে
হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাচ্চাদের দেখতে
পাবেন।
-- আলহামদুলিল্লাহ। সিরাতের কি অবস্থা?
-- আরেকটা গুড নিউজ আছে। টিউমারটা
আগের অবস্থায় অপরিবর্তিত আছে। এখন
ওষুধের মাধ্যমে সেটাকে কমিয়ে দুমাস পরে
অপসারণ করা যাবে। আর কোন রিস্ক নেই।
-- কোনোদিক থেকেই আল্লাহ্র শুকরিয়া
আদায় করে শেষ করতে পারবো না।
আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ ম্যাম। এই পুরো
জার্নিতে আপনি আমাদের অনেক সাপোর্ট
করেছেন।
-- এটা আমার কর্তব্য। আমিও অনেক খুশি।
মিষ্টি পাঠিয়ে দিবেন।
-- জ্বী অবশ্যই। দোয়া রাখবেন।
প্রথমবারের মতো নিজের বাচ্চাদের মুখ দেখলো তুহিন। বাবা হওয়ার মতো আনন্দের মুহুর্ত বোধহয় ছেলেদের আর নেই। বাচ্চা দুইটার হাতের আঙুল ধরে তুহিন বলল,
" ওয়েলকাম টু আওয়ার ওয়ার্ল্ড বাবা "।
সিরাতের জ্ঞান ফিরেছে। তুহিনের মা আর শাশুড়ি সিরাতের কাছে বাচ্চা দুইটাকে নিয়ে গেল। বাচ্চাদের গালে চুমু খেল সিরাত। তুহিনের মা বলল,
-- আমাদের ক্ষমা করে দিও বউমা। আমরা ভুল
করেছি।
-- ছিঃ ছিঃ এসব কি বলছেন। আপনাদের প্রাপ্য
নাতি নাতনির মুখ দেখা।
উনারা বাইরে চলে গেলে তুহিন বলল,
-- তোমাকে যে কি বলবো কিছু বুঝতে পারছি
না।
-- কিছু তো বলো। অনেক ঘন্টা তোমার বকবক
শুনি নি। চিন্তাই ছিলাম আর শুনতে পাবো কি
না। (সিরাত মুচকি হাসলো)
-- তুমি আমাকে নিজের জীবনের রিস্ক নিয়ে যে
আনন্দ এনে দিয়েছো পুরো পৃথিবী কিনে দিতে
পারলেও সেটা শোধ হবে না।
-- এতগুলো বছর তুমি আমাকে যেভাবে সাপোর্ট
করেছো। তোমাকে পাওয়া আমার জীবনের
সবচেয়ে বড় ভাগ্যের ব্যাপার, তুহিন। তোমার
জন্য কিছুই তো করতে পারিনি। সবটা তুমিই
করেছো আমার জন্য। এটুকু রিস্ক আমাকে
নিতেই হতো। আল্লাহ্ আমাদের মনের আশা
পুরণ করেছে।
-- তোমাকে অনেক ভালোবাসি সিরাত। তোমার
কিছু হলে আমি শেষ হয়ে যেতাম।
-- আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি তুহিন।
দুজনেই কেঁদে ফেলল। তুহিন ওর বউয়ের চোখের পানিটা মুছে দিয়ে বলল,
-- আচ্ছা বলো, বাচ্চাদের নাম কি রাখবো?
-- বড় টা তুশিন।
-- ছোট টা তাহলে সৃজন।
-- আলহামদুলিল্লাহ।
(সমাপ্তি)
গল্প: ঝুঁকি
লেখনীতে-- নূর-এ সাবা জান্নাত
Comments
Post a Comment