বিয়ে
বিয়ের জন্য বাসা থেকে আমার জন্য মেয়ে দেখছে। কিন্তু আমি পছন্দ করলাম বিবাহিত নারী ও এক সন্তানের মা জেরিনকে। সে আমার সহকর্মী। ৭ মাস যাবত একই অফিসে একই সাথে কাজ করছি। বেশ আগে থেকেই তাকে ভালো লাগতে শুরু করেছে।
বাসায় জেরিনের কথা বিস্তারিত বলতেই বাবা, ভাইয়া এমনকি ছোট বোনটাও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলতে ছাড়লো না। আমার পছন্দ ও রুচি নাকি খুবই জঘন্য। কেবল মা খানিকটা সাপোর্ট করে বললেন, বিয়ে হচ্ছে ভাগ্যের ব্যাপার। তুমি যাকে নিয়ে ভালো থাকবে তাকেই বিয়ে করো।
মায়ের কিছুটা সমর্থন পেয়ে আর কারো কথায় কোন পাত্তা না দিয়ে আমি জেরিনকে বিয়ে করে ফেললাম। বাসায় জানাতেই বাবা আমায় কুকুরের মতো দূর দুর করে তাড়িয়ে দিলো।
আমার বড়ো ভাবী আমাকে মেসেজে লিখলেন, " শেষে কিনা পঁচা শামুকে পা কাটলো? আমার ছোট বোনটা কী এর চেয়ে খারাপ ছিলো?"
আমি কোন উত্তর দিলাম না। কিছুক্ষণ পর দেখি আমার ফোনে আরো একটা মেসেজ এসেছে। মেসেজ ওপেন করে দেখি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু তনিমা।
" আমায় তো পাত্তা দিস নি। তোর পছন্দ বিবাহিত মেয়ে ছিলো জানতাম না তো! তবে আমি একটা বিয়ে করে তাকে ডিভোর্স দিয়ে আবার তোকে বিয়ে করতাম। হা হা হা! তোর পছন্দের তারিফ করতে হয়! ছিঃ!"
আমি চুপ করে থাকলাম। বুঝতে পারছি আমার সময় বেশ খারাপ। দুদিন পর দেখি আমার এক সময়ের খুব কাছের বন্ধু ফোন দিয়ে বললো,
" কি রে জহির, শুনলাম, বিয়ে শাদী করে ফেলেছিস?
"হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছিস। "
"দাওয়াত তো দিলি না রে!"
"আসলে হুট করেই বিয়েটা হয়ে গেলো রে। "
"তা তোর নাকি একটা রেডিমেড বাচ্চাও আছে?"
শুনেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। যে বন্ধুকে একসময় এতো সাহায্য করেছি সে আমার সাথে এভাবে কথা বললো? ফোনের লাইনটা কেটে ফোনটা বন্ধ করে দিলাম।
১১ দিন হয়েছে আমি জেরিনকে নিয়ে আলাদা সংসার পেতেছি। সাথে আছে আমাদের একমাত্র সন্তান মাহিন। জেরিনের প্রথম বিয়ের বছর তিনেক পর তার স্বামী রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। তারপর থেকে মেয়েটা তার ছেলেকে নিয়ে একা সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কতোই বা বয়স ওর! আর আমাদের ইসলামেও তো এমন বিয়ের কথা যায়েজ আছে। তবে সমস্যা কই? মানুষ এতো নেগেটিভভাবে রিয়েক্ট করছে কেনো বুঝতে পারছি না।
আজ অফিস থেকে ফিরে দেখলাম মা এসেছেন। গল্প করছেন মাহিনের সাথে। মাঝে মাঝে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ইশ! কী যে শান্তি লাগছে দেখে! জেরিন আজ অফিসে যায় নি। সে সবার জন্য চা করে নিয়ে আসলো। মা জেরিনকে কাছে ডেকে দু হাতে দুখানি বালা পড়িয়ে দিলেন। তারপর কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
"তোমরা ভালো থেকো। যে যাই বলুক, নিজেদের মতো করে সংসার করো। কারো কথায় কান দিয়ে পিছু হটে যেও না। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। "
এর কিছুক্ষণ পর জেরিন রান্না করতে গেলো কিচেনে। মা আজ আমাদের সাথে থাকবেন। বাবা হয়তো মা কে অনেক গালমন্দ করবেন তবে মা তা বিশেষ পাত্তা দিচ্ছেন না। বেলকনিতে গিয়ে মা আর আমি টুকটাক গল্প করছি। মা বললেন, কখনো জেরিনকে অসম্মান করিস না, বাবা!
আমি বললাম, মা, একটা কথা বলি?
বল, বাবা!
মা, জেরিনের স্বামী আসিফের মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী।
মা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন ফ্যালফ্যাল করে। হয়তো আমি এখন যা উচ্চারণ করেছি তা উনার বোধগম্য হচ্ছে না।
আমি বলতে লাগলাম, সেদিন আসিফ সাহেবের আমার গাড়ির সাথেই ধাক্কা লাগে। উনি রাস্তা পার হচ্ছিলেন। আমি শিক্ষানবীস ছিলাম। কয়েকদিন অনুশীলন এর স্থানে শিখে সেদিনই প্রথম গাড়ি টা রাস্তায় চালাচ্ছিলাম। ব্রেক কষতে পারি নি সময় মতো। ফলাফল যা হবার তাই হয়েছে। থেঁতলে গিয়েছিলেন উনি। আমিও মাথায় হালকা ব্যথা পাই। দ্রুত আমি গাড়ি থেকে নেমে উনাকে হসপিটালে নিতে যাই। কিন্তু আর সুযোগ পাই নি৷ তার আগেই উনি আল্লাহর মেহমান হয়ে গিয়েছেন। এতটুকু বলে আমি থামলাম।
মা আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন।
আমি আবার বললাম, উনার ঠিকানা বের করার জন্য ওয়ালেট হাতে নেই। ওয়ালেট খুলতেই একটা পারিবারিক ছবি আমার চোখে পড়ে। আসিফ সাহেব, উনার স্ত্রী আর ছেলে মাহিনের একটা ছবি জ্বলজ্বল করছিলো। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এই যুগেও কেউ ছবি ওয়ালেটে রাখে যেখানে মোবাইলে হাজার হাজার ছবি সংরক্ষণ করা যায়?
মা, আমি এরপর থেকে ঘুমাতে পারতাম না। বারবার সেই ছবি আমার চোখে ভাসতো। আমার কারণে একটা পরিবারের আনন্দ, সুখ ধূলিস্যাৎ হয়ে গেলো। আমি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম এই সুখ আমি আবার ফিরিয়ে দিবো। কোন অনুশোচনা, করুণা থেকে নয়, শুধু ভালোবেসে এই পরিবারকে আমি আপন করে নিবো।
আমি কিছুটা সময় দিয়েছিলাম নিজেকে যে আমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা কী ঝোঁকের বশে নিয়েছি কিনা কিন্তু না, দিনশেষে মনে হলো আমি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি। একেবারে মন থেকে৷
মা বললেন, আচ্ছা জহির, ধর,জেরিন যদি রাজী না হতো বিয়েতে?
না হলে আর কী করতাম! তবে এ ভাবনাটা যে মাথায় আসে নি তা নয়। শুধু আল্লাহকে ডেকে বলতাম, হে মহান রব, তুমি আমার পথ সহজ করে দাও। তারপরও ভেবে রেখেছিলাম, জেরিন রাজী না হলে অন্য কাউকে বিয়ে করতাম যে কিনা জেরিনের মতো একা সন্তানকে লালন করছে, সংগ্রাম করছে প্রতিনিয়ত।
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, দোয়া করি বাবা ভালো থাক তোরা। আচ্ছা, জেরিন কী এ বিষয়টি জানে?
না, মা। এখনো বলে উঠতে পারি নি। দোয়া করো যেনো খুব শীঘ্রই বলতে পারি।
হঠাৎ দেখলাম, দরজার কাছে জেরিন দাঁড়িয়ে আছে। আমি হকচকিয়ে গেলাম। কিছু বলতে যাবো তার আগেই জেরিন হাত ইশারা করে থামিয়ে দিলো। বললো, " আমি সব শুনেছি। বুঝতে পারছি এটা নিছক একটা দুর্ঘটনা ছিলো। আমার কপালে আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তাই হবে। আমি এখন আমার বর্তমানকে নিয়ে সুখী হতে চাই।"
আমি এক ঝটকায় মায়ের দিকে তাকালাম। মাকে দেখে মনে হলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি।
সমাপ্ত
গল্পঃ বিয়ে
লেখাঃ নুসরাত জান্নাত
Comments
Post a Comment